ঢাকা রাত ১১:৩৮, শুক্রবার, ৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

একটি ব্রিজের জন্য শত বছর অপেক্ষা

ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো পারাপারে ঘটছে দুর্ঘটনা

এপারে খুলনা আর ওপারে সাতক্ষীরা জেলার লাখো মানুষ একটি ব্রিজের জন্য শত বছর অপেক্ষা করছে। দু’জেলার মানুষ প্রতিদিন নড়বড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাকোঁ পারাপারে ঘটছে দুর্ঘটনা। বর্তমান সরকার কপোতাক্ষ নদের দু’পাড়ের লাখ লাখ মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাগবে ২০১১ সালের নভেম্বর একনেকর সভায় ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকা নদ খননে বরাদ্ধ দেন। কপোতাক্ষ নদ খনন হলো, ফিরে পায় নতুন জীবন। সত্যি হলো স্বপ্ন। আবার যখন জীবীকার চালিকা শক্তি স্বচল হতে শুরু হলো তখন নদ ভরাটের দুচিন্তা ভর করেছে। খুলনার পাইকগাছায় কপিলমুনি থেকে সাতক্ষীরা সদর হয়ে সরাসরি কলিকাতা যাওয়ার সড়ক নির্মাণে স্বপ্ন দেখেন প্রায় শত বছর পূর্বে আধুনিক বিনোদগঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু। সে মতো টাকাও সংগ্রহ করে ছিলেন তিনি।

তৎকালীন কিছু প্রতিবন্ধকতায় সে সময়ও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি ব্রিজ নির্মাণ। তবে তৎকালীন সময় ব্রিজ নির্মাণে টাকা কলিকাতার ব্যাংকে জমা রাখেন বলে তার জীবনি গ্রন্থ থেকে জানা যায়। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় এলাকাবাসীর দীর্ঘদীন ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করে কপিলমুনি কপোতাক্ষ নদের উপর ব্রিজ নির্মাণে। তারই ফলশ্রæতিতে ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সকল প্রস্তুতী সম্পূর্ণ করে ব্রিজ নির্মাণ কাজে হাত দেয়। কাজ কিছু দিন চলার পর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম দুর্নীতির ফলে বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় ব্রিজের আংশিক কাজ সম্পূর্ণ হয়। পরবর্তীতে পলি পড়ে কপোতাক্ষ নদের মৃত্যু হয়। সে সাথে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম ও স্বপ্নের মৃত্যু হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, তৎকালিন সময় কপিলমুনি-সাতক্ষীরার জেঠুয়া ব্রিজ নির্মাণ কাজে ব্যয় ধার্য করা হয় ১ কোটি ৯৩ লাখ ৪২ হাজার ৯০০শত ১৯ টাকা ৫৫ পয়সা। কাজের মান প্রশ্নে পরবর্তীতে তা বৃদ্ধি পায় ২ কোটি ৩৬ লাখ টাকায়। নির্মাণের দায়িত্বপায় এন হক এসোসিয়েট নামক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কার্যক্রম শুরু করে ২০০০ সালের ১২ এপ্রিল।

এরপর ঐ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি ২০০৩ সালের ১২ নভেম্বর পর্যন্ত আংশিক কাজ করে আইএফআইসি ব্যাংক খুলনা শাখা হতে ১ কোটি ৬৭ লাখ ৭২২টাকা উত্তোলণ করে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। পরবর্তী পর্যায় বিষয়টি নিয়ে আদালত পর্যন্ত গড়ায়। খুলনা মহানগর হাকিম আদালতে দায়েরকৃত মামলা নং পি-৫৮/০৬ ধারা ৪০৬/৪২০/১০৯/৩৪। যার ফলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নামে মামলাসহ নানা জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারনে ব্রিজ নির্মাণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ব্রিজটির বাকী কাজ সমাপ্ত করতে ইসলাম গ্রæপ নামের আরো একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পুণঃরায় উক্ত নির্মাণ কাজ শুরু করে। সে সময় সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড কপোতাক্ষ নদের ¯্রােত বাঁধা পাবে মর্মে একটি চিঠি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়ায় ব্রিজ নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু নদের বক্ষে কংক্রিটের ১৮টি পিলার মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ২০০৮ সালে সেনাবাহিনী নির্দেশে পিলারের উপরে অংশ ভেঙ্গে ফেলা হয়। পরবর্তীতে নদ খনন করা হলে মাটির নিচের অংশ আজও অপসারণ করা হয়নি। খননে জেগে উঠা পিলারগুলো একদিকে জোয়ার-ভাটা ও নৌযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে অন্যদিকে নদের বক্ষে পলি পড়ে ভরাট হচ্ছে নদ। স্থানীয়রা জানান-ভাঙ্গা পিলারে জোয়ার ভাটায় বাঁধা সৃষ্টি হয় নিয়মিত। যার কারণে নদেতে পলি জমা হচ্ছে। আর সে কারণে কপোতাক্ষ নদের আবারও মৃত্যুর আশঙ্কা করেছেন তাঁরা।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত এখনই যদি ঐ পিলার সম্প্রসারণ না করা হয়, তবে ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকা ভেস্থে যাবে আবারও পলি জমে। কপিলমুনি ইউনিয়ানের চেয়ারম্যান কওসার আলী জোয়াদ্দার বলেন আমরা নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছি বর্তমান সরকারের কারণে। এলাকার মানুষের সংগ্রামের ফসল কপোতাক্ষ নদ খনন। তা যদি আবার ভরাট হয় ভাঙ্গা পিলারের কারনে, তবে তা হবে দুঃখ জনক। একদিকে নির্মাণ কাজে কাল্পনিক অযোতিক যুক্তি, মিথ্যা তথ্য সরবরাহ, অনিয়ম দুর্নীতি এবং ক্ষতিগ্রস্থদের ন্যায্য পাওনা না পাওয়া মামলায় ২২ বছরেও সম্পূর্ণ হয়নি কপিলমুনি কপোতাক্ষ নদে ব্রিজ। আর খুলনা-সাতক্ষীরা জেলার লাখো মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো প্রতিদিন পারাপার হচ্ছে। এমনকি প্রায়শ মোটরসাইকেল, ভ্যান গাড়ী চালকসহ নদে পড়ছে। আর মালামাল মাথায় করে ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে মানুষ।

অন্যদিকে নদের বক্ষে অসমাপ্ত ব্রিজের ১৮টি কংক্রিটের ভাঙ্গা পিলার এখন কপোতাক্ষ নদের গলার কাঁটা হয়েছে। বাণিজ্যিক শহর কপিলমুনিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, স্কুল-কলেজসহ চিকিৎসা নিতে ঝুঁকি নিয়ে যাতাযাত করতে হয়। তবে নতুন ডিজাইনে ব্রিজ নির্মাণ করা হবে বলে জানা যায়। তালা উপজেলা চেয়ারম্যান ঘোষ সনৎ কুমার বলেন, আমি আশাবাদী ব্রিজটি হলে এলাকার লাখ লাখ মানুষের যাতায়াতে খুবই উপকৃত হবে। তালা উপজেলা প্রকৌঁশলী অফিস সূত্রে জানাযায়, কপিলমুনি-কানাইদিয়া সংযোগ সেতুটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। তালা-কলারোয়া এমপি মুস্তফা লুৎফুল্লাহ বলেন, আমার মনে হয় কপিলমুনি বাজারে জায়গা পাওয়া ও স্বল্পতার জন্য ব্রিজটি সম্পন্ন হয়নি। কয়রা-পাইকগাছা এমপি মো. আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, উন্নয়নের যে মহা কর্মযজ্ঞ চলছে সে গুলোর দিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। বাণিজ্যিক শহর কপিলমুনি ব্যবসায়ী প্রভাত বসু, গোবিন্দ বসুসহ কয়েকজন বলেন, এখানে ব্যবসা হলেও বাড়ি নদের ওপারে তালায় বাড়ি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের দুর্ভোগ লাগবে দ্রুত অপেক্ষার প্রহর শেষ করার দাবী জানান।

বিজনেস বাংলাদেশ/ হাবিব

এ বিভাগের আরও সংবাদ