ঝুঁকিপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় জামানত ছাড়াই আগ্রাসী বিনিয়োগ শুরু করেছিল দেশের ব্যাংকগুলো। আগ্রাসী ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) নির্ধারিতের চেয়ে ১৯ শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়ে। অনেকে আমানত সংগ্রহের চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করে। এতে পুরো ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট দেখা দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এতে লাগাম টানলে ব্যাংকগুলো এখন ঋণ বন্ধ করে অগ্রিম (অ্যাডভান্স) দেওয়ার পরিমাণ বাড়িয়েছে।
এতে ব্যাংক খাতে অস্বাভাবিকহারে বাড়ছে জোরপূর্বক (ফোর্সড) ঋণ। ঝুঁকিপূর্ণ এসব ঋণই খেলাপির পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ব্যাংক খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংকে ফোর্সড ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি বেরসকারি খাতের ব্যাংকগুলোতেও বাড়ছে ফোর্সড ঋণ, যা দেশের পুরো ব্যাংক খাতেই ফোর্সড ঋণের পরিমাণকে বাড়িয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে সোনালী, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংক কমিয়ে আনতে শুরু করলেও বাকি দুটিকে হুশিয়ারি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিষয়গুলো দেখভালের দায়িত্বে থাকা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মালিকপক্ষ হিসেবে ব্যাংকগুলোর দেখভালের দায়িত্ব আমাদের।
কিন্তু পরিচালনগত কোনো ত্রুটি দেখা দিলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে ফোর্সড ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি উদ্বেজনক। আমরা আমাদের প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ করেছি। পরিস্থিতির উন্নতির জন্য আমরা জোর দিচ্ছি।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, ২০১৭ সালের এ সময়ে যা ছিল আট লাখ ৫৬ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে আট দশমিক ৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে গত এপ্রিল পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের আগাম দেওয়া হয়েছে আট লাখ ৫০ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা, যা গত মার্চে ছিল আট লাখ ৪০ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে আগাম বেড়েছে ১০ হাজার ১২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা বা ১৭ শতাংশ। এপ্রিলে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করেছে এক লাখ ৫৬ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা, যা মার্চে ছিল এক লাখ ৫৬ হাজার ৮৮২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে ব্যাংকের বিনিয়োগ কমেছে ৪১২ কোটি টাকা, যা গত বছরের এপ্রিলের চেয়ে দুই দশমিক এক শতাংশ কম। ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ কমালেও আগাম অর্থ দেওয়ার পরিমাণ বাড়িয়েছে, যা ভাবিয়ে তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের চাহিদার আলোকে নগদ অর্থ দিয়ে থাকে, যা অগ্রিম হিসেবে বিবেচিত। সাধারণত আমদানির বিপরীতেই এ অর্থ বেশি নেন ব্যবসায়ীরা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু একশ্রেণির ব্যাবসায়ীরা যথাসময়ে এ অর্থ পরিশোধ করছেন না। অর্থ আদায় নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলো তখন ওই গ্রাহকের বিরুদ্ধে ফোর্সড লোন বা বাধ্যতামূলক ঋণ তৈরি করে। জানা গেছে, ব্যবসার জন্য ঋণ নিতে প্রক্রিয়াগত অনেক ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
তেমনি প্রয়োজনীয় জামানত ও কাগজপত্র দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। এতে সময় বেশি লাগে এবং কয়েক ধাপে অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ব্যবসার বিপরীতে স্বল্প সময়ের জন্য আগাম অর্থ নেওয়ার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ ও সময় লাগে কম। এজন্য ব্যবসায়ীরা সহজেই একশ্রেণীর অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে আগাম নিতে পারেন সহজেই। সূত্র জানিয়েছে, ব্যবসার চেয়ে আমদানির বিপরীতেই আগাম যাচ্ছে বেশি। ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীর পক্ষে আমদানি পণ্যের অর্থ পরিশোধ করে দিচ্ছে। নির্দিষ্ট সময় পার হলেও ওই ব্যবসায়ী তা পরিশোধ করছে না। ব্যবসায়ীর কাছে ধরনা দিয়েও অর্থ আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না ব্যাংকগুলোর। ফলে ব্যাংক বাঁচাতে ওই আগাম দেওয়া অর্থের বিপরীতে ফোর্সড বা বাধ্যতামূলক ঋণ সৃষ্টি করেন কর্মকর্তারা। এই প্রক্রিয়া করতেই সময় চলে যায় এক বা দুই বছর।
এই সময়ে ব্যবসায়ীরা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হন না। অনাদায়ী হওয়ায় এই ঋণও একপর্যায়ে খেলাপি হয়ে যায়। পরে কিছু ব্যবসায়ী সুদ মওকুফসহ বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে ঋণের কিছু অর্থ পরিশোধ করে খেলাপির তালিকা থেকে নাম কাটান। এভাবে সুবিধা নিলেও ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধ করছেন না। ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে। ব্যাংক খাতে অস্বাভাবিক ফোর্সড ঋণের বৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিষয়টি আলোচিত হয়। ওই সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি) উপস্থিত ছিলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্যাংক খাতে ফোর্সড ঋণ কোনোভাবেই বাড়ানো যাবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
এ সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংক ফোর্সড ঋণ ২০১৬ সালের চেয়ে ২০১৭ সালে কমিয়ে আনছে বলে সভায় জানানো হয়, কিন্তু জনতা ব্যাংকের ফোর্সড ঋণ ২০১৬ সালের চেয়ে বেড়ে ২০১৭ সালে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১৯২ কোটি টাকা। অপরদিকে রূপালীর বেড়েছে ৫০০ কোটি টাকা। বিষয়টি উদ্বেগজনক হিসেবে বলা হয়। সভায় দুটি ব্যাংককেই ফোর্সড ঋণ কমিয়ে আনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে বলা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই সভায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সরকারি ব্যাংকগুলোতে আগাম দেওয়া হচ্ছে বেশি। এর গ্রহীতারা রাজনৈতিক দিক দিয়ে প্রভাবশালী হওয়ায় কিছুতেই তাদের নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না। অপরদিকে এ প্রবণতা বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও বাড়ছে। পরিচালকদের নির্দেশে আগাম দিতে শুরু করেছেন ব্যাংকাররা।
এভাবে আগাম বৃদ্ধির বিষয়টি ব্যাংক খাতে আরেক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন এ খাতের বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে বেসরকারি ব্যাংকের এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ফোর্সড ঋণ ব্যাংকের জন্য একটি স্বাভাবিক ঘটনা। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগায় ফোর্সড ঋণ তৈরি করতে হয়। অর্থপ্রাপ্তি সাপেক্ষে খুব দ্রুতই তা মিটে যায়, কিন্তু ফোর্সড ঋণ যদি বাড়তেই থাকে তা উদ্বেগজনক। মোট অগ্রিমের ১০ শতাংশ পর্যন্ত ফোর্সড ঋণ হওয়া স্বাভাবিক চিত্র।’


























