চলছে শীতকাল। শীত মানেই তো পিঠা-পুলির দিন। পিঠা ছাড়া বাংলার গ্রাম-গঞ্জের মানুষের শীত যেন পরিপূর্ণই হয় না। আধুনিকতার ছোঁয়ায় পারিবারিক ও সমাজ জীবন থেকে পিঠা তৈরির আয়োজন কমে যাচ্ছে। তবে এ ঐতিহ্য ধরে রেখেছে একশ্রেণির মৌসুমী নারী-পুরুষ ব্যবসায়ী। মাদারীপুর শিবচর উপজেলার বিভিন্ন রাস্তার পাশে ও পাড়া মহল্লায় বিভিন্ন অস্থায়ী দোকানে বানানো পিঠা খাওয়ার ধুম পরেছে ।
শিবচর সদরে লালন মঞ্চ সংলগ্ন রাস্তার পাশে এক কোনায় ছোট্ট কোয়েকটি ভ্রাম্যমাণ দোকান বসেছে। শীতের সন্ধ্যায় সেখানে পিঠা খেতে ভিড় জমিয়েছেন অর্ধশত তরুণ, বৃদ্ধা ও শিশু।
জ্বলন্ত চুলায় লাকড়ি দিয়ে চার-পাঁচটি মাটির খোলায় চিতই পিঠা বানাচ্ছেন বাবুল মিয়া। চুলার অল্প আঁচে উড়ছে ধোঁয়া। তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু চিতই। আর চুলা থেকে নামানোর পর মুহূর্তেই তা চলে যাচ্ছে অপেক্ষামাণ ক্রেতার হাতে। ক্রেতারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সেই পিঠা কিনছেন। কেউ বা নিয়ে যাচ্ছেন পরিবারের জন্য। কেউ আবার দাঁড়িয়েই খাচ্ছেন। তারা পিঠা খেতে খেতে মজার মজার গল্পে মেতে ওঠেন।
পাশের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় সামলাতে ব্যস্ত শারমিন বেগম। রাস্তার পাশে এসব দোকানে অর্ধশত মানুষ পিঠা কেনার জন্য ভিড় জমিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার অধিকাংশ স্থানে বসেছে অস্থায়ী পিঠা বিক্রির দোকান। অল্প পুঁজি আর কম পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় পিঠা ব্যবসায় নেমেছেন অনেকেই। পুরুষদের পাশাপাশি অনেক নারীও দোকানে পিঠা বিক্রি করছেন। সংসারের পাশাপাশি তারা বাড়তি আয় করছেন। দোকানগুলোয় পিঠার পাশাপাশি থাকছে হরেক ভর্তা। প্রতিদিন বিকেল থেকেই পিঠা বিক্রির ধুম পড়ে মোড়ের দোকানগুলোয়। সন্ধ্যা হলেই বেড়ে যায় ক্রেতা সমাগম, যা গভীর রাত পর্যন্ত থাকে। রসুন-মরিচবাটা, ধনিয়াপাতা বাটা, শুঁটকি, কালোজিরা, সর্ষে ভর্তাসহ নানা রকম উপকরণ মিলিয়ে বিক্রি করা হয় চিতই পিঠা।
সন্ধ্যায় হিমেল হাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে পিঠা খেতে অনেকেই ভিড় জমাচ্ছেন ভ্রাম্যমাণ পিঠার দোকানগুলোতে। এই পিঠার স্বাদ পেতে ভ্যান-চালক, দিনমজুর, শিশু-কিশোর, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষই পিঠার দোকানে ভিড় করছে। পিঠার মধ্যে ভাপা পিঠা ও চিতই পিঠার কদর বেশি। চিতই পিঠা পাঁচ টাকা এবং ভাপা পিঠা ১০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
লালন মঞ্চের সামনে আলমগীর পিঠা খেতে খেতে বলেন, সব ধরনের ক্রেতা এখানে পিঠা খেতে আসে। আবার কেউ কেউ বাড়িতে ছেলে-মেয়েদের জন্যও পিঠা কিনে নিয়ে যান। ব্যস্ততার কারণে বাড়িতে পিঠা খাওয়ার সময় হয়ে ওঠে না। কাজ শেষ করে বন্ধুদের নিয়ে পিঠা খেতে এসেছি। বিভিন্ন ভর্তা দিয়ে পিঠা খেতে ভারি মজা লাগে।
আরেক ক্রেতা আল-আমিন বলেন, ‘শীত আর পিঠা কেমন যেন একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ছোট বেলায় মা পিঠা বানিয়ে দিতো আর সন্ধ্যার সময় স্কুল থেকে পাওয়া নতুন বই নিয়ে পড়তে পড়তে পিঠা খেতাম। সেগুলো স্মৃতি হলেও শীত আসলে পিঠা খেতেই হবে। তাই দোকানে আসা পিঠা খাওয়ার জন্য।’
পিঠা ক্রেতা আব্দুর রহমান জানান, আমরা প্রায়ই এখানে পিঠা খাই এবং পরিবারের জন্য বাসায় পিঠা নিয়ে যাই। কর্ম ব্যস্ততার কারণে চাল ভেঙে আটা করে পিঠা বানানোর সময় সুযোগ আর হয় না । ঝামেলা ছাড়াই স্বল্প দামে হাতের নাগালেই এখন পিঠা পাই। তাই পথের ধারে পিঠাই আমাদের ভরসা।
পিঠা বিক্রেতা আব্দুর রশিদ মিয়া জানান, শীত আসতেই দোকানে কাজের চাপ বেড়ে যায়। পিঠা বানানো থেকে সবকিছু করতে হয়। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত সময় পার হয়। তিনি ৫টি চুলায় পিঠা তৈরি করেন। প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে পিঠা বানানো ও বিক্রি।
পিঠা বিক্রেতারা জানান, ভাপা পিঠা তৈরির উপকরণ হচ্ছে চালের গুঁড়ো, নারকেল, খেজুরের গুঁড়। গোল আকারে পাতিলে কাপড় পেচিয়ে ঢাকনা দিয়ে হাঁড়ির ফুটন্ত পানিতে ভাপ দিয়ে তৈরি হয় ভাপা পিঠা। অন্যদিকে, চালের গুড়ো পানিতে মিশিয়ে মাটির হাড়িতে তৈরি করা হয় চিতই পিঠা।
শিবচরের প্রায় প্রতিটি রাস্তার পাশেই চোখে পড়ে অস্থায়ী পিঠার দোকান। বেশির ভাগ শীতকালেই এসব দোকান বসে থাকে। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে শীত মৌসুমে এই সব দোকান বসে। কিছুটা হলেও পরিবারে আর্থিক সহায়তা করা সম্ভব হয়।





















