পাট উৎপাদন নির্ভরশীল হওয়ায় ৭০’র দশকে রূপগঞ্জের শীতলক্ষ্যার পাড়ে গড়ে উঠে ৮ টি পাটকল। এসব পাটকলগুলোকে ঘিরে ১৫-২০ হাজার শ্রমিকের জীবিকার সন্ধান মিলে। কালের বিবর্তনে ও নানা কারণে কমতে থাকে পাটের উৎপাদন। মিলগুলো গুণতে থাকে লোকসান। ফলে রাষ্ট্রয়াত্ত্ব একটি ও বেসরকারী ২ টি ছাড়া বাকী ৫ টি পাটকল গত এক যুগ আগেই বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ মিলগুলোর প্রায় ১১ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে। এসব শ্রমিক ও তাদের পরিবার অর্থভাবে নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। এমনকি সংসার চালাতে বিক্রি করতে হয়েছে ভিটেমাটির পাশাপাশি স্ত্রীর স্বর্ণালংকারও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলখ্যাত রূপগঞ্জ উপজেলায় ছোট বড় মিলিয়ে ৮ টি পাটকল রয়েছে। নবাব আশকারী জুট মিল, মার্সিকি জুট মিল, সাত্তার জুট মিল, এলাইড জুট মিল, গাউছিয়া জুট মিল, উত্তরা জুট মিল ও নবারন জুট মিলসহ ৭ টি পাটকল গড়ে উঠে। এছাড়া জুটো ফাইবার নামে তারাবো এলাকায় একটি সরকারি রাষ্টয়াত্ত্ব পাটকল গড়ে উঠে। বেসরকারি পাটকলের এর মাঝে উত্তরা জুট মিলস ও নবারুন জুট মিল ছাড়া বাকী পাটকলগুলো লোকসানের মুখে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় একযুগ আগেই। বাকী দুটো চলছে খুঁড়িয়ে-খুড়িয়ে। বেসরকারি পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে শিল্পাঞ্চলখ্যাত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার প্রায় ১১ হাজার হাজার পাটকল শ্রমিক এখনো মানবেতর জীবন-যাপন করছে। এদের মাঝে সিংহভাগ ভিটেমাটি বিক্রি করে আজ নিঃস্ব। পাটকলগুলো বন্ধের প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গেলেও মালিকপক্ষের কাছ থেকে সিংহভাগ শ্রমিকই ব্যাক্তিগত তহবিলের টাকা, বকেয়া বেতন ও সার্ভিসের টাকা পাননি বলে শ্রমিকরা অভিযোগ করেন। এছাড়া মিল বন্ধের পর সরকারিভাবে অথবা মালিকপক্ষও শ্রমিকদের কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেননি বলেও তারা জানান। সম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে রূপগঞ্জ উপজেলার বন্ধ হওয়া পাটকলগুলোতে কাজ করা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।
স্থানীয় শ্রমিক সূত্রে জানা গেছে, বিরাব এলাকার নবাব আশকারী জুট মিলে প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করতো। গত এক যুগ আগে লোকসান দেখিয়ে পাটকলটি কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেয়। ঐসময় পাটকল শ্রমিকরা ২৫০-৩’শ টাকা সপ্তাহে বেতন পেত। নবাব আশকারী জুট মিলের ৫ হাজার শ্রমিকের মাঝে সিংহভাগ শ্রমিক এখনো তাদের ব্যাক্তিগত তহবিলের টাকা পাননি বলে জানা গেছে। এছাড়া কেউ কেউ সার্ভিস চার্জ ও কয়েক সপ্তাহের বেতন পাননি বলে অভিযোগ করে শ্রমিকরা। কথা হয় নবাব আশকারী জুট মিলের শ্রমিক আসরউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাবাগো চাকরি যাওনের পর থেইকা এহনো আমি বেকার। দুই পোলা ও স্ত্রী নিয়া খুব কষ্ট কইরা দিন কাটাইতাছি। অভাবের সংসার দেইখা পোলা দুইডারে লেহাপড়াও করাইতে পারি নাই। কয়েক বিঘা জমি আছিল কিন্ত অহন ভিটামাটি ছাড়া কিছুই নাই। আমি আমার পিএফ ফান্ড ও (ব্যক্তিগত তহবিলের) দুই সপ্তাহের বেতনের কোন টাকাই পাই নাই। একই এলাকার আমজাদ, আবুল হোসেন, সাইফুল ইসলামসহ বেশিরভাগ শ্রমিকই খুব কষ্টে দিন পার করছে। কথা হয় নবাব আশকারী জুট মিলের পল্লী চিকিৎসক ডাক্তার সুভল চন্দ্র দাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগত তহবিল (পিএফ) এর কোন টাকা পাননি। তিনি পিএফ, সার্ভিস চার্জ ও ব্যাক্তিগত তহবিল মিলিয়ে এক থেকে দেড় লাখ টাকা এখনো তিনি পাওনা রয়েছে মালিকপক্ষের কাছে। নবাব আশকারী পাটকলটি বন্ধের পর পিএফ ফান্ড, বেতন ও সার্ভিস চার্জের জন্য শ্রমিকরা আন্দোলন করেও কোন সুফল পাননি।
কাঞ্চন এলাকার মার্সিকি জুট মিলে প্রায় ৩ হাজার শ্রমিক কাজ করতো। প্রায় ১০ বছর আগে পাটের সংকটের কারণে লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে যায় মিলটি। এটিতেও শ্রমিকরা তাদের সার্ভিস চার্জ ও ব্যক্তিগত তহবিলের টাকা পাননি শ্রমিকরা। মার্সিকি জুট মিলের শ্রমিক আব্দুল গাফ্ফার জানান, অভাবের তারনায় ভিটেমাটির বিক্রির স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে দিতে হয়েছে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে। মনির শাহজালাল, শুক্কুর আলীসহ অনেকে বলেন, বেশিরভাগই শ্রমিকই ব্যক্তিগত তহবিলের টাকা ও সার্ভিস চার্জের টাকা পাননি। চাকরী হারানো পর বেশিরভাগ শ্রমিকই নিঃস্ব।
হাটাবো এলাকার সাত্তার জুট মিলে ১ হাজার ৭’শ শ্রমিক কাজ করতো। লোকসানের কারণে প্রায় ১২-১৩ বছর আগে বন্ধ হয়ে যায়। ব্যক্তিগত তহবিলের পাওনা ১৬ ভাগ টাকার মধ্যে মাত্র ৬ ভাগ দিয়েই মালিকপক্ষ জোর করে তাদের নিকট থেকে কাগজে সই করিয়ে নেয় বলে অভিযোগ করেন শ্রমিকরা। কথা হয় সাত্তার জুট মিলের শ্রমিক মতিউর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, পাটকলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার তাকে জমিজমা ও ভিটেমাটি বিক্রি করে পরিবার পরিজন নিয়ে পথে নামতে হয়েছে। এখন তার নুনতে আনতে পান্তা ফুরায়। তবে বর্তমানে ছোট একটি চায়ের দোকান দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে কোন রকমে সংসার চালাচ্ছেন। তিনি এখনো মালিকপক্ষের কাছ থেকে বেতন ও পিএফ ফান্ড নিয়ে প্রায় ২০-২৫ হাজার টাকা মালিকপক্ষের কাছ থেকে পান।
উপজেলার বানিয়াদি এলাকার এলাইড জুট মিলটি গত ১০ বছর আগে বন্ধ হয়ে যায়। এ মিলে প্রায় ৫ শতাধিক শ্রমিক কাজ করতো। মিলটি বন্ধের পর গত ২০১৮ সালে প্রথম দিকে দেড় শতাধিক শ্রমিক নিয়ে পূনরায় মিলটি চালু করা হলেও পাট সংকট ও পাট চাষী না থাকায় লোকসানের কারণে গত দেড় মাস আগে এটি আবারো বন্ধ হয়ে হয়ে যায়। তবে শ্রমিকরা অভিযোগ করেন তারা তাদের বেতন ও ব্যাক্তিগত তহবিলের টাকা পুরোপুরি পাননি। তবে এ ব্যাপারে এলাইড জুট মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা তানভীর ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের পূর্ণ পাওনাদি পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে।
মুড়াপাড়া এলাকার গাউছিয়া জুট মিলে ১৪’শ শ্রমিক কাজ করতো। গত ১৪ বছর আগে এটি বন্ধ হয়ে যায়। এ পাটকলটিতে শ্রমিকরা পাওনাদি সঠিকভাবে পাননি। দড়িকান্দির এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ইয়াদ আলী গাউছিয়া জুট মিলে কাজ করতো। পাটকলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কয়েক বছর পরই তার মৃত্যু হয়। তিনিও তার প্রাপ্য পাওয়াদি ঠিক মতো পায়নি বলে জানান নিহত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে পারভেজ। পারভেজ বলেন, আমার বাবা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে কিন্তু আমার বাবা তার বেতন ও ব্যাক্তিগত তহবিলের টাকা ও কয়েক সপ্তাহের বেতন ঠিক মতো পাননি। বাবা ইয়াদ আলী মারা যাওয়ার পর বর্তমানে তাদের সংসারে নুন আনতে পানতা ফুরানোর মতো অবস্থা। পরিবার পরিজন নিয়ে খুব কষ্টেই চলছে তাদের সংসার। এছাড়া গাউছিয়া জুট মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেকে দিন মজুরি অথবা ছোট্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বর্তমানে উত্তরা জুট মিল ও নবারন জুট মিল দুটি সচল থাকলেও এগুলোও চলছে অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।
পাটকল শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পাটকল মালিকদের পক্ষ থেকে ও সরকারিভাবে তাদের কর্মসংস্থ্যানের ব্যাপারে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। পাটকল শ্রমিকদের একটাই দাবি সরকারিভাবে তাদের কর্মসংসস্থান ও পাটকল কর্তৃপক্ষ যাতে করে তাদের পাওনা টাকা পরিশোধ করে দেন এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ























