পাবনার বেড়া উপজেলায় মশার উৎপাত বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। গত বুধবার (১৯ জুলাই) পর্যন্ত উপজেলায় অন্তত ২৫ জন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শুধু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই ১৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ক্লিনিকে আরও অন্তত ১০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। আক্রান্ত বেশির ভাগ রোগীরই সম্প্রতি ঢাকা ভ্রমণের ইতিহাস রয়েছে। পৌর বাসীর অভিযোগ মশক নিধনের নামে চলছে তামাশা।
বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, গত ঈদুল আযহার পর থেকে বেড়ায় রোগীর সংখ্যা বেশি বাড়ছে। ঈদ উপলক্ষে ঢাকা থেকে প্রচুর মানুষ বেড়ায় এসেছিলেন। তাঁদের অনেকেই দেহে ডেঙ্গুর জীবাণু নিয়ে বাড়িতে আসার পর আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। আক্রান্তদের কেউ কেউ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আবার কেউবা বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আর জটিল রোগীদের ঢাকাসহ দেশের উন্নততর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।
এদিকে উপজেলায় হঠাৎ করে মশার উৎপাতও ব্যাপক বেড়েছে। বেড়া পৌর মহল্লার বিভিন্ স্থানে বিশেষ করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সেচখালগুলোর ময়লা আবর্জনা ও বদ্ধ পানি মশা উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়ে উঠেছে বলে স্খানীয়দের অভিযোগ। এ অবস্থায় মশা ও ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে উপজেলাবাসীর চরম উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, ঈদুল আজহার পর থেকে এ পর্যন্ত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য আসা প্রায় ১৫ জন রোগীকে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এসব রোগীর জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড তৈরি করে সেখানে রোগী ভর্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সেখানে মাত্র দুজন রোগী ভর্তি হয়েছেন। ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে একজন ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়ে বাড়ি গেছেন এবং অপরজন এখনও ভর্তি আছেন। বাকি রোগীদের অনেককেই তাঁদের স্বজনেরা ঢাকা, বগুড়াসহ দেশের উন্নততর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানা গেছে।
বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ফাতেমাতুজ জান্নাত বলেন, ‘ঈদুল আজহার পর থেকে আমাদের এখানে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আক্রান্ত রোগীদের প্রায় সবারই সম্প্রতি ঢাকা ভ্রমণের ইতিহাস রয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু ওয়ার্ড স্থাপন করে রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। আর মশা ও ডেঙ্গু নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন প্রচার প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

বেড়া পৌর এলাকার চৌধুরী ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোতাহার আলম চৌধুরী বলেন, ‘ঈদুল আজহার পর থেকে আমাদের ক্লিনিকে সাতজন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের দুজন আমাদের এখানে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে ইতিমধ্যেই বাড়ি ফিরেছেন। বাকিরা অন্যত্র চিকিৎসা নিয়েছেন।’
বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে থাকা রোগী নাজমুল ইসলামের (৫২) স্ত্রী শাহানারা আক্তার জানান, নাজমুল ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করেন। শনিবার (১৫ জুলাই) তিনি জ¦র নিয়ে বেড়া পৌর এলাকায় অবস্থিত বাড়িতে আসেন। পরদিন বেড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে পরীক্ষা করার পর তাঁর ডেঙ্গু শনাক্ত হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এদিকে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা বিশেষ করে পাউবোর সেচখালগুলো ও বেড়া পৌর এলাকার নালা, ডোবা, খালসহ বিভিন্ন বদ্ধ জলাশয়ে পানি জমে রয়েছে। আর এগুলো পরিণত হয়েছে মশার প্রজনন ক্ষেত্রে। কোনো কোনো এলাকায় মশার উৎপাত এত বেড়ে গেছে যে দিনের বেলাতেও মশার কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে।
বেড়া পৌর এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ছোট ছোট সেচখালগুলো বদ্ধ পানি ও ঝোপঝাড়ে ভরে আছে। এগুলো মশার প্রধান প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া অনেক ডোবা ও খালের জমে থাকা পানি থেকেও অগণিত মশা উৎপাদিত হচ্ছে। এছাড়ার পৌর এলাকার দাস পারার ড্রেনের অবস্থা ময়লা আবর্জনায় ড্রেন বন্ধ হয়েগেছে। পৌরবাসীর অভিযোগ পৌরসভা থেকে মশক নিধন ফগার মেশিন দিয়ে নামে মাত্র ধুয়া ছিটিয়ে যায়। তা আবার কয়েকদিন পরপর। এটা একটা লোক দেখানো মশক নিধন অভিযান যা শুধু বাজার ও রাস্তা দিয়ে অটোতে উঠে ধুয়া ছিটিয়ে যায়। অথচ যেখানে মশার জন্ম ঝোপঝার নালা ময়লা আর্বজনার স্থান সেখানে কখনও যায় না মশক নিধনের লোকজন।
বেড়া পৌর এলাকার আলহেরা নগরের বাসিন্দা ওমর সরকার জানান, তাঁর বাড়ির পাশেই ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ বদ্ধ পানিতে ভরা সেচখাল। সেখান থেকে উৎপাদিত মশার উৎপাতে দিনের বেলাতেও স্বস্তি পাওয়া যায় না। আর মশাগুলো নিয়ে সব সময় মনে ভয় কাজ করে বলে তিনি জানান।
বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহা. সবুর আলী বলেন, ‘মশা নিধনের জন্য জরুরিভিত্তিতে আমরা চারটি ফগার মেশিন কিনেছি। প্রয়োজনে আরও কেনা হবে। এছাড়া এলাকাবাসীর সচেতনতা বৃদ্ধি ও মশার উৎসস্থল ধ্বংসের জন্য নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। পাউবোর সেচখাল পরিষ্কারের ব্যাপারে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলব।’
পাউবোর বেড়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার জানান, সেচ মৌসুম শুরুর আগে সেচখালগুলো পরিস্কার করা হয় যাতে কৃষকের জমিতে ঠিকমত পানি যেতে পারে। এখন সেচ মৌসুম শেষ বলে খালগুলোতে পানি প্রবাহ নেই। কিন্তু সেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে। বিষয়টি যদি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয় তবে উপজেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।






















