০৮:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

নেত্রকোনায় আট মাসে পানিতে ডুবে ৭২ শিশুর মৃত্যু

চলতি বছরের আট মাসে পানিতে ডুবে অন্তত ৭২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া শিশুদের বয়স দুই থেকে আট বছরের মধ্যে। জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়  পাঠানো সংবাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দুপুরে কলমাকান্দা উপজেলার তেলিগাঁও এলাকায় পানিতে ডুবে সাইম মিয়া নামের আড়াই বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সাইম মিয়া কলমাকান্দার তেলিগাঁও এলাকার মো. সাঈদ মিয়ার ছেলে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বেলা ১১টার দিকে সাইম বাড়ির উঠানে খেলা করছিল। কিছুক্ষণ পর তাকে না পেয়ে পরিবারের লোকজন খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাড়ির সামনের পুকুরে স্থানীয়রা শিশুটির লাশ পানিতে ভাসতে দেখে উদ্ধার করেন। পরে তাকে কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

কলমাকান্দা থানার ওসি মো. আবদুল আহাদ খান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিশুটির লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। থানায় এ নিয়ে একটি অপমৃত্যু হয়েছে।

এদিকে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় সংবাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলার ১০টি উপজেলায় অন্তত ৭২ জন শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে। সর্বোচ্চ গত জুন ও আগস্ট মাসে মৃত্যু বেশি। ওই দুই মাসে ১২ জন করে মারা যায়। আর কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। গত চার মাসে কলমাকান্দায় ১৫ জন ও দুর্গাপুরে ৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়।

এছাড়া খালিয়াজুরি ও মদনে ৬ জন করে, আটপাড়া, মোহনগঞ্জ ও সদর উপজেলায় ৪ করে রয়েছে। যেসব শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে তাদের বেশির ভাগ বাড়ির সামনে, পেছনে বা পাশের পুকুর, ডুবা (ছোট জলাশয়), খাল, নদী ইত্যাদির পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে।

এসব মৃত্যুর ঘটনা সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে বেশি হয়। কারণ এ সময় শিশুদের মায়েরা রান্নাবান্নাসহ বিভিন্ন গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন। আর বাবারা ঘরের বাইরে কাজে থাকেন। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে দরিদ্র পরিবারের শিশুই বেশি।

শিশুদের নিয়ে কাজ করে স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থা স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির ইউনিসেফ প্রকল্পের জেলা সমন্বয়কারী সঞ্জয় সরকার মনে করেন, শিশুদের সাঁতার না জানা, তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা জ্ঞান না থাকা, সচেতনতার অভাবই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।

কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, যেসব শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে, তাদের সবারই হাসপাতালে আনার আগেই মৃত্যু হয়।

তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কেউ ডুবলেও তাকে উদ্ধারের পরপর তার শ্বাস ও হার্ট চালু করার যেসব প্রাথমিক উদ্যোগ আছে সেগুলো মানুষকে শেখানো।

নেত্রকোনা জেলা সুজনের সভাপতি শ্যামলেন্দু পাল বলেন, পানিতে ডোবার পর ওই রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসার পদ্ধতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভালো করে পাঠদান করতে হবে। হাওরাঞ্চলসহ নদী তীরবর্তী এলাকায় সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন করলে এ অপমৃত্যু কমতে পারে।

জেলা পুলিশ সুপার মো. আকবর আলী মুন্সি বলেন, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়। স্থানীয়দের মাঝে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা হয়। এ পরিস্থিতি কমাতে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক কাজি মো. আবদুর রহমান বলেন, পানিতে ডুবে এত শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি উদ্বেগজনক। একটি এনজিও এ নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে তারা কাজ শুরু করেনি। আমরা সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে এ নিয়ে কাজ করব।

 

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

নেত্রকোনায় আট মাসে পানিতে ডুবে ৭২ শিশুর মৃত্যু

প্রকাশিত : ১০:৩০:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২১

চলতি বছরের আট মাসে পানিতে ডুবে অন্তত ৭২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মারা যাওয়া শিশুদের বয়স দুই থেকে আট বছরের মধ্যে। জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়  পাঠানো সংবাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দুপুরে কলমাকান্দা উপজেলার তেলিগাঁও এলাকায় পানিতে ডুবে সাইম মিয়া নামের আড়াই বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সাইম মিয়া কলমাকান্দার তেলিগাঁও এলাকার মো. সাঈদ মিয়ার ছেলে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বেলা ১১টার দিকে সাইম বাড়ির উঠানে খেলা করছিল। কিছুক্ষণ পর তাকে না পেয়ে পরিবারের লোকজন খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাড়ির সামনের পুকুরে স্থানীয়রা শিশুটির লাশ পানিতে ভাসতে দেখে উদ্ধার করেন। পরে তাকে কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

কলমাকান্দা থানার ওসি মো. আবদুল আহাদ খান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শিশুটির লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। থানায় এ নিয়ে একটি অপমৃত্যু হয়েছে।

এদিকে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় সংবাদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলার ১০টি উপজেলায় অন্তত ৭২ জন শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে। সর্বোচ্চ গত জুন ও আগস্ট মাসে মৃত্যু বেশি। ওই দুই মাসে ১২ জন করে মারা যায়। আর কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। গত চার মাসে কলমাকান্দায় ১৫ জন ও দুর্গাপুরে ৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়।

এছাড়া খালিয়াজুরি ও মদনে ৬ জন করে, আটপাড়া, মোহনগঞ্জ ও সদর উপজেলায় ৪ করে রয়েছে। যেসব শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে তাদের বেশির ভাগ বাড়ির সামনে, পেছনে বা পাশের পুকুর, ডুবা (ছোট জলাশয়), খাল, নদী ইত্যাদির পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে।

এসব মৃত্যুর ঘটনা সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে বেশি হয়। কারণ এ সময় শিশুদের মায়েরা রান্নাবান্নাসহ বিভিন্ন গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন। আর বাবারা ঘরের বাইরে কাজে থাকেন। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে দরিদ্র পরিবারের শিশুই বেশি।

শিশুদের নিয়ে কাজ করে স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থা স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির ইউনিসেফ প্রকল্পের জেলা সমন্বয়কারী সঞ্জয় সরকার মনে করেন, শিশুদের সাঁতার না জানা, তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা জ্ঞান না থাকা, সচেতনতার অভাবই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।

কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, যেসব শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে, তাদের সবারই হাসপাতালে আনার আগেই মৃত্যু হয়।

তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কেউ ডুবলেও তাকে উদ্ধারের পরপর তার শ্বাস ও হার্ট চালু করার যেসব প্রাথমিক উদ্যোগ আছে সেগুলো মানুষকে শেখানো।

নেত্রকোনা জেলা সুজনের সভাপতি শ্যামলেন্দু পাল বলেন, পানিতে ডোবার পর ওই রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসার পদ্ধতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভালো করে পাঠদান করতে হবে। হাওরাঞ্চলসহ নদী তীরবর্তী এলাকায় সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন করলে এ অপমৃত্যু কমতে পারে।

জেলা পুলিশ সুপার মো. আকবর আলী মুন্সি বলেন, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়। স্থানীয়দের মাঝে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা হয়। এ পরিস্থিতি কমাতে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক কাজি মো. আবদুর রহমান বলেন, পানিতে ডুবে এত শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি উদ্বেগজনক। একটি এনজিও এ নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণে তারা কাজ শুরু করেনি। আমরা সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে এ নিয়ে কাজ করব।