বেড়েই চলছে নির্মাণ সামগ্রী রড-সিমেন্টের দাম। চড়া দামে এসব সামগ্রী কিনতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ওই শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বহু নির্মাণশ্রমিক। মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। নির্মাণ সামগ্রীর মধ্যে তিনটি পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিক বেড়েছে। এগুলো রড, এঙ্গেল ও সিমেন্টের মূল্য, যা এই শিল্পের ক্ষেত্রে অপরিহার্য উপাদান। মূল্যবৃদ্ধির হার স্তর ভেদে ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ যে রড ও এঙ্গেলের বাজারমূল্য ছিল প্রতি টন ৫৫ হাজার টাকা, মাত্র ৪ মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার টাকায়। সমান তালে বস্তা প্রতি ৫০-৬০ টাকা বেড়েছে সিমেন্টের দাম।
অল্প সময়ের ব্যবধানে এই মূল্যবৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়েছে খোদ সরকারও। তবে, শিল্প মালিকরা এই দাম বৃদ্ধিকে স্বাভাবিক বলছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজার এবং ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ নির্মাণ সামগ্রীর দাম বেড়েছে। মূল্য বৃদ্ধির প্রধান ৩টি কারণ চিহ্নিত করেছে ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে বিশ্ববাজারে রডের কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি এবং সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের এক্সেলরোড আদেশে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের বাজারে নিত্য অপরিহার্য যেকোনো একটির পণ্যের মূল্য বাড়লে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। কারণ রড, এঙ্গেল ও সিমেন্ট ব্যবহৃত হয় সড়ক সংস্কার, হাউজিং ব্যবসা ও বাড়ি-ঘর নির্মাণে। ইতোমধ্যে যারা দরপত্রে যোগ্য হয়ে নির্মাণকাজ শুরু করছেন, মাঝপথে এসে এসব পণ্যের দাম বাড়ায় তারা এখন ব্যয় বাড়ার মুখে পড়েছেন।
ফলে অনেকে তাদের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, এর প্রভাব পড়বে সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায়, আর তার প্রভাব পড়বে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাজনীতিতে। নির্মাণ সামগ্রীর এই উদ্বেগজনক মূল্য বৃদ্ধিতে খোদ সরকারও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি উত্তরণে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে এ বিষয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উদ্বেগ জানিয়ে বলা হয়, গত বছরজুড়ে নির্মাণ সামগ্রীর দাম স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু নতুন বছর শুরু সঙ্গে সঙ্গে বাজারমূল্য ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধিতে আবাসন ব্যবসায় ধস নেমেছে। বিশেষ করে রড-সিমেন্টের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যেই অনেকেই ভবন নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সেক্টরের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। গত কয়েক দশক ধরে আবাসন ব্যবসায়ীদের হাত ধওে ছোট, বড় ও মাঝারি সব মিলে রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে বহুতল ভবন নির্মাণ করে লাখ লাখ পরিবারের আবাসনের সংস্থান হয়েছে। জানতে চাইলে সাবে অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, নির্মাণ সামগ্রী বলে কোনো কথা নয়, নিত্য ব্যবহার্য্য জিনিসপত্রের হঠাৎ মূল্য বৃদ্ধিতে চাপ সৃষ্টি হয়। সামগ্রিকভাবে জিডিপির ওপরে বড় ধরনের চাপ না পড়লেও আনুপাতিকভাবে কিছুটা প্রভাব থেকে যায়। দাম বৃদ্ধির কারণে কাজ পুরোপুরি বন্ধ না হলেও আবাসন খাতে খানিকটা প্রভাব পড়বে এটা নিশ্চিত। এতে কিছু শ্রমিক বেকার হবে। আবাসন ব্যবস্থায় ধস নামবে। তবে, মূল্য বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ কি তা সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত। কনজ্যুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত রডের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও গত বুধবার থেকে তা নিম্নমুখী।
গত কয়েক মাস ধরে যে রড বিক্রি হয়েছে ৭০ থেকে ৭২ হাজার টাকা তা কমে ৬৫ হাজারের নিচে নেমে এসেছে; সেই অর্থে দাম নিম্নমুখী বলা যায়। তবে যেকোনো পণ্যের দাম যুক্তিসংগত পর্যায়ে থাকা উচিত। এটা না হলে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাবে। দামটি যুক্তিসংগত পর্যায়ে থাকাটা বাঞ্ছনীয়। তিনি বলেন, অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধি কাম্য নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যদি কারো কারসাজি থাকে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর যদি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণে এটা হয়ে থাকে তাহলে সেটাও খতিয়ে দেখা সরকারের দায়িত্ব। কারণ বাংলাদেশে নির্মাণ সামগ্রীর ওপরে হাই প্রোটেকশন আছে, এটা কমিয়ে আনা দরকার। তাহলে প্রতিযোগিতা বাড়বে, কার্যকরী হবে এবং ভোক্তারা উপকৃত হবে। জানতে চাইলে শিল্প সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি নিয়ে সম্প্রতি সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আমরা সভা করেছি। সভায় দাম বৃদ্ধির কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যা করেছেন। আশা করছি, শিগগিরই ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে চলে আসবে।


























