লালমনিরহাটে সেই আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী কতৃক গৃহকর্মী নির্যাতিত শিশুর পাশে দাঁড়িয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রোববার (৫ সেপ্টেম্বর) জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত একটি চিঠি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব, আইজিপি, লালমনিরহাট পুলিশ সুপার ও লালমনিরহাট জেলার কমিশনের সংশ্লিষ্ট প্যানেল আইনজীবী শরিফুল ইসলাম রাজুর কাছে পাঠানো হয়। নির্যাতিত শিশুটিকে নিয়ে অনলাইন, পত্রিকা ও টেলিভিশনে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ হয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়। ভুক্তভোগীর আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার সাংবিধানিক অধিকার এবং শিশুর প্রতি এমন নিষ্ঠুুর নির্যাতনের অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলেও উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। এ অবস্থায় অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত মামলা করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে গৃহীত ব্যবস্থা আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে অবহিত করতে পুলিশ সুপারকে বলা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন লালমনিরহাট জেলার প্যানেল আইনজীবী শরিফুল ইসলাম রাজু জানান, রোববার দুপুরে মানবাধিকার কমিশনের ওই চিঠি পেয়ে তিনি ভুক্তভোগীর বাড়িতে যান।
প্রসঙ্গত, হাসিনা সাত বছরের এক অবুঝ শিশু গৃহকর্মীকে দির্ঘদিন ধরে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষতুলি এলাকার হোসেন আলীর ছেলে পুলিশ কর্মকর্তা আযহারুল ইসলাম সুমন ও তার স্ত্রী মিসেস ডেইজি বেগমের বিরুদ্ধে। বর্তমানে শিশুটি তার ছোট কোমল শরীরে নির্যাতনের দাগ নিয়ে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তার বাড়িতে রয়েছে। শিশুটির স্বজনদের অভিযোগ, আযহারুল-ডেইজি দম্পত্তির অমানুষিক নির্যাতনে শিশুটি ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পরলে ২৯ আগষ্ট একজন পুলিশ কনস্টেবল ও তার ড্রাইভারের মাধ্যমে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে। এদিকে প্রায় এক বছর পরে ক্ষত বিক্ষত চেহারার শিশুটিকে কাছে পেয়ে হতভম্ব হয়ে যান পরিবারের সদস্য ও গ্রামবাসিরাও। এবিষয়ে থানায় অভিযোগ দিলেও মামলা নেয়নি পুলিশ। লালমনিরহাট জেলা সদর হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসাধীন শিশু হাসিনার গোটা শরীর জুরে শুধূ নির্যাতনের দাগ। একটু ভালো থাকার আশায় অবুঝ বয়সে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়েই এমন করুণ পরিনিতির শিকার হতে হয়েছে তাকে। বাবা ভবঘুরে ও মাদকাসক্ত হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই মায়ের সাথে আদিতমারী উপেজেলার ভেলাবাড়ী মহিষতুলি গ্রামে নানী আমেনা খাতুনের আশ্রয়ে থাকত হাসিনা। কিন্তু এক বছর আগে প্রতিবেশি হোসেন আলীর ছেলে পুলিশ কর্মকর্তা আযহারুল ইসলাম সুমন পড়া-লেখা করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিশু হাসিনাকে গৃহকর্মী হিসেবে নেওয়ার প্রস্তাব দিলে অভাবের তাড়নায় রাজী হয়ে যায় নানী। আর শিশুটিকে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠাতে সহযোগিতা করেন ওই পুলিশ কর্মকর্তার বড় বোন মানিকজান বেগম। এদিকে হাসিনাকে নিয়ে যাওয়ার পরে কথা রাখেননি ওই পুলিশ কর্মকর্তা। উল্টো পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী ডেইজী বেগম মেঝে মোচা, বাসন ধোয়া, কাপর কাচাঁসহ বাসার সকল কাজ চাপিয়ে দেয় অবুঝ শিশুটির উপরে। কাজে ভুল হলেই কখনো কয়েলের আগুন কিংবা গরম খুন্তির ছ্যাকা আবার কখনো র্যাকেট ও জাতি দিয়ে আঘাত করে নির্যাতন চালাত গৃহকর্তী ডেইজী। এমনকি ঠিকমত খেতেও দেয়া হত না তাকে। এতে শিশুটি অসুস্থ্য হয়ে পরলে গেল ২৯ আগষ্ট চুপিসারে গাড়ি চালকের মাধ্যমে শিশুটিকে পাঠিয়ে দেয়া হয় গ্রামে। এরপর শিশু হাসিনার ক্ষতবিক্ষত শরীর দেখে হতভম্ব হয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। শুধু তাই নয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটির শরীরে নির্যাতনের ভয়াবহ চিহ্ন দেখে আৎকে উঠছেন অন্য রোগীরাও। হাসিনার পা থেকে মাথা পর্যন্ত শরীরের সকল অংশেই বিভৎস নির্যাতনের দাগ আর দাগ। শিশুটির বর্তমান শারিরীক অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার মঞ্জুর মোর্শেদ দোলন বলেন, শিশুটির শরীরে অসংখ্য আঘাতের দাগ রয়েছে যার কিছুটা পুরোনো এবং সাম্প্রতিক সময়ের। দির্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হওয়ায় শিশুটি বর্তমানে দূর্বল হয়ে পরেছে এবং মানসিক ভাবে আঘাত পেয়েছে, শিশুটির সু-চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সকল ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। শিশু হাসিনার সাথে কথা হলে সে জানায়, নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই তাকে দিয়ে সকল কাজ করানো হত। কাজে দেরী কিংবা ভুল হলেই সুপারি কাটার জাতি ও র্যাকেট দিয়ে বেধম মারতেন গৃহকর্তী ডেইজী। শুধু তাই নয় কখনো কখনো কয়েলের আগুন ও গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকাও দেয়া হত। নির্যাতনের বিষয়টি পুলিশ পরিদর্শক আযহারুল জানলেও কখনো স্ত্রী ডেইজীকে শাসন করত না। অধিকাংশ সময় তাকে শুধু শড়িষার তেল ও লবন মেখে ভাত খেতে দেওয়া হত। শিশুটির নানী আমেনা বেগম বলেন, আযহারুল পুলিশ বলেছিল হাসিনাকে দিয়ে কাজ করাবে না, শুধু তার সন্তানদের সাথে খেলবে এবং পড়ালেখা করবে। কিন্তু সেই কথা রাখেনি সে, উল্টো হাসিনাকে মেরে অসুস্থ করে পাঠিয়ে দিল । নিয়ে যাওয়ার ছয় মাস পর শিশুটিকে দেখার জন্য যেতে চাইছিলাম কিন্তু করোনার কথা বলে আমাকে বাসার ঠিকানা দেয়নি তারা। শিশুটির নানী আরো বলেন যে, দুদিন ধরে থানায় ঘুরে প্রথমে মামলা নিতে চেয়েও এখন পুলিশ বলছে যে এখানে মামলা হবে না। আমরা গরীব মানুষ এখন ঢাকায় কেমনে যাব, আসামীদের বাসাও তো চিনি না মামলায় কি ঠিকানা দেব? হাসিনার মা রহিমা খাতুন বলেন, অভাবের সংসার, ওর বাপ কোন খরচ দেয় না তাই পুলিশের প্রস্তাবে হাসিনার ভালোর জন্য আমার মা তাকে পাঠিয়েছিল। কিন্তু ওরা আমার মেয়েটির উপর অত্যাচার করে আধমরা করে পাঠিয়ে দিল। এবিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় অভিযুক্ত পুলিশ পরিদর্শক আযহারুল ইসলাম সুমন ও তার স্ত্রী ডেইজী বেগমের সাথে, তারা নির্যাতনের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, দাগগুলো অনেক পুরোনো এবং শিশুটিকে নিয়ে যাওয়ার সময়ও ছিল। একপর্যায়ে তিনি বলেন দুষ্টমি করার কারনে হয়ত দুএকটা চড় থাপ্পর মারলেও মারতে পারে তার মানে সেটি নির্যাতন নয়! সেইসাথে একই এলাকার মানুষ হিসেবে গণমাধ্যমে সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন ভাই সংবাদ প্রকাশ হলে আমার সামাজিক সম্মান নষ্ট হবে। অভিযুক্ত গৃহকর্তী ডেইজী বেগম বলেন, তিনি কোন নির্যাতন করেননি, কেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে সেটি তার মাথায় আসছে না। এদিকে পুলিশ কর্মকর্তা আযহারুল ও তার স্ত্রী ডেইজীর এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করে অভিযুক্ত ওই পুলিশ কর্মকর্তার আপন বড় বোন মানিকজান এই প্রতিবেদককে বলেন, আমিই মধ্যস্থতা করে আযহারুলের হাতে তুলে দিয়েছিলাম হাসিনাকে। তখন হাসিনার শরীরে কোন দাগ ছিল না।
এদিকে থানায় মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক, শিশুটির অবিভাবকরা মামলা নিয়ে এসেছিল। কিন্তু ঘটনাস্থল ঢাকায় হওয়ায় তাদের ঢাকার সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করার পরামর্শ দিয়েছি।
১১:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম :
লালমনিরহাটে গৃহকর্মী নির্যাতিত শিশুটির পাশে দাড়িয়েছে মানবাধিকার কমিশন
-
আশরাফুল হক, লালমনিরহাট - প্রকাশিত : ০৮:২০:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
- 80
ট্যাগ :
জনপ্রিয়




















