ঢাকা সকাল ১০:১৭, শুক্রবার, ২৭শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শখ করে অ্যাকুরিয়ামে রঙিন মাছ পালনই সুচনা

ইঞ্জিনিয়ার বুলবুল এখন সফল রঙিন মৎস্য খামারী

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শুরুতে শখের বসে অ্যাকুরিয়ামের রঙ্গিন মাছ পোষা শুরু করলেও আজ একজন সফল খামারী ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুল্লাহ বুলবুল। লাল,নীল ,হলুদ, কালো সহ অনেক রঙের বাহারী প্রজাতীর রঙ্গিন মাছ সংগ্রহ করে পালন ও পরিচর্যা করে তার নয়ন জুড়িয়ে যেত। পাশা-পাশি মনটাও মুগ্ধতায় রঙ্গিন হয়ে যেত। চৌবাচ্চা ভরা রঙিন
মাছের খেলা আর ছুটোছুটি করার দৃশ্য আনন্দিত করতো তাকে। বিভিন্ন দেশের অসংখ্য প্রজাতীর রঙিন অ্যাকুরিয়াম মাছগুলো আকারে ছোট হলেও বেশ সতেজ ও বাহারি রঙের দেখে-বেছে সংগ্রহে এনে পালন করতে যেয়ে তার সাধ জাগে নীজের খামারে প্রজননের মাধ্যমে এসব মাছ উৎপাদন করার।

প্রথম দিকে বাড়িতে কয়েকটি ড্রামে এই মাছ চাষ শুরু করেন। সেখানে মাছ বড় হতে থাকে কয়েক মাস পর বিক্রিও করেন। এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চার বছর আগে উপজেলায় বানিজ্যিক ভাবে গড়ে তুলেছেন বুলবুল এগ্রোফার্ম নামে একটি অ্যাকুরিয়ামের রঙিন মাছের খামার। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী এলাকার কৃষি প্রিয় হাবিবুল্লাহ বুলবুল ঢাকা পলিটেকনিক ইনিস্টিটিউড থেকে ইলেকট্রনিক্সের উপড় ডিপ্লোমা করে একটি স্যাটেলাই টেলিভিশনের মাস্টার কন্ট্রোল ইঞ্জিয়ার পদে দায়িক্ত পালন করছেন। তার সহধর্মীনি নাসিমা খাতুন রাজধানীর তেঁজগাও সরকারী বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষিকা। সংসার জীবনে তাদের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে। প্রকৃতি প্রেমি বুলবুলের কৃষিকাজ পছন্দের জায়গা হওয়ায় পেষাগত কর্মের ফাঁকে অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে গড়ে তুলেছেন বাহারী রঙের রঙিন মাছের খামার। এরই সাথে সাথে এই প্রতিষ্টঠানেই ক্ষুদ্র পরিষরে যুক্ত করেছেন পাখি ও উন্নত জাতের গরু,ছাগলের খামার আর সেই সাথে ফলজ আর বনজ বাগান।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়,২০১৭ সালে উপজেলার তারাব পৈরসভার গন্ধর্বপুর নামাপাড়া এলাকায় ৫৪ শতাং জমির উপড় বুলবুল এগ্রো ফার্ম নামে এ প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এ খামারে উৎপাদিত রঙিন মাছ আস-পাশের জেলা সহ ঢাকার অ্যাকুরিয়ামের দোকান গুলোতে সরবরাহ হয়ে থাকে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় একই সাথে এ প্রতিষ্ঠানেই ক্ষুদ্র পরিসরে একের ভেতর চার-চারটি খামার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ছোট্র এ প্রতিষ্ঠানটির গেটের কাছেই রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির জন্য একটি সেড। একটু সামনে বাড়লেই ছোখে পড়বে রঙিন মাছ পালন ও উৎপাদরের জন্য তৈরী করা সারি,সারি চৌবাচ্চা। যেখানে রয়েছে বাহারী সব
রঙ্গিন মাছ। তার পিছনেই তৈরী করা হয়েছে বিভিন্ন উন্নত জাতের গরু ও ছাগল পালনের জন্য একটি ঘর। ডান দিকে বেশ কিছু জায়গা নিয়ে রয়েছে একটি পেপে বাগান এর ফাঁকে ফাঁকে রোপন করা রয়েছে বিভিন্ন বনজ ও ফলজ গাছের চাড়া। ক্রেতাদের চাহিদা থাকায় হরেক রকম রঙিন মাছের সাথে ছোট-বড় বিভিন্ন সাইজের অ্যাকুরিয়াম সহ অন্যন্য সামগ্রীও বিক্রি করা হয় এখানে। তার রঙিন মাছের খামারে প্রতিদিন মাছ নিতে ও খামার দেখতে উপজেলার আস-পাশ সহ দুরদুরান্ত থেকে ছুটে আসছে অনন্য সৌন্দযের্র রঙিন মৎস্য পোষা লোকজন।

ইঞ্জিয়ার হাবিবুল্লাহ বুলবুল বলেন, কুষ্টিয়ার গ্রামীন জনপদে আমার জন্ম হলেও বাবা সরকারী চাকরীজীবি হওয়ায় ঢাকাতেই আমার বেড়েওঠা। তবুও কৃষি আমার পছন্দের জায়গা। পেষাগত জীবনে আমি একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশনের মাস্টার কন্ট্রোল ইঞ্জিনিয়ার পদে দায়িক্ত পালন করলেও কর্ম ব্যস্ততার মাঝেও কৃষি প্রীতি আমাকে টানে। ১৯৯২ সালে কর্মে যোগদান করি। কাজের ফাঁকে বাসার বান্দায় টবে বিভিন্ন গাছের চারা রোপন ও পরিচর্যা করে সময় কাটাতাম। অ্যকুরিয়ামে রঙিন মাছ পোষা এবং ছোট্র ছোট্র ড্রামে মাছের রেনু ফোটানো সখ ছিল। কিছুদিন পরপরই মাছগুলো ডিম দিতো । এভাবে চলতে চলতে আমার মাছের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এভাবেই আস্তে আস্তে রঙিন মাছের খামার করার পরিকল্পনা মাথায় আসে।

ধীরে ধীরে এই নেশা থেকেই ছোট্র পরিষরে একটা রঙ্গিন মাছের খামার তৈরীতে হাত দেই । দীর্ঘ চাকরী জীবনের সঞ্চয় দিয়ে রূপগঞ্জে বাড়ি করার জন্য কেনা জায়গাটায় পরিশেষে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করি। প্রতিষ্ঠা করি বুলবুল এগ্রোফার্ম নামে রঙিন মাছের খামার।
হাবিবুল্লাহ বুলবুল বলেন, ছোট বেলা থেকেই আমার মনে একটি সুপ্ত বাসনা ছিল কৃষিতে কিভাবে উন্নতি করে উপার্যন করা যায়। যেখানে অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তিও পাওয়া যায়। আমি দেখলাম রঙিন মাছ চাষ করে মানসিক ভাবে আনন্দ পাচ্ছি আবার অর্থ ও আয় হচ্ছে। আমার খামারে ১৪ ফিট দৈর্ঘ ও ৭ ফিট প্রস্থের প্রায় ২০টি চৌবাচ্চাতে এক লাখ টাকার বিভিন্ন জাতের রঙিন মাছ কিনে চাষ আরম্ব করি। এখানে আমার রঙিন মাছের জন্য চৌবাচ্চা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক জিনিস পত্র ও রঙিন মাছ ক্রয়সহ মৎস খাতে ৪ থেকে ৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। গত মাসে ৪৫ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেছি। এখনো খামারে সাড়ে তিন থেকে চার লক্ষ টাকার মাছ রয়েছেব ।

এখানে বাহারী রঙ ও জাতের রঙিন মাছ চাষ করছি। বর্তমানে আমার খামারে রয়েছে হোয়াইট মলি, গোল্ডেন মলি, গোলডাস্ট মলি, অরেন্ডা গোল্ডফিশ, কমেট, কইকার্প, মিক্সড গাপ্পি, স্নেক স্ক্রিন গাপ্পি এবং ফাইটার সহ বেশ কিছু প্রজাতি। রঙিন মাছের খাবার হিসাবে অ্যাকুরিয়াম ফিশ ফিড খাওয়াতে হয়। এছাড়া মাঝে মাঝে আলু সিদ্ধ,শসা, গাজর সিদ্ধ খাওয়ানো হয়। সঠিক নিয়মে পালন করলে রোগ খুব কম হয়। আর রোগ হলে বিভিন্ন মেডিসিন এবং ট্রিটমেন্ট দিতে হয়। খামারে এ সমস্থ রঙিন মাছের পোনা উৎপাদন করে অ্যাকরিয়াম দোকানীদের কাছে বিক্রি করছি আবার অনেক ক্রেতা খামারে এসে কিনে নিয়ে যায়। প্রতি পিছ রঙিন মাছ জাত ও আকার বেধে বিশ টাকা থেকে শুরু করে দুই হাজার ,তিহাজার টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। প্রতি মাসে বিভিন্ন প্রজাতির রঙিন মাছ ও অ্যাকুরিয়াম সামগ্রী বিক্রি করে পয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।

এসব মাছ নিয়ে দেশে গবেষণা করে দেশেই অ্যাকুরিয়াম ফিশের জাতের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। সহজ চাষ পদ্ধতি বের করা গেলে আমাদের নতুন আয়ের এ পথ আরও সুগম হবে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা রঙিন মাছ চাষে আগ্রহী হতো। সরকারের প্রয়োজনে এ বিষয়ে মৎস্য চাষীদের সহযোগিতা করা।
তিনি আরও বলেন, মাটির ঘ্রান আর কৃষি প্রীতি আমাকে টানে তাইতো রঙিন মাছ চাষের পাশা-পাশি আমার খামারে একদিকে উন্নত জাতের গরু ও ছাগল পালন করছি এগুলোকে কুরবানীর ঈদের সময় বিক্রি করার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে একটি পেপে বাগান। পেপে গাছের ফাঁকে ফাঁকে রোপন করা হয়েছে হরেক রকম ফলজ ও বনজ গাছের চাড়া। খামারের একটি ছোট্র সেডে বাহারী প্রজাতির বেশ কিছু পাখি পালন করছি । এগুলোও ডিম দিচ্ছে বাচ্চা ফোটাচ্ছে । ক্রেতা দরর্শনার্থীদের কাছে বিক্রিও করছি।

উপজেলার রূপসী এলাকা থেকে রঙিন মাছ কিনতে আসা ক্রেতা ইমন হাসান জানান, অ্যাকুরিয়ামের জন্য মাছ নিতে এসেছি। অনেক প্রজাতির মাছ থেকে পছন্দ করে গোল্ডফিশ, কমেট, কইকার্প, স্নেক
স্ক্রিন গাপ্পি কিনলাম। খামারে অসংখ্য মাছ থেকে বেছে কিনতে পেরে ভাল লাগছে। সাশ্রয়ী মূল্যে মাছ কিনতে পেরেছি এবং রঙিন মাছ পালন বিষয়ক অনেক দিক নির্দেশনাও পেয়েছি।

উপজেলার তারাব পৌর কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম মনির বলেন, তারাব পৌরসভার গন্ধর্বপুর এলাকায় বুলবুল এগ্রো ফার্মের চৌবাচ্চায় বিভিন্ন দেশিয় হরেক রকম প্রজাতির রঙিন মাছের সমারোহ দেখে মন জুড়িয়ে যায়। খামারের রঙিন মাছ দেখে এলাকার অনেকেই এখন বাড়িতে সৌন্দের্য বৃদ্ধির জন্য অ্যাকুরিয়ামে রঙিন মাছ পোষছেন। এতে করে উপজেলায় অ্যাকুরিয়ামে মৎস্য চাষে সম্ববনা তৈরী হয়েছে।

রূপগঞ্জ উপজেলা প্রানী সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ রিগান মোল্লা জানান,বুলবুল এগ্রোফার্মে আমি নিয়মিত পরিদর্শন করে থাকি। গবাদিপশু পালনে প্রতিষ্ঠানটিকে সকল প্রকার পরামর্শ ও চিকিৎসা সহযোগিতা দিয়ে থাকি। খামারের মালিক যথেষ্ঠ সচেতন তিনি প্রাকৃতিক খাবার পরিবেশনে গুরুত্ব দিয়ে সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে পশু পালন করছেন।

রূপগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তাছমিয়া তাছমীম বলেন, এখন আমাদের দেশে অ্যাকুরিয়ামে রঙিন মাছ পালন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শৌখিন মানুষ বাসা-বাড়িতে ,শপিংমল, হোটেল, রেস্টুরেন্ট এমনকি দোকানেও এখন অ্যাকুরিয়াম শোভা পাচ্ছে। মাছ চাষীদের এই সেক্টরে আগ্রহী করা গেলে এবং সঠিক প্রজন্ন ও চাষ পদ্ধতি অনুস্বরণ করলে বাংলাদেশের চাহিদা মিটিয়েও বিদেশে রপ্তানী করে এই খাতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অপার সম্বনা রয়েছে। সে লক্ষেই আমরা চাষিদের পরামর্শ ও সেবা দিয়ে সার্বক্ষনীক সহযোগিতা করে থাকি। আমি এখানে সদ্য যোগদান করার কারণে এ ফার্মে এখনো পরিদর্শনে যাওয়া হয়নি। তবে অফিসের স্টাফদের কাছ থেকে বিস্তারিত খোঁজ নিয়েছি। প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে সকল প্রকার পরামর্শ ও সহযোগিতা করব।

বিজনেস বাংলাদেশ/ bh

এ বিভাগের আরও সংবাদ