কবি সুকান্ত’র ভাষায় যেন-‘নতুন ফসলের সুবর্ণ যুগ আসে।’ ‘এই হেমন্তে কাটা হবে ধান, আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলের বান’। নবান্নের বর্ণনা তিনি তাঁর ‘এই নবান্নে’ কবিতায় এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন। হেমন্ত ঋতুর দিন-রাতের অবিশ্রান্ত শ্রমে কৃষকের ঘরে ওঠে সোনার ধান। বাংলার গ্রাম-গঞ্জ মেতে ওঠে নবান্নের উৎসবে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পঞ্জিকামতে অগ্রহায়নের প্রথম দিনে একটি হলো নবান্ন উৎসব।
এ উৎসব উপলক্ষে বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নবান্নের আনন্দে মেতে উঠে। ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ মাছের মেলা। এই উৎসবকে কেন্দ্র করেই প্রতিবছর মাছের সবচেয়ে বড় মেলা বসে উথলীতে। মাছের মেলা বসে জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলার ওমরপুর, রনবাঘা, হাটকড়ই, ধুন্দার ও দাসগ্রাম এবং শেরপুর উপজেলার বারদুয়ারীহাট, সকালবাজার, গোশাইপাড়া মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে। তবে এ বছর নন্দীগ্রাম উপজেলার ওমরপুর মেলায় ৪৫ কেজি ওজনের সবচেয়ে বড় বাঘাইড় মাছটির দাম হাকা হচ্ছে ৫৫ হাজার টাকা।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুযায়ী হিন্দুরা নবান্ন উৎসব জেলার শিবগঞ্জের উথলী হলেও রথবাড়ি, ছোট ও বড় নারায়ণপুর, ধোন্দাকোলা, সাদল্লাপুর, বেড়াবালা, আকনপাড়া, গরীবপুর, দেবীপুর, গুজিয়া, মেদেনীপাড়া, বাকশন, গনেশপুর, রহবল প্রায় ২০ গ্রামের মানুষের ঘরে ঘরে চলে উৎসব। এই নবান্ন মেলার উদ্যোক্তা হলেও আশপাশের গ্রামের সকল স¤প্রদায়ের মানুষ এখানে কেনাকাটা করতে আসে। এসব মাছের মেলার কথা বলা হলেও ক্ষেত থেকে নতুন তোলা শাক-সবজির পসরাও সাজানো হয় মেলা চত্বরে। এছাড়াও সেখানে নাগরদোলা, শিশু-কিশোরদের খেলনার দোকানও বসেছে। সেই সঙ্গে মিষ্টান্ন ও দইয়ের একটি বড় বাজারও বসানো হয় মেলা চত্বরে।
জনশ্রুতি রয়েছে ‘নবান্ন’ উপলক্ষে নতুন চালের তৈরি পায়েশ-পোলাও, পিঠা-পুলিসহ রকমারি খাদ্য-সামগ্রী পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হয়। সামাজিকভাবে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী পালন করা হয় এবং ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুযায়ী নানা আচার-অনুষ্ঠান। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী অন্ন ল²ীতুল্য। তাই তারা এ দেবীর উদ্দেশ্য পূজা-অর্চনার আয়োজন করে। এছাড়া, নবান্ন অনুষ্ঠানে নতুন অন্ন পিতৃপুরুষ, দেবতা, কাঁক ইত্যাদি প্রাণীকে উৎসর্গ করে এবং আত্মীয়জনকে পরিবেশন করার পর গৃহকর্তা ও পরিবারবর্গ নতুন গুড়সহ নতুন অন্ন গ্রহণ করেন।
নতুন চালের তৈরি খাদ্যসামগ্রী কাঁককে নিবেদন করা নবান্নের অঙ্গ একটি বিশেষ লৌকিক প্রথা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কাঁকের মাধ্যমে ওই খাদ্য মৃতের আত্মার কাছে পৌঁছে যায়। এই নৈবেদ্যকে বলে ‘কাঁকবলী’। অতীতে পৌষ সংক্রান্তির দিনও গৃহদেবতাকে নবান্ন নিবেদন করার প্রথা ছিল। হিন্দু শাস্ত্রে নবান্নের উল্লেখ ও কর্তব্য নির্দিষ্ট করা রয়েছে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, নতুন ধান উৎপাদনের সময় পিতৃৃপুরুষ অন্ন প্রার্থনা করে থাকেন। এই কারণে হিন্দুরা পার্বণ বিধি অনুসারে নবান্নে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করে থাকেন। শাস্ত্র মতে, নবান্ন শ্রাদ্ধ না করে নতুন অন্ন গ্রহণ করলে পাপের ভাগী হতে হয়। বাংলাদেশে বসবাসকারী অন্যান্য ধর্মাবলম্বী এবং আদিবাসী সমাজেও নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি-নীতি, বিশ্বাস ও প্রথা অনুযায়ী নবান্ন উৎসব পালন করা হয়। এছাড়াও মুসলিম কৃষক সমাজে নতুন ফসল ঘরে ওঠার জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্য বাড়ি বাড়ি কোরানখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, মসজিদ ও দরগায় শিরনির আযোজন করা হয়।
১৮ নভেম্বর শুক্রবার সকল থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সরেজমিনে জেলার নন্দীগ্রাম উপজেলার ওমরপুর ও রনবাঘা বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, মাছের দোকানে ১ থেকে ৪৫ কেজি ওজন পর্যন্ত মাছ রয়েছে। ৪৫ কেজি ওজনের সবচেয়ে বড় বাঘাইড় মাছটি দাম হাকা হচ্ছে ৫৫ হাজার হাজার টাকা। এ ছাড়া মেলায় আকারভেদে রুই ৩৫০-৭০০, কাতল ৩০০-৭৫০, বিগহেড ৩০০-৬৫০, সিলভার কার্প ২৫০-৫০০, চিতল ৫০০-১০০০, বাঘাইড় ৫০০-১২০০, বোয়াল ৫০০-১৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়াও শিবগঞ্জের উথলী ও শেরপুরের বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে বসেছে মাছের দোকান। দোকানগুলোতে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রুই, কাতলা, মৃগেল, চিতল ও সিলভার কার্পসহ নানা প্রজাতির মাছ। এসব মেলায় এক কেজি থেকে শুরু করে ১৮ কেজি ওজনের মাছ পাওয়া যাচ্ছে।
তবে এ বছরের মেলায় ৪০ কেজি ওজনের বিশালাকৃতির বাঘাআইড় মাছ আকর্ষণসহ বিশাল বিশাল মাছগুলো মাথার ওপরে তুলে ধরে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতেও দেখা যায়। এছাড়া নতুন আলু বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা কেজি দরে। মিষ্টি আলু ও কেশর (ফল) প্রতি কেজি দেড়শ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
উথলী মাছের মেলার পাশের নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা অসিত সরকার বলেন, প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী মেলাটি যেমন মাছের জন্য বিখ্যাত, তেমনি মেলার দিন নতুন শাক-সবজিতেও ভরপুর থাকে। এ কারণে আশপাশের লোকজন মেলায় ছুটে আসে।
মেলায় মাছ কিনতে এসে বেড়াবালা গ্রামের নজরুল ইসলাম ও গণেশপুর গ্রামের সুখেন দাস বলেন, উথলীর নবান্ন মেলায় বিক্রির জন্য আশপাশের এলাকার পুকুরগুলোতে সৌখিন চাষিরা মাছ মজুদ করে রাখেন।
নন্দীগ্রামের ওমরপুর মেলায় মাছ কিনতে আসা জয় কুমার সরকার বলেন, নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর নন্দীগ্রামের বিভিন্ন বাজারে মাছের মেলা বসে। মাছের মেলাকে ঘিরে ওমরপুর বাজারে উৎসব মুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এবার মাছের দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে।
মেলায় মাছ বিক্রি করতে আসা রজীব হাসান, মোস্তফা হোসেন ও মিন্টু মিয়া জানান, নবান্ন উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে মাছ আনা হয়। বড় বড় ব্যবসায়ীরা এক থেকে দুই লাখ টাকার মাছ মেলায় বেচার জন্য এনেছে। অন্য বছরের তুলনায় এবার ক্রেতা বেশি। তাই মাছ বিক্রি বেশি হবে বলে আশা করছি। মাছের দাম স্বাভাবিক আছে।
এ প্রসঙ্গে শিবগঞ্জের উথলী বাজারের ইজারাদার আল আমিন বলেন, প্রতি বছর এ মেলার আয়োজন করা। এ মেলায় গ্রামবাসী ও মাছ ব্যবসায়ীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ভালো হচ্ছে বেচাবিক্রি।
নন্দীগ্রামের রনবাঘা হাটের ইজারাদার শফিকুল ইসলাম শিরু বলেন, এ হাটে প্রতিবছর নবান্ন উপলক্ষে অতুল মাছ ওঠে, প্রায় অর্ধ কোটির উপরে মাছ বিক্রি হয় এ মেলাতেই।
মেলায় আগত স্থানীয়রা জানান, প্রায় ২’শ বছরের পুরনো এ মেলায় প্রতি বছরই প্রায় কোটি টাকার মতো মাছ বেচাকেনা হয়। এবার মেলায় ৩০ কেজি ওজনের কাতলাসহ বড় বড় মাছ এসেছে মেলায়। বিক্রিও হচ্ছে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে। মেলায় নানা জাতের বিভিন্ন ধরনের মাছ আনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে শিবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মুঞ্জুরুল আলম বলেন, নবান্নের এ মেলায় যেন কোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলার অবনতি না হয় তার জন্য পুলিশ বাহিনী সজাগ রয়েছে।
বিজনেস বাংলাদেশ/ হাবিব






















