০৯:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

মাচায় ঝুলছে আতিকুল্লাহর সবুজ স্বপ্ন

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালীয়া ইউনিয়নের বরাইয়া (ভূঁইয়া বাড়ী) গ্রামের মো. আতিকুল্লাহর বাগানে ফলেছে মিষ্টি আঙুর। বিশাল ক্ষেতে এই মিষ্টি আঙুর চাষ করে সাড়া ফেলে দিয়েছেন ষাটোর্ধ ওই কৃষক। তার প্রায় এক বিঘার জমির মাচায় থোকায় থোকায় ঝুলছে আঙুর। তা দেখতে যেমন মানুষ ভিড় করছেন; তেমনি আঙুর চাষের পরামর্শ ও চারা সংগ্রহও করছেন বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা। এ অঞ্চলের মাটিতে আঙুর চাষ করতে দেখে একসময় যারা আতিকুল্লাহকে নিয়ে উপহাস করেছিলেন; এখন তারাই হতবাক হয়ে তার গুণগান গাইছেন।

আঙুর চাষ নিয়ে ইউটিউবে প্রচুর ভিডিও দেখেন কৃষক আতিকুল্লাহ। এরপর উদ্বুদ্ধ হয়ে ২০২২ সালে চুয়াডাঙ্গা থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে প্রতি পিস ৫৫০ টাকা ধরে ভারতীয় চয়ন জাতের ১০টি চারা কিনে আনেন। শুরু করেন আঙুর চাষ, তবে শুরুটা খুব একটা ভাল হয়নি। কিন্তু সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নন কৃষক আতিকুল্লাহ, বরং তিনি এ বছর দুইটি স্থানে একই জাতের ৫০টি চারা দিয়ে বৃহৎভাবে শুরু করেন। চারা রোপণের ৭ মাসের মধ্যে গাছে ফল আসা শুরু করে।

কৃষক আতিকুল্লাহ আঙুর চাষের পাশাপাশি চারা উৎপাদনও করছেন। তার আঙুরের বাম্পার ফলন দেখে আশপাশের কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হয়ে এ চাষে ঝুঁকে পড়ছেন। স্থানীয় বিভিন্ন নার্সারী ও ব্যক্তি তার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করতে আসছেন অনেকে। তিনি প্রতিটি আঙুর কলম চারা মাত্র ২০০ টাকা করে বিক্রি করছেন।

কৃষক আতিকুল্লাহ জানান, প্রথমবার ৭ মাসের মাথায় গাছগুলোতে আঙুর ধরেছিল এবং ২০/২৫ মণ ফল পান। তবে প্রথম ফল পাওয়া একটিও তিনি বিক্রি না করে এলাকার মানুষকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বারের মতো এবারও গাছে প্রচুর পরিমাণ ফল হয়েছে। এবারও তিনি ফল বিক্রি করবেন না। যারা বাগানে আসেন তাদের তিনি বিনামূল্যে দিয়ে দিবেন। এ আঙুর গাছে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়।

তিনি আরো জানান, আঙুর গাছ ৮ ফুট দূরত্বে লাগানো হয়েছে। এ গাছ লাগানোর আগে জমি প্রস্তুত করে প্রতিটি গর্তে পাঁচ কেজি বিভিন্ন উপাদান দেওয়া হয়। সেগুলো হচ্ছে ইটের গুঁড়া, মোটা বালু ও জৈব সার। এগুলো ৩ ফুট গর্ত করে মাটির সঙ্গে মিশ্রণ করে গর্তে দেওয়া হয়। প্রতিটা গাছের গোঁড়া মাটি দিয়ে উঁচু করা, যাতে গোঁড়ায় পানি না জমে। আঙুর গাছ যাতে দ্রুত লম্বা হতে পারে এ জন্য উঁচু করে সিমেন্টের খুঁটি দিয়ে মাচা তৈরি করেছেন। ফলে ঝড়-বৃষ্টি এলে গাছ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা কম থাকে।

কৃষক আতিকুল্লাহর স্ত্রী নূর আক্তার জানান, আঙুর বাগান নিয়ে তার স্বামী প্রচুর খাটা-খাটুনি করেন। প্রচন্ড খড়া রাতেও বাগানে ২ ঘন্টা পানি দেওয়ার কাজ করেন। তবে স্বামীর সাথে তিনিও মাঝে মধ্যে সহযোগীতা করেন।
বরাইয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম আব্দুস সালাম বলেন, আতিকুল্লাহ অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে বাগানে এ আঙুর উৎপাদন করেছেন। বরাইয়া গ্রামের যুবক পারভেজ বেপারী বলেন, আতিকুল্লাহ নানার বাগান দেখে আমরা এলাকার যুবকরা অনুপ্রানিত। ষাটোর্ধ আতিকুল্লাহ নানা পারলে ইনশাআল্লাহ আমরাও পারবো। একই গ্রামের আরেক যুবক ইফতেখার আহমেদ ইমন বলেন, প্রতিবেশী আতিকুল্লাহ চাচার আঙুর বাগান দেখে আমরা অনুপ্রানিত।

কালীগঞ্জ উপজেলা উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, আমাদের কৃষি অফিসের সহযোগীতায় সার ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জৈবিক বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোন প্রকার কিটনাশক ছাড়াই এবার আঙুরের চাষ করছেন।

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবীদ ফারজানা তাসলিম বলেন, গবেষণা করে আমাদের দেশের উপযোগী জাত যদি উদ্ভাবন করা যায়, সেক্ষেত্রে যে জাতগুলো আমাদের দেশে চাষ উপযোগী বা ফলন বেশি হবে এবং মিষ্টতা বেশি হবে এরকম জাত যদি আমরা আবিষ্কার করতে পারি তাহলে আমাদের যে কৃষকরা শৌখিনভাবে আঙুর চাষ করছেন, তারা আগামীতে বানিজ্যিক চাষের দিকে যেতে পারবেন এবং আমাদের বিদেশী মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ-২০২৬ উদ্বোধন করেন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মাচায় ঝুলছে আতিকুল্লাহর সবুজ স্বপ্ন

প্রকাশিত : ০৪:৪৮:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ জুলাই ২০২৩

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জাঙ্গালীয়া ইউনিয়নের বরাইয়া (ভূঁইয়া বাড়ী) গ্রামের মো. আতিকুল্লাহর বাগানে ফলেছে মিষ্টি আঙুর। বিশাল ক্ষেতে এই মিষ্টি আঙুর চাষ করে সাড়া ফেলে দিয়েছেন ষাটোর্ধ ওই কৃষক। তার প্রায় এক বিঘার জমির মাচায় থোকায় থোকায় ঝুলছে আঙুর। তা দেখতে যেমন মানুষ ভিড় করছেন; তেমনি আঙুর চাষের পরামর্শ ও চারা সংগ্রহও করছেন বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা। এ অঞ্চলের মাটিতে আঙুর চাষ করতে দেখে একসময় যারা আতিকুল্লাহকে নিয়ে উপহাস করেছিলেন; এখন তারাই হতবাক হয়ে তার গুণগান গাইছেন।

আঙুর চাষ নিয়ে ইউটিউবে প্রচুর ভিডিও দেখেন কৃষক আতিকুল্লাহ। এরপর উদ্বুদ্ধ হয়ে ২০২২ সালে চুয়াডাঙ্গা থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে প্রতি পিস ৫৫০ টাকা ধরে ভারতীয় চয়ন জাতের ১০টি চারা কিনে আনেন। শুরু করেন আঙুর চাষ, তবে শুরুটা খুব একটা ভাল হয়নি। কিন্তু সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নন কৃষক আতিকুল্লাহ, বরং তিনি এ বছর দুইটি স্থানে একই জাতের ৫০টি চারা দিয়ে বৃহৎভাবে শুরু করেন। চারা রোপণের ৭ মাসের মধ্যে গাছে ফল আসা শুরু করে।

কৃষক আতিকুল্লাহ আঙুর চাষের পাশাপাশি চারা উৎপাদনও করছেন। তার আঙুরের বাম্পার ফলন দেখে আশপাশের কৃষকরা উদ্বুদ্ধ হয়ে এ চাষে ঝুঁকে পড়ছেন। স্থানীয় বিভিন্ন নার্সারী ও ব্যক্তি তার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করতে আসছেন অনেকে। তিনি প্রতিটি আঙুর কলম চারা মাত্র ২০০ টাকা করে বিক্রি করছেন।

কৃষক আতিকুল্লাহ জানান, প্রথমবার ৭ মাসের মাথায় গাছগুলোতে আঙুর ধরেছিল এবং ২০/২৫ মণ ফল পান। তবে প্রথম ফল পাওয়া একটিও তিনি বিক্রি না করে এলাকার মানুষকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বারের মতো এবারও গাছে প্রচুর পরিমাণ ফল হয়েছে। এবারও তিনি ফল বিক্রি করবেন না। যারা বাগানে আসেন তাদের তিনি বিনামূল্যে দিয়ে দিবেন। এ আঙুর গাছে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়।

তিনি আরো জানান, আঙুর গাছ ৮ ফুট দূরত্বে লাগানো হয়েছে। এ গাছ লাগানোর আগে জমি প্রস্তুত করে প্রতিটি গর্তে পাঁচ কেজি বিভিন্ন উপাদান দেওয়া হয়। সেগুলো হচ্ছে ইটের গুঁড়া, মোটা বালু ও জৈব সার। এগুলো ৩ ফুট গর্ত করে মাটির সঙ্গে মিশ্রণ করে গর্তে দেওয়া হয়। প্রতিটা গাছের গোঁড়া মাটি দিয়ে উঁচু করা, যাতে গোঁড়ায় পানি না জমে। আঙুর গাছ যাতে দ্রুত লম্বা হতে পারে এ জন্য উঁচু করে সিমেন্টের খুঁটি দিয়ে মাচা তৈরি করেছেন। ফলে ঝড়-বৃষ্টি এলে গাছ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা কম থাকে।

কৃষক আতিকুল্লাহর স্ত্রী নূর আক্তার জানান, আঙুর বাগান নিয়ে তার স্বামী প্রচুর খাটা-খাটুনি করেন। প্রচন্ড খড়া রাতেও বাগানে ২ ঘন্টা পানি দেওয়ার কাজ করেন। তবে স্বামীর সাথে তিনিও মাঝে মধ্যে সহযোগীতা করেন।
বরাইয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম আব্দুস সালাম বলেন, আতিকুল্লাহ অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে বাগানে এ আঙুর উৎপাদন করেছেন। বরাইয়া গ্রামের যুবক পারভেজ বেপারী বলেন, আতিকুল্লাহ নানার বাগান দেখে আমরা এলাকার যুবকরা অনুপ্রানিত। ষাটোর্ধ আতিকুল্লাহ নানা পারলে ইনশাআল্লাহ আমরাও পারবো। একই গ্রামের আরেক যুবক ইফতেখার আহমেদ ইমন বলেন, প্রতিবেশী আতিকুল্লাহ চাচার আঙুর বাগান দেখে আমরা অনুপ্রানিত।

কালীগঞ্জ উপজেলা উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, আমাদের কৃষি অফিসের সহযোগীতায় সার ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জৈবিক বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কোন প্রকার কিটনাশক ছাড়াই এবার আঙুরের চাষ করছেন।

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবীদ ফারজানা তাসলিম বলেন, গবেষণা করে আমাদের দেশের উপযোগী জাত যদি উদ্ভাবন করা যায়, সেক্ষেত্রে যে জাতগুলো আমাদের দেশে চাষ উপযোগী বা ফলন বেশি হবে এবং মিষ্টতা বেশি হবে এরকম জাত যদি আমরা আবিষ্কার করতে পারি তাহলে আমাদের যে কৃষকরা শৌখিনভাবে আঙুর চাষ করছেন, তারা আগামীতে বানিজ্যিক চাষের দিকে যেতে পারবেন এবং আমাদের বিদেশী মুদ্রা সাশ্রয় হবে।