কার্গো খালাস বন্ধ রেখে জাহাজে আসা ‘ইউ ব্যাগেজ’ সুবিধার অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের কোটি কোটি লোপাট করছে একটি চক্র। টিআর সুবিধার অপব্যবহার করে জাহাজে করে আনা হচ্ছে বাণিজ্যিক পণ্য।
প্রতি সপ্তাহে শাহ আমানত বিমানবন্দরে দুটি কার্গো ফ্লাইট নামতো। ফিরতি পথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশে রপ্তানির পন্য নিয়ে যেতো। কিন্তু চোরচালান চক্রের কবলে পড়ে বর্তমানে কোন কার্গো ফ্লাইটই নামছে না চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে। ২০১৬ সালে বিদেশি ‘এমিরেটস এয়ারলাইনস’ ঘোষণা না দিয়েই চট্টগ্রাম থেকে পণ্য পরিবহন বন্ধ করে দেয়। এর পর থেকে শুধু ‘ইতিহাদ এয়ারওয়েজ’ চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি পণ্য পরিবহন করছে; কিন্তু সেই বিমান সংস্থার সপ্তাহে দুটি শিডিউল ফ্লাইট থাকলেও পণ্য প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে ফ্লাইট চালায়। কখনো সপ্তাহে একটি আবার কখনো দুটি।
গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে প্রবাসীদের আনা কার্গো খালাস করতে গড়িমসি করার কারণে বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে চট্টগ্রাম থেকে সবজি রপ্তানির রুট। চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনারের একগুঁয়ে সিদ্ধান্তের কারণে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পণ্য আমদানি ও রপ্তানির সুযোগ থাকলেও সেই সম্ভাবনা হাতছাড়া হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, কৃষিপণ্যের রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য থাকলেও গত নয় মাসে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৬৮৭ মিলিয়ন ডলার। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩২.৩৭ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিনই কাঁচা মরিচ থেকে শুরু করে লাউ, কুমড়া, বেগুন, ঢ্যাঁড়স, পেঁপে, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, বরবটি, শিম, টমেটোসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি বিশ্বের অনেকগুলো দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে রপ্তানির পরিমাণ দিন দিন কমছে। তিন বছর আগেও বছরে ১৬ কোটি ডলারের সবজি রপ্তানি হতো। এর পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি কমতে থাকে।
চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে কার্গো ফ্লাইট অনিয়মিত হয়ে যাবার কারনে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে শাকসবজি তথা কৃষিপণ্য রপ্তানি ভয়াবহভাবে কমে গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম সাত মাস জুলাই-জানুয়ারিতে ৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের শাকসবজি রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৫ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের পণ্য। তার মানে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রপ্তানি কমেছে ৪১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় বাজারে ফল ও শাকসবজির এয়ার-শিপিং থেকে মাত্র ১৫ মিলিয়ন ডলার এসেছে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় হয়েছিল ৩৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, রপ্তানি আয় কমেছে ৬০ শতাংশ।
জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয়। গত তিন অর্থবছরজুড়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রপ্তানি খাতেও শক্তিশালী অবস্থান পেয়েছে সবজি।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, বছরে গড়ে ১ হাজার কোটি টাকার সবজি রপ্তানি হয়। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকাসহ অনেক দেশেই যায় বাংলাদেশের সবজি। তবে যুদ্ধ এবং জ্বালানির প্রতিকূলতায় অন্য অনেক পণ্যের মতো সবজির রপ্তানিও গতি হারিয়েছে। মধ্য প্রাচ্যের দেশ গুলোতে সবজি রপ্তানি কমে যাবা কারন হলো শাহ আমানত বিমানবন্দর ও ওসমানী বিমানবন্দরে কার্গো ফ্লাইট নামছে না। ফলে কার্গো ফ্লাইটের ফিরতি পথে রপ্তানি পণ্য পাঠানো সম্ভব হয় নি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সবজি রপ্তানির বাজার ভারত ও চীনের দখলে গেছে। রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রকৃত রপ্তানির মধ্যে ব্যবধান কেবল বাড়ছেই।
চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের পরিচালক ক্যাপ্টেন তাসলিম আহমেদ বলেন, ‘ মধ্য প্রাচ্যের দেশ গুলো থেকে প্রবাসীদের আনা কার্গো পণ্য খালাস নিয়ে জটিলতার কারণে এখন কার্গো বুকিং কমে গেছে। ফলে শাহ আমানতে কার্গো ফ্লাইট অনিয়মিত হয়ে যায়। একারণে চট্টগ্রাম বিমান বন্দর থেকে যে পরিমান সবজি রপ্তানি হতো, সেটি বন্ধ। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের কারণে প্রায় ২৫ টন পন্য ওয়্যারহাউজে আটকা পড়েছে। বিমানবন্দরও রাজস্ব হারিয়েছে এই খাতে।
যদিও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কমিশনার ফয়জুর রহমানের যুক্তি কার্গো খালাস বন্ধ নেই। ব্যাগেজে নিয়ে আসা অবৈধ পন্য ঠেকানোর জন্য কার্গো খালাস বন্ধ করে রাখা হয়েছে। জনপ্রতি এক শত কেজির বেশি পণ্যের কনসাইনমেন্ট আটকে রাখা হয়েছে।
এনবিআরের নীতিমালা পর্যালোচনা করে দেখা যায় একজন প্যাসেঞ্জার কতটুকু পর্যন্ত পন্য আনতে পারবে সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোন সীমারেখা নেই। জানতে চাইলে তিনি প্রতি প্রবাসী ইউ ব্যাগেজে কিভাবে এক হাজার কেজি পণ্য আনতে পারে, সে বিষয়ে বলেন,একজন প্রবাসী যখন বিদেশ থেকে তার কর্মজীবন শেষ করে আসবে তার ব্যাবহারের সব পণ্য নিয়ে আসতে পারবে তার পাসপোর্ট ব্যাবহার করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার তামাকুমন্ডি লেইনে কসমেটিকস, গুঁড়ো দুধ, পারফিউম, বিদেশি সিগারেটের আশি শতাংশই আসে ‘ইউ ব্যাগেজ’ পদ্ধতিতে। প্রবাসী যাত্রীদের নামে জাহাজে বুকিং করা হলেও ব্যাগেজের আশি শতাংশ জায়গা ব্যবহৃত হচ্ছে শুল্ক ফাঁকি দেবার পণ্যে। রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগে অনেকে বিদেশ থেকে আসার সময় কিছু ব্যবহার্য পণ্য আনতো। সেসব পণ্যের একটি অংশ রিয়াজউদ্দিন বাজারের পাইকারি দোকানে বিক্রিও করা হতো। কিন্তু বর্তমানে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তারাই বিনিয়োগ করে প্রবাস থেকে যাত্রীদের সাথে ইউব্যাগেজ বুকিং করাচ্ছে। শতাধিক লাগেজ ব্যবসায়ী এখন নিজেদের পণ্য আনছেন প্রবাসীদের ব্যবহার করে।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে প্রবাসীদের পন্য নিয়ে এমিরেটস এয়ারলাইন্স, জাজিরা এবং ওমান এয়ারের কার্গো ফ্লাইট নামতো চট্টগ্রামে। ফিরতি ফ্লাইটে কম খরচে সবজি নিয়ে যেত ফ্লাইটগুলো। প্রতি কেজি দুইশ টাকার মধ্যে পরিবহনের সুযোগে দেশি রপ্তানিকারকরা মধ্যপ্রাচ্যের বাজার দখলে নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানে দ্বিগুন খরচে সবজি পাঠাতে হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে সবজি রপ্তানি এক প্রকার বন্ধ। একই পরিস্থিতি সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরেও।
বিদেশি কার্গো ফ্লাইট বন্ধ করে দেবার পুরো প্রক্রিয়াটি কিছু অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা পরিকল্পিতভাবে করেছেন বলে অভিযোগ রপ্তানিকারকদের।
সুত্রমতে, চট্টগ্রাম বন্দরের তিন নং জেটিতে খালাস করা হয় জাহাজে করে আনা ইউ ব্যাগেজের পণ্য। প্রতি কনসাইনমেন্ট পণ্যের বিপরীতে তিন লক্ষ টাকা ঘুষ লেনদেনের কথা অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে কার্গো ফ্লাইট বন্ধ রাখার পাশাপাশি প্রবাসীদের আনা পণ্য খালাসও বন্ধ করে সুবিধাজনক ইউব্যাগেজ বানিজ্য করছেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের শীর্ষ কর্মকর্তা।
কাস্টমস কার্যালয়ের তথ্যমতে, কার্গো বিমান কিংবা জাহাজের ইউ ব্যাগেজে করে প্রবাসীদের আনা পন্যের শুল্ক সমান। যেহেতু প্রবাসীদের নিজস্ব পন্য এক হাজার কেজি হয় না। সেকারণে কার্গো বিমানে করে পণ্য আনা প্রবাসীদের কাছে জনপ্রিয়। তবে সেই সুবিধার অবৈধ ব্যবহারও কম নয়।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছেন মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পণ্যবাহী কার্গো বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বাংলাদেশ বিমান, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমসের আয় কমেছে। গত কয়েক মাসে প্রায় ২০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় কম হয়েছে বলে দুটি বিদেশি বিমান সংস্থার সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনসুর বলেন, ‘নানা কারণে আমাদের রপ্তানিখাত বারবার হোঁচট খাচ্ছে। সম্ভাবনা থাকলেও আমরা নতুন নতুন বাজার ধরে রাখতে পারছি না। পরে ভারত ও পাকিস্তান সেটা দখল করে নিচ্ছে।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে কার্গো পন্য খালাস বন্ধ রাখার কারনে সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। অনেকেই ব্যবসার লোকসান সইতে না পেরে ব্যবসা পরিবর্তন করেছেন।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তথ্য মতে, ইমপোর্ট কার্গো থেকে ২০২২ সালের জুনে বিমানবন্দর কার্গো ওয়্যার হাউস থেকে ২৫,৫৪,৬৭৩ টাকা আয় হয়েছে । একই বছরের জুলাই মাসে ৩২,২২,৩৪২ টাকা, আগস্টে ২৯,৭৭,৭৬২ টাকা, সেপ্টেম্বরে ২১,৪৭,০৮৪ টাকা, অক্টোবরে ৯,৮৪,২৭১ টাকা, নভেম্বরে ১০,০৮,০৬৭ টাকা আয় হয়। বেশ কিছুদিন বন্ধ রাখার পর ডিসেম্বর মাসে গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশিত হবার কারনে পণ্য খালাস চালু করা হলে শুধু ডিসেম্বরেই ১,৪৪,৩৫,৬৪৪ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের।
জানা গেছে শুধু চট্টগ্রাম বিমানবন্দর নয় রাজধানী ঢাকা, সিলেট বিমানবন্দর দিয়ে কার্গো পণ্যের ল্যাগেজ ছাড় করা বন্ধ রাখা হয়েছে। কদাচিৎ অবৈধ পণ্য ধরা পড়ার যুক্তি ব্যবহার করে বিমানবন্দরে কার্গো খালাসে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে ছক অনুযায়ী। চোরাকারবারিদের জন্য সহজ রুট তৈরি করে দিয়েছে কাস্টমস হাউজের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা। কার্গো বন্ধ রাখার কারণে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ কিছু রাজস্ব হারালেও ; ইউব্যাগেজের নৌ রুটে কাস্টমস কর্মকর্তাদের পকেটে ডুকছে বছরে চোরাচালানের শত কোটি টাকার পণ্য।
বিজনেস বাংলাদেশ/ হাবিব






















