রংপুরে ভোটার আইডির জটিলতায় আটকে আছে বীরাঙ্গনা (মুক্তিযোদ্ধা) সুইটি আক্তার পুতুলের ভাতা। পঞ্চাশ বছরের কঙ্কিত জীবন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন তিনি।
বীরাঙ্গনা সুইটি আক্তার পুতুলের বাড়ি স্টেশন মুসলিমপাড়া আলম নগর এলাকায়। পালিত পিতা মৃত ইসাহাক আলী টেংগারু। তৎকালীন আলম নগর ৭নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। কিশোরি সুইটি আক্তার পুতুলের পিতার রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর জীবনে কাল হয়ে যায় । সুইটি আক্তার পুতুল বলেন, বাবার মৃত্যুর পর পালিত পিতার পরম ¯েœহ ভালোবাসা আদর যত্বে বড় হই। পিতা হারানোর শোক ভুলে গিয়ে ছিলাম । কান্নাজড়িত কন্ঠে কথাগুলো বলেন বীরাঙ্গনা (মুক্তিযোদ্ধা) সুইটি আক্তার পুতুল। তিনি বলেন, ১৯৭১সালে ষোলো বছরের কিশোরি ছিলেন। এখন ও পাকহানাদার বাহিনীর সেই পৈশাচিক শারীরিক নির্যাতনের কথা ভুলতে পারেনি।
বীরাঙ্গনা সুইটি আক্তার পুতুল আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হঠাৎ করে বাবা নিখোঁজ হয়ে যান। দুইদিন হলেও বাবা বাড়িতে ফিরেনি। আত্মীয় স্বজনসহ এলাকার সব বাড়িতে বাবাকে খুঁজেছি। কিন্তু হঠাৎ করে মুসলিমপাড়া আলম নগর এলাকার জনৈক রাজাকার বলেন, পুতুল তোর বাবার খোঁজ পেয়েছি। সহজ সরল মনে বাবার খোঁজে জনৈক ওই রাজাকার সাথে চলে যাই। তাৎক্ষনিকভাবে ওই রাজাকার রিক্সাযোগে পানি উন্নয়ন বোর্ড ষ্টেশনের পূর্ব পাশে পাকহানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকহানাদার বাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্পে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হই। এক পর্যায়ে আমি তিন মাসের অন্তঃসত্বা হই। প্রতিটি রাতের সেই বীভৎস স্মৃতি আজো আমাকে তাড়া করে।
বীরাঙ্গনা সুইটি আক্তার পুতুল বলেন, টাউন হলের সেই টরসাল সেলে পাক সেনারা আমাকে চার মাস বন্দি করে রাখেন। এই বন্দিশালায় আমরা ১২/১৩ মেয়ে মানুষ ছিলো। প্রতিটি রাতেই আমাদের ওপর নেমে আসতো পৈশাচিক শারীরিক নির্যাতন। অতিরিক্ত নির্যাতনের কারণে দুই মেয়ের এই টরসাল সেলে মৃত্যু হয়। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাকে বীরাঙ্গনা (মুক্তিযোদ্ধা) ঘোষণা করা হয়নি।
বীরাঙ্গনা সুইটি আক্তার পুতুল অশ্রæসিক্ত অবস্থায় আরও বলেন, রাজাকারের স্বার্থান্বেষী ওই মহলটি দেশ স্বাধীনতার পরে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আমার জাতীয় ভোটার আইডি কার্ডে বয়সের হেরফের করেছেন। সেখানে তারা আমার বয়স দেয়া হয়েছে ০৭/০৮/১৯৭৪ খ্রিঃ এতে করে যুদ্ধের পরে জন্ম দেখিয়ে দোসর তার যুদ্ধপরাধ ঢাকার অপচেস্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বীরাঙ্গনা (মুক্তিযোদ্ধা) আরও বলেন, ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী আমার বড় ছেলের জন্ম ১৯৭৫ সালে, আমার জন্ম ৭৪ সালে। বিষয়টি ভাবতে লজ্জা লাগে। সারাজীবন ষ্টেশনের একটি পরিত্যক্ত বেহারি পল্লীতে থেকে এখন মৃত্যুর প্রহর গুনছি। তিনি আরও বলেন, খেয়ে না খেয়ে জীবন চলে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও কেউ খোঁজ রাখেনি। মেলেনি বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি। কলঙ্কিত জীবনে শুধু বঞ্চনার শিকার হয়েছি।
এ বিষয়ে বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক জানান, ৭১সালের ১৭ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পাকহানাদার বাহিনী মিত্র বাহিনীর কাছ পরাজয় বরণ করেন। সেই দিনে মিত্র বাহিনীসহ বীরাঙ্গনা নারী পুতুলকে উদ্ধার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর হারুন অর রশিদ জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে আত্মত্যাগ করেছেন নারীরা । আজ স্বাধীনতার ৫০বছরেও থামেনি বীরাঙ্গনা নারীদের সম্ভম হারানো কান্না। তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু নির্যাতিত নারীদের বীরাঙ্গঁনা খেতাব হিসাবে অভিহিত করে সম্মান প্রদান করেন। রংপুর রেল স্টেশন মুসলিমপাড়া আলম নগর এলাকার মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রয়াত আওয়ামীলীগ নেতা মরহুম ইসাহাক আলী টেংগারু মিয়ার কিশোরি মেয়ে সুইটি আক্তার পুতুল। তাঁর পিতার রাজনৈতিক পরিচয়টাই তাঁর জীবনে কাল হয়ে যায়।
এ বিষয়ে বীরমুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক জানান, ৭১সালের ১৭ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পাকহানাদার বাহিনী মিত্র বাহিনীর কাছে পরাজয় মেনে নেয়। সেই দিনে মিত্র বাহিনীসহ আমি বাবুখা এলাকার দুঃসাহসী প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী, রাধাবল্লভ এলাকার প্রয়াত বীরমুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীসহ কিশোরী পুতুলকে উদ্ধার করি। পরে স্টেশন এলাকায় মাইকিং করে তার বাবার হাতে তুলে দেই।
এ ব্যাপারে য্দ্ধুকালীন কোম্পানি কমান্ডার বীরমুক্তিযোদ্ধা অপিল উদ্দিন আহমেদ জানান, মুক্তিযুদ্ধে যারা সবচেয়ে বেশি সর্বনাশের সম্মুখীন হয়েছেন সম্ভম হারানো নারী। পুতুল ৫০বছর ধরে যে কষ্ট বহন করে চলেছেন। তা অসহনীয় এক কষ্টকর জীবন। যে দোসর পুতুলকে খানসেনাদের হাতে তুলে দিয়ে ছিলো আজও তারা সজাগ, তারাই পুতুলের স্বীকৃতির বিরোধীতা করছেন।
বীরমুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর হোসেন চাঁদ জানান, পুতুলের ভোটার আইডি কার্ড সংশোধনের জন্য আমিসহ আরো বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা রংপুর নির্বাচন অফিসের ডিডির সঙ্গে দেখা করেছি। বিষয়টি আমলে নেয়ার জন্য সুপারিশ করি। পুতুল যে বীরাঙ্গনা নারী এতে কোন সন্দেহ নেই।
রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা জি এম সাহাতাব উদ্দিন জানান, এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দেয়া নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ






















