নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলী ইউনিয়নের ভুলুয়া নদীর পাশ্ববর্তী বেড়ি বাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে দু’টি গ্রামের ফসলি জমি। জোয়ারের লবণাক্ত পানিতে নষ্ট হয়েছে প্রায় এক শত একর জমির রবিশস্য তরমুজ, ঢেঁড়স, সয়াবিন, মরিচ, আলু, ডাল। এতে ক্ষতি হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। ক্ষতির মুখে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। ক্ষতিগ্র¯’দের দাবী পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতার কারণে এ বাঁধটি সঠিক সময় মেরামত না করায় গত ৩-৪বছর ধরে তারা বার বার ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দাবী বাঁধটি দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
সরেজমিনে মধ্যম ও দক্ষিণ চর ব্যবস্থা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্থ’ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নোয়াখালীর সুবর্ণচর ও লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার মধ্যবর্তী সীমানায় ভুলুয়া নদী। পশ্চিমে রামগতির চর রমিজ ও পূর্বে সুবর্ণচরের চরজুবিলীর চর ব্যা¹া গ্রাম। পশ্চিমে চর জেগে উঠায় সীমাহীন ভাঙনের কবলে পড়ে পূর্বাঞ্চলের বেডিঁ বাধ। উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজনের সুবিধার কথা চিন্তা করে ১৯৮৬ সালে চর ব্যবস্থা গ্রামে ভুলুয়া নদীর পাড়ে বেড়ি বাঁধ নির্মান করা হয়। বিভিন্ন সময় বন্যা ও প্রাকৃতিক জলো”ছ্বাসের সময় ক্ষতিগ্রস্থ’ হয় বাঁধটি। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের দিকে তা মেরামত করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিš‘ ২০১৭ সালের শেষের দিকে ও ২০১৮ সালের প্রচন্ডভাবে ভাঙতে শুরু করে বেড়ি বাঁধটি। গত তিন বছর বাঁধের ভাঙাংশ দিয়ে আশপাশের বাড়ী ঘর, মাছের খামার ও ফসলি জমিতে ডুকে পড়ে নদীর লবণাক্ত পানি। আর চলতি বছরে ভরা কাটাল অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় প্রচন্ড জোয়ারে বেড়ি বাঁধের অন্তত ৩শ মিটার ভেঙে গিয়ে ফসলি জমিতে লবণাক্ত পানি ডুকতে শুরু করে। আর এ জোয়ারের পানিতে গত ২৬মার্চ থেকে প্রতি বারো ঘন্টায় এক বার জমিগুলো প্লাবিত হয়েছে। এতে দুই তিন ঘন্টা স্থায়ীভাবে কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে থাকার পর ক্ষেতে থাকা ফসল নিয়ে নদীতে নেমে যাচ্ছে জোয়ারের পানি। বেড়ি বাঁধ মেরামত না করায় শুকনো মৌসুমে যে পরিমাণ ক্ষতির মুখে পড়েছে তা বর্ষায় আরও কয়েকগুণ বাড়বে বলে আশংকা করছে স্থানীয়রা।
৪নং ওয়ার্ডের স্থানীয় কৃষক চৌধুরী আলম বলেন, গত জানুয়ারি মাসে বীজের মাধ্যমে দুই একর জমিতে আমি রবিশস্য (তরমুজ, ঢেঁড়স, সয়াবিন) চাষ করি। শ্রমিকসহ মোট উৎপাদনে খরচ হয়েছে এক লাখ টাকা। গত ১৫দিন আগে ক্ষেতে ফলন আসতে শুরু করে। ফসল উঠলে অন্তত তিন লাখ টাকা বিক্রি করার আসা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে গত ২৬মার্চ পূর্ণিমার সময় ভুলুয়া নদীর পাশ্ববর্তী ভাঙা বেড়ি বাঁধের ভিতর দিয়ে ডুকতে শুরু করে লবণাক্ত পানি, যা এখনও পর্যন্ত চলমান। আর এ পানি নেমে যাওয়ার সময় ক্ষেতের ফসল নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ক্ষেতে থাকা অবশিষ্ট গাছগুলো মরে যাচ্ছে। যার কারণে এক টাকার ফসলও তুলতে পারেন নি তিনি।
৫নং ওয়ার্ডের সবজি চাষী পারুল আক্তার কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, গত দুই বছর বড় লোকের জমিতে বর্গাচাষ করে ক্ষতির মুখে পড়ে স্বামী আবদুর রব কুমিল্লার লালমাই এলাকার একটি ইটবাটায় কাজে চলে গেছেন। চলতি বছরে আবহাওয়া ভালো থাকায় তিন একর জমি বর্গা নেন তিনি। এরপর বিভিন্ন এনজিও ও স্থানীয় কয়েকজন থেকে সুদে ২লাখ টাকা নিয়ে তিন একর জমিতে সয়াবিন ও ঢেঁড়স চাষ করেন। গাছের বৃদ্ধি ও ফুল দেখে তার পরিচর্যায় খরচ করেন আরও কয়েক হাজার টাকা। ফলন বড় হওয়ার আগ মুহুর্ত্বে পাশ্ববর্তী ভুলুয়া নদী থেকে বেড়ি বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি ডুকে পড়ে ফসলের ক্ষেতে। গত কয়েকদিনে একাধিক বার জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয় তার জমিগুলো। বর্তমানে প্রতিটি ক্ষেতের গাছ গুলো লাল হয়ে মরে যা”েছ। নিজের ৫ মেয়ে ও ২ ছেলেকে নিয়ে একদিকে যেমন মানবতর জীবন কাটছে অন্যদিকে এনজিওর ঋণ ও সুদের টাকা কিভাবে শোধ করবেন তার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না এ পরিশ্রমি নারী। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারি সহযোগিতার আবেদন করেছেন পারুল।
এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, চৌধুরী আলম, পারুল, নুরুল হক, জসিম উদ্দিন, মাঈন উদ্দিন, ফজলে মেস্ত্রী বা সোলায়মানেরমত বেড়ি বাঁধের মেরামত না করায় জোয়ারের লবণাক্ত পানিতে ক্ষতিগ্রস্থ’ হয়েছেন এ দুই গ্রামের অন্তত ৮০জন কৃষক। এক শত একর জমির ফসল হারিয়ে অন্তত এক কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। তাদের সবার দাবী অতিদ্রুত যেন এ বেড়ি বাঁধটি মেরামত করা হয়।
ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রতিনিধি মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে কৃষি। কৃষি ধ্বংস হওয়া মানে একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়া। আর গত কয়েক বছর ধরে এ বেড়ি বাঁধের মেরামত না করায় উপকূলের কৃষকরা বার বার ক্ষতির মুখে পড়ছে। এতে চাষে কৃষকদের আগ্রহ হারাচ্ছে। চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি রবিশস্যের ক্ষতি হয়েছে। কৃষি অধিদপ্তরের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্থ’ চাষীদের একটি তালিকা করে সরকারি সহযোগিতার অনুরোধ করেন তিনি।
সমাজপ্রতি ডা. ওজি উল্যাহ জানান, বেড়ি বাঁধটি না থাকায় বার বার এ অঞ্চলের লোকজন ভাঙনের কবলে পড়ছে। গত কয়েক বছরে অন্তত অর্ধশতাধিক পরিবার এলাকা ছেড়ে অনত্রে চলে গেছেন। এখনও ভাঙন হুমকিতে রয়েছেন আরও দুই শতাধিক পরিবার ও দোকান-পাট। জোয়ারের পানিতে ৫-৬ফুট পানির নিচে তলিয়ে যায় এ এলাকা। ফসলি জমির পাশাপাশি জোয়ারের লবণাক্ত পানিতে পানের ভরত, দোকান-পাট, মাছের প্রজেক্ট ও বসত ঘরে ব্যপক ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুন উর রশিদ জানান, খবর পেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ’ কৃষি ক্ষেতগুলো তিনি পরিদর্শন করেছেন। ক্ষতিগ্র¯’দের তালিকা করে সরকারি সহায়তার ব্যবস্থার আবেদন করা হবে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন কৃষকদের ফসলের ক্ষতির কথা স্বীকার করে বলেন, ব্যবস্থা গ্রামের ভুলু নদীর পাড়ে ক্ষতিগ্রস্থ’ বেড়ি বাঁধটির মেরামতের জন্য সিডিএসপি আওতায় ৫কোটি ৬০লাখ টাকা ব্যায়ে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে ঠিকাদারকে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুত বাঁধের ক্ষতিগ্রস্থ’ ৩শ মিটার মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর






















