পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই দেখা যায় ড. ইউনূসকে বিভিন্ন দেশে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। তার কারণ অবশ্য ড. ইউনূসের মানবতা বা সেবামূলক কার্যক্রমের স্বীকৃতি হিসাবে নয়, বরং তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে। সকল নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিকেই এ ধরনের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তিনি তার নিজ বিষয়, অর্থাৎ অর্থনীতির জন্য নয়, বরং নোবেল পেয়েছেন শান্তির জন্য। শান্তির জন্য ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে প্রতি বছর যাদের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়, তারা নিশ্চিত ভাবে নিজ নিজ কর্ম ক্ষেত্রে বিরল আবিস্কার বা অবদান রাখার কারণেই তা পেয়ে থাকেন, যেগুলো মানব জাতির কল্যাণ ত্বরান্বিত করে আসছে। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটে শান্তিতে নোবেল বিজয়ীকে নির্বাচনের বেলায়। এই পুরস্কারটি যে রাজনৈতিক এবং অন্য বিবেচনায় দেওয়া হয়, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। যেই ড. কিসিঞ্জারের হাত লক্ষ লক্ষ লোকের তাজা রক্তে রঞ্জিত, যিনি ইন্দোনেশিয়া, চিলি প্রভৃতি দেশে অগণিত মানুষ হত্যার হুকুমের আসামি, তাকেও দেওয়া হয়েছিল শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার। ড. ইউনূসও যে সে সময়ে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহায়তা পুষ্ট হয়েই শান্তির জন্য নোবেল পেয়েছিলেন, সে কথা অনেকেরই মুখে মুখে।
শান্তির জন্য নোবেল বিজয়ী এই ড. ইউনূস যে তার নিজ দেশে বহু প্রতারণামূলক অপরাধ করে নানাবিধ অশান্তির সৃষ্টি করছেন, তা এখন আমাদের মহামান্য হাইকোর্টেরই নজরে এসেছে। তিনি তার বহু কর্মচারীর প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ অন্যান্য টাকা আত্মসাৎ করলে উক্ত কর্মচারীরা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে একাধিক মামলা ঠুকে দিলে আদালত ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ইউনুস সাহেব অবশ্য আদালত থেকে জামিন নিয়ে মুক্তির স্বাদ ভোগ করতে থাকেন, কিন্তু মামলা চলাকালেই ঘটে গেলো অবিশ্বাস্য ঘটনা। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো হঠাৎ করেই একদিন শোনা গেল এডভোকেট ইউসুফ আলি নামক প্রতারিত কর্মচারীদের আইনজীবী ড. ইউনূসের সঙ্গে বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আদালত থেকে সব মামলা তুলে নিয়েছেন। তখনও পুরো ঘটনা জানা যায়নি। কিন্তু জানা গেলো কর্মচারীদের উল্লেখিত আইনজীবী, যিনি বাংলাদেশে কোনো বড় মাপের বা সুপরিচিত আইনজীবী নন, তিনি মোট ১৬ কোটি টাকা শুধু ফি হিসাবেই পেয়েছেন। এছাড়াও অন্যান্য খরচ দেখিয়ে নিয়েছেন আরও ১০ কোট টাকা। অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে তার পকেটে গেছে মোট ২৬ কোটি টাকা, যা বিস্ময়ের সমস্ত রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
বিষয়টি মহামান্য হাইকোর্টের কোম্পানি বিষয়ক বেঞ্চের মাননীয় বিচারপতি খুরশিদ আলম সরকারের নজরে এলে তিনি প্রকাশ্য আদালতেই অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, গোটা ভারত উপমহাদেশে এমন কোনো আইনজীবী নেই যিনি ১৬ কোটি টাকা ফি নিতে পারেন। সেই আইনজীবী ১৬ কোটি টাকা ফি নেওয়ার কথা মহামান্য হাইকোর্টে প্রতিবেদন দিয়ে স্বীকার করেছেন। মাননীয় বিচারপতি খুরশিদ আলম সরকারের মতামত পাওয়ার পরই সবাই নড়ে চড়ে বসে ঘটনার গভীরে প্রবেশ করেন, এবং জানতে পারেন আরো বহু ঘৃণ্য এবং লজ্জাজনক ঘটনার কথা। এগুলো থলের বিড়ালের মতোই বেরিয়ে পড়লো। এটি পরিস্কার হয়ে গেলো যে ড. ইউনূস প্রচুর টাকা এই আইনজীবীকে উৎকোচ হিসাবে দিয়ে তাকে প্রভাবিত করেছিল তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো তুলে নেওয়ার জন্য আর সেভাবেই মামলাগুলো তুলে ফেলা হয়েছে।
ড. ইউনূসের আইনজীবী, ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান আদালতেই বলেছিলেন ফি হিসাবে তিনি পেয়েছেন ২০ লক্ষ টাকা। ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান দেশের একজন প্রসিদ্ধ এবং প্রজ্ঞা সম্পন্ন আইনজ্ঞ। যেখানে তিনি ফি হিসেবে পেয়েছেন ২০ লক্ষ টাকা সেখানে কর্মচারীদের অতি স্বল্প পরিচিত আইনজীবী এডভোকেট ইউসুফ আলি কিভাবে ১৬ কোটি টাকার মতো অবিশ্বাস্য পরিমাণ ফি পেতে পারেন তা সবাইকে ভাবিয়ে তোলেছে। এর পর পরই সেই এডভোকেট সাহেবের সকল ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা হয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী গত ৪ আগস্ট মাননীয় বিচারপতি খুরশিদ আলম সরকার প্রকাশ্য আদালতে এই অভিমত প্রকাশ করেছেন যে ড. ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালনা পর্ষদ শ্রম আইন লংঘন করে ‘কর্মচারিদের অংশগ্রহণ তহবিল’ এর টাকা ট্রেড ইউনিয়ন ও আইনজীবীর ব্যাংক হিসাবে হস্তান্তরের অভিযোগের সত্যতা রয়েছে কিনা সে বিষয়ে তদন্ত করা উচিত। কর্মচারিদের সেই আইনজীবী, এডভোকেট ইউসুফ আলি আদালতে প্রদান করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন তিনি ফি হিসাবে ১৬ কোটি টাকাসহ মোট ২৬ কোটি টাকা গ্রহণ করেন। এই প্রতিবেদন প্রাপ্তির পরই বিচারপতি সরকার উপরোক্ত অভিমত ব্যক্ত করেন। তা-ছাড়া ড. ইউনুসের টেলিকম কোম্পানি বিদেশে টাকা পাচারে জড়িত কিনা সেটি তদন্তের কথাও মহামান্য আদালত ব্যক্ত করেছেন। এরই মধ্যে উক্ত কোম্পানির ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বহু টাকা উৎকোচ দিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেওয়ার অভিযোগগুলো অতি কদর্যপূর্ণ হলেও, এখবর এখনো পর্যন্ত বিশ্ববাসী জানেন না। ইউনুস সাহেবের এ ধরনের প্রতারণা এবং শঠতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ বিশ্ববাসী জানলে তার সাজানো ভাবমূর্তি অচিরেই চূর্ণ হবে। বিশ্ববাসী জানতে পারবে তিনি আসলে কেমন মানুষ, জানতে পারবে তিনি পৃথিবীর মানুষকে যে ভাবমূর্তি দেখাচ্ছেন, তা আসলেই মেকি। তার রঙিন রং দিয়ে সাজানো মুখোশ খুলে ফেলা সমস্ত মানুষের জন্যই প্রয়োজন। একজন মানুষ তার ভুয়া এবং মেকি ভাবমূর্তি প্রদর্শন করে বিশ্ববাসীকে বোকা বানিয়ে তাদের থেকে সম্মাননা গ্রহণ করুক, সেটা কাম্য হতে পারে না।
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে, তার প্রতি বিশ্বলয়ের মানুষের ঘৃণা আরো বাড়বে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় এটাই প্রথম নয়। চাকরির বয়স পার হয়ে যাওয়ার পরেও তিনি অন্যায়ভাবে, আইন লংঘন করে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান পদে থাকার ব্যবস্থা করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ প্রদান করে তিনি তার লোভ এবং আইন অমান্য করার প্রবণতা প্রমাণ করেছিলেন। সরকার তার এই বেআইনি আবদার শোনেনি বলেই তিনি পদ্মা সেতুতে অর্থ না দেওয়ার জন্য বিশ্ব ব্যাংককে প্রভাবিত করেন, যা অবশ্য শাপে বর হয়েছে।
বিশ্বব্যাংককে প্রভাবিত করার ঘটনা এটাও প্রমাণ করে যে ড. ইউনূসের মধ্যে দেশপ্রেম বলে কোনো কিছু নেই। যে ব্যক্তি নিজের দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে, তিনি বিশ্ব মানবতার জন্য ভূমিকা রাখবেন, সেটি অবান্তর বৈ কিছু নয়, আর তাই তার আসল রূপটি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যাশা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন দেশে আমাদের দূতাবাসগুলো মহামান্য হাইকোর্টের মন্তব্যগুলো ব্যাপকভাবে প্রচার করবে।
লেখক : আপীল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি