ডাকসু’র সাবেক নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে “শিক্ষা বাঁচাও, শিক্ষাঙ্গণ বাঁচাও” শীর্ষক সঙ্গলবার, ৩১ মে সকাল ১১ টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সম্মেলনে ডাকসুর সাবেক ভিপি আ স ম আবদুর রব লিখিত বক্তব্য পড়ে শুনান-ডাকসু’র সাবেক নেতৃবৃন্দ আয়োজিত আজকের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হবার জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। দেশের ধ্বংসপ্রায় শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষাঙ্গণের নৈরাজ্যমূলক অবস্থার প্রেক্ষিতে আমরা ডাকসুর সাবেক নেতৃবৃন্দ আজকে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছি।
বিগত ১৩ বছর ধরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষাঙ্গণের পরিবেশ পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করে যাচ্ছে বর্তমান ক্ষমতাসীন অবৈধ সরকার। নিজেদের ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে তারা দেশকে মেধাহীন করার সকল ব্যবস্থা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন দল এবং এর সহযোগী ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের নাম প্রমাণসহ উঠে আসার পরও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। উপরন্তু প্রমানিত সত্যকে অস্বীকার করা হয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সরকারের আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হয়েছে।
জাতির মনন গঠনের কারিগর শিক্ষকদের দলদাসে পরিনত করা হয়েছে। যে সকল সম্মানিত শিক্ষকগণ নিরপেক্ষভাবে সত্যিকারের শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি এবং শিক্ষাদানের চেষ্টা করছেন তাঁদের বিভিন্নভাবে লাঞ্চিত করা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে।আপনারা জানেন, বর্তমান ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট সরকার নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা ধরে রাখতে সরকারি দলের সহযোগী ছাত্র সংগঠনকে একটি সন্ত্রাসী বাহিনীতে পরিণত করেছে। ১৩ বছর ধরে ভিন্ন রাজনৈতিক মতের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে অবস্থান তো দূরের কথা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পাঠ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এমনকি পরীক্ষা পর্যন্ত দেয়ার সুযোগ পায় না। সরকারি দলের সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠন চর দখলের মত করে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে রেখেছে। ভিন্ন মত পোষণ এমনকি কেবলমাত্র সরকারি দল বা তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মসূচীতে অংশ না নেয়ায় নির্মম শারীরিক নির্যাতন, হল থেকে বের করে দেয়া এমনকি পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেছে বারংবার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দলদাস নির্লজ্জ প্রশাসন বরাবরই নির্লিপ্ত থেকেছে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ১৩ বছর ধরে বিরোধী ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রতিনিয়ত ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠনের হামলার শিকার হয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৪ এবং ২৬ মে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে সরকারি দলের সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। তারা মধ্যযুগীয় কায়দায় নিষ্ঠুরভাবে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের রাস্তায় ফেলে পিটিয়েছে। এমনকি তারা কাপুরুষোচিতভাবে নারী শিক্ষার্থীদের উপর বর্বর হামলা চালিয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের উপর এমন নির্মম হামলার ঘটনা পাকিস্তান আমলেও কখনো ঘটেনি। হামলার শিকার এসব বিরোধী ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আশংকাজনক অবস্থায় আইসিইউতে রয়েছেন। নারী শিক্ষার্থীদের হাত পা ভেঙে দেয়া হয়েছে।
এই হামলায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে যা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ছবি এবং ভিডিও সহ উঠে এসেছে। এই হামলায় জড়িতদের নাম পরিচয়, হামলা এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ছবি, ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হলেও দলদাস বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এমনকি ঘটনার বিষয়ে জানেন না বলেও মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অযোগ্য উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এই ঘটনায় হামলার শিকার ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলকে দায়ী করেছেন এমনকি মামলাও করেছেন।অবৈধ ক্ষমতাসীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমে তাই হামলার ঘটনার সত্যতা নেই বলে মন্তব্য করেছিলেন। পরে যেখানে সারা দেশের মানুষ এই ঘটনার বিস্তারিত জানে, সংবাদ মাধ্যমে ছবি, ভিডিও সহ হামলাকারীদের নাম তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের মত ছাত্রদলকে দায়ী করেন এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেন।হকিস্টিক, রাম দা নিয়ে ছাত্রদলের কর্মীদের উপর হামলা চালায়। এক পর্যায়ে তারা গুলি ছোড়ে যা ছবি -পরিচয় উঠে এসেছে, সেখানে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটনার বিস্তারিত জানেন না। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা লাঠি, রড, হামলার শিকার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক সহ ৪০০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করা ভিডিও সহ গণ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অথচ এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো।
এর সম্পূর্ণ দায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। নিঃসন্দেহে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশেই ছাত্রলীগ এই তান্ডবলীলা দেশের সকল শিক্ষাঙ্গন আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষাঙ্গনকে বাঁচানো শুধুমাত্র ছাত্র সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নয়। এই দায়িত্ব সবার। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষাঙ্গনকে ধ্বংসের হাত থেকে।রক্ষা করতে আমরা ডাকসুর সাবেক নেতৃবৃন্দ দেশের সকল ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক, পেশাজীবী, ডাকসুসহ দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান দেশের সকল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক-বর্তমান ছাত্র সংসদ নেতৃবৃন্দ, সাবেক-বর্তমান ছাত্র নেতৃবৃন্দ সহ চালিয়েছে।
দেশে আজ এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ফ্যাসিবাদি সরকার দেশের সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে, মানুষের বাক স্বাধীনতা হরণ করেছে, শিক্ষা ব্যবস্থা।জনগণের ন্যূনতম নির্যাতন এবং শিক্ষাঙ্গণের পরিবেশ ধ্বংস করেছে। তারা গুম, খুন, হামলা, মামলা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নিপীড়নের মাধ্যমে বিরোধী মতকে দমন করে একটি একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে!
কিন্তু দেশের জনগণ বিশেষ করে ছাত্র সমাজ বরাবরই রুখে দাড়িয়েছে। এদেশে মানুষের দাবি আদায়ের সংগ্রামে ছাত্র সমাজ সবসময়ই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান, স্বাধীনতার পর আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন সহ সকল আন্দোলন সংগ্রামে ছাত্র সমাজ এবং ডাকসু নেতৃবৃন্দ নেতৃত্ব দিয়েছে। একারনে বর্তমান ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার সরকারের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে আমরা সাবেক ডাকসু নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। অতীতে যারা সংগ্রামী ছাত্র সমাজের গায়ে হাত তুলেছে তাদের সবাইকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়েছে। বর্তমান সরকারও ছাত্র-ছাত্রীদের উপর সন্ত্রাসী কায়দায় এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে যে নির্মম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিচ্ছে তার পরিণতিতে এ সরকারেরও বিদায়ের ঘন্টা বেজে গেছে। অচিরেই ছাত্র সমাজের ঐক্যবদ্ধ দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে এই স্বৈরাচার, অবৈধ, ভোট ডাকাত সরকারের হাত থেকে দেশকে, দেশের জনগণকে মুক্ত করে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই আন্দোলনে আমরা সাবেক ডাকসু নেতৃবৃন্দ ছাত্র সমাজ তথা সকল আন্দোলনকারী শক্তির পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ

























