দিনের বেলায় ট্রাকে করে বালি এনে রাখা হচ্ছে রাস্তায়। রাতের বেলায় সেই বালি ফেলা হচ্ছে পুকুরে। ধীরে ধীরে অনেকটুকু ভরাট হয়ে গেছে শতবর্ষী হালিশহরের নয়াবাজার নাজির বাড়ির পুকুরটি। এলাকার অগ্নি দুর্ঘটনার একমাত্র ভরসাস্থল এই জলাশয়টিও এখন বিলুপ্তির পথে।
এলাকার একমাত্র পুকুরটি রক্ষার আবেদন জানিয়ে সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করেছেন পুকুরটির মালিকানা থাকা এক অংশিদার। পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট টিম তদন্তে গিয়ে পুকুর ভরাটের সত্যতাও পেয়েছে। পরবর্তিতে সংস্থাটির এনফোর্সমেন্ট মামলার শুনানীতে একমাসের মধ্যে পূর্বের অবস্থায় পুকুরটি ফিরিয়ে আনার আদেশ দেয়া হয়। গত ১১ মে পরিবেশ অধিদপ্তর এমন আদেশ দিয়েছিল। কিন্তু এখনো পুকুরটি সংস্কার তো হইনি উল্টো ভরাট কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
প্রতিনিয়ত এভাবে পুকুর ভরাটের মহোৎসব চলছে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়। অনেক পুরনো ও নামকরা পুকুর ইতিমধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। নাম জানা থাকলেও অস্থিত্ব হারিয়েছে এমন পুকুরের সংখ্যাও কম নয়। পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত মামলা দায়ের করছে। এসব মামলায় জরিমানাসহ নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু পুকুর ফিরিয়ে আনতে পারছে না সংস্থাটি। শুধু মামলা দিয়েই যেন দায় শেষ করার রীতিতে পরিণত হয়েছে। এই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে অসাধু ভূমি দস্যুরা। কৌশলে পুকুর ভরাট করলেও সেটা বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া কোন সংস্থায় দায়েত্বই যেন পড়ছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মিয়া মাহমুমুদ হক বলেন, পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর অবস্থান আছে। এমন সংবাদ পেলেই পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। হালিশহর নাজিরবাড়ি পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট মামলা হয়। শুনানীতে একমাসের মধ্যে পুকুর পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়ার আদেশ হয়। স্থানীয় কাউন্সিলরকে বিষয়টি তদারকি করে জানানোর জন্য বলা হয়। কাউন্সিলর যেভাবে প্রতিবেদন দিবেন সে অনুসারে পরবর্তি পদক্ষেপ নেয়া হবে। পুকুর ভরাটের বিষয় নজরে আসলে আমাদের অবহিত করবেন। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিব।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, সময়ের ব্যবধানে বিগত ৪০ বছরে ২৪ হাজারের মতো পুকুর-দিঘি ভরাট করে ফেলেছে ভূমিদস্যুরা। এর মধ্যে রয়েছে অনেক ঐতিহ্যবাহী পুকুর-জলাশয়। এসব পুকুর ভরাটের নেপথ্যে রয়েছেন কিছু ভূমিদস্যু। তাদের সাথে নগর পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার সখ্যতা রয়েছে। যার কারণে স্থানীয় কেউ তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস করেন না।
পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৮১ সালের এক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করে, চট্টগ্রামে প্রায় ২৫ হাজার পুকুর-জলাশয় রয়েছে। চার দশকের ব্যবধানে দখল-দূষণে হারিয়ে গেছে এর বেশিরভাগ। ১৯৯১ সালে মৎস্য অধিদপ্তরের এক জরিপে ১৯ হাজার ২৫০টি পুকুর-জলাশয়ের অস্তিত্ব মেলে। ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক জরিপে চার হাজার ৫শ ২৩টি পুকুর-জলাশয় পাওয়া যায়। ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক মোরশেদ হোসেন মোল্লার এক সমীক্ষায় চট্টগ্রাম শহরে ১২শ ৪৯টি জলাশয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ২০০৬-০৭ সালের মাস্টারপ্ল্যান প্রতিবেদন অনুযায়ী সেই সময় নগরীতে পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫২৩টি। এরপর সিডিএ পুকুর নিয়ে আর কোনো জরিপ না করলেও মৎস্য অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস আলাদা করে জরিপ করেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী নগরীতে এখন পুকুরের সংখ্যা ৫৯০টি। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী নগরীতে এখন পুকুরের সংখ্যা ২৭৩টি।
পরিবেশবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা রসায়নের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী বলেন, আশকার দিঘি সংকুচিত হয়েছে। দেওয়ানজী পুকুর অনেক আগে থেকেই নেই। রানির পুকুর হারিয়ে গেছে। রাজা পুকুরও নেই। যেগুলো আছে সেগুলোতেও আমাদের নির্লিপ্ততা রয়েছে। আমাদের নির্লিপ্ততাই আমাদের শেষ করছে। পুকুর, খাল কিংবা পাহাড় কোনোটাই এ নগরে নিরাপদ নয়।
বিজনেস বাংলাদেশ/ হাবিব






















