০৫:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

পলো জালে পাবনার রুহুল বিলে চিরায়ত বাউত উৎসব, খালি হাতে ফিরছেন বাউতরা

কাকডাকা ভোরে দলে দলে ছুটছে মানুষ। কারো কাঁধে পলো, আবার কারো কাঁধে-বা বিভিন্ন রকমের জাল। এদের সবার গন্তব্য চলনবিল। পলো ও বিভিন্ন জালে দল বেধে মাছ ধরার চিরায়ত উৎসব ‘বাউত উৎসব’এ যোগ দিতে যাচ্ছেন তারা। এরপর বিলের পানিতে সারি সারি দাঁড়িয়ে দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন স্লোগান ও সঙ্গীতে মাছ ধরার অভিযান শুরু। শনিবার (৩০ নভেম্বর) সকালে এমন চিত্র দেখা যায় পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার চলনবিলের রুহুল বিলে। তবে দিনবদলের সাথে মাছ কমে যাওয়ায় অধিকাংশ বাউতই ফিরছেন খালি হাতে। ক্রমেই ঐতিহ্য হারাচ্ছে এ উৎসব।

সরেজমিনে দেখা যায়, বালক থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত পলো এবং জাল নিয়ে ছুটছে বিলের উদ্দেশ্যে। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, নাটোর ও রাজশাহী সহ দূর দুরান্তের জেলা থেকে মিনিবাস ও পিকআপ সহ বিভিন্ন যানে এসেছেন অনেকেই। অনেকটা উৎসব আমেজে বিলের দিকে তাদের ছুটে চলা। কেউ কেউ নেমে পড়েছেন বিলের পানিতে। শুরু করেছেন মাছ ধরা। অনেকেই হাতে থাকা পলো সযত্নে বিলের পানিতে চেপে ধরছেন, বুঝতে চেষ্টা করছেন পলোতে কোনো মাছ খোট দেয় কি না অথবা ভেতরে মাছ পড়লো কি না। কেউ কেউ সন্দিহান মনকে সান্ত্বনা দিতে চেপে ধরে পলোর ভেতরে হাত ঢুকিয়ে মাছের উপস্থিতি নিশ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে ঠেলা জাল, মই জাল ও খেওয়া জাল সহ বিভিন্ন জালে মাছ শিকারের চেষ্টা করছেন অনেকেই। এদের ভাগ্যে জুটছে বড়-ছোট বিভিন্ন সাইজের নানা প্রজাতির মাছ। কেউ পাচ্ছেন রুই, শোল, গজার, কেউ-বা কাতলা ও আইর, আবার কেউ-বা পাচ্ছেন বোয়াল। এভাবেই মনের আনন্দে মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠেছেন বাউতরা। পেশায় জেলে নয় এমন মানুষের সংখ্যাও ব্যাপক এখানে।

স্থানীয় বাউতরা জানান, প্রতিবছর অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি থেকে পৌষ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার সংঘবদ্ধভাবে মাছ শিকারে নামেন বাউতরা। এ উৎসবে যারা অংশ নেন তাদের বাউত বলা হয়। তবে অপরিকল্পিত পুকুর খনন ও বাধ নির্মাণে জৌলুস হারিয়েছে বিল। চায়না জাল ও দুয়ারির দাপটে আকাল দেখা দিয়েছে মাছের। এতে দুর দুরান্ত থেকে আসা বাউতরা এ উৎসবে অংশ নেয়ায় আগ্রহ হারাচ্ছে।

চল্লিশ বছর ধরে এই বিলে মাছ ধরেন স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম হোসেন। সে সময় বিল মাছে ভরপুর থাকলেও এখন তেমন মাছ নেই। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিলও প্রভাবশালীদের দখলে। অফিসারদের ম্যানেজ করে বিলের বিভিন্ন অংশকে পুকুর বানিয়েছেন। এখানে কেউ নামতে পারে না। এছাড়া যেখানে সেখানে বিবেচনা ছাড়াই বাধ নির্মাণ করায় বিলে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। এর ফলে মাছ কমে গেছে।

স্থানীয় আরেক বাউত সাইদুল ইসলাম বলেন, এই বিল থেকে একসময় গজার ও বোয়াল সহ বড় বড় মাছ কাঁধে করে নিতে পারি নাই। অথচ এখন মাছই নাই। পুকুর কেটে, বাধ তৈরি করে মাছের অভয়াশ্রম ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আবার উৎসবের আগেই বিলে বিষ প্রয়োগ করে মাছ মেরে নেয়া হয়। ফলে মাছ নাই। এখন যারা আসেন, তারা সবাই শখ ও আনন্দ করতে আসেন। মাছ নিয়ে যেতে পারেন না।

দুই দশক ধরে এই বিলে মাছ শিকার করেন হাসেম। দীর্ঘ সময় বিলে কাটালেও আজ তার ভাগ্যে কোনো মাছ জোটেনি। তিনি বলেন, কোনোদিন মাছ ছাড়া ফিরে যাই নাই। আজ যেতে হচ্ছে। চায়না জালে সব শেষ করে দিয়েছে।

সাঁথিয়ার সেলন্দা এলাকা থেকে শফিকুল ইসলাম, টাঙ্গাইল থেকে গাজীউর রহমান, ঝিনাইদহের শৈলকুপা থেকে মোতাহার হোসেন ও ফরিদপুর উপজেলা থেকে বরাত আলী সহ দুর থেকে বাউত উৎসবে অংশ নেয়া কয়েকজনের সাথে কথা হয়। তারা জানান, দুর থেকে আসছি উৎসবে। এখানে মাছ পাওয়াই বড় বিষয় নয়। স্লোগান, গান ও হইহুল্লোড়ে উৎসবটা উপভোগ করাই মুল বিষয়। তবে ছোট বড় দু’একটা মাছ পাওয়া গেলেও মাছ রক্ষায় উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে দাবি তাদের।

বাউত উৎসবে ছবি তুলতে এসেছেন প্রথম আলোর বিশেষ ফটো সাংবাদিক জাহিদুল করিম ও পাবনা অফিসের ফটো সাংবাদিক ও পরিবেশ বিষয়ক সংগঠক হাসান মাহমুদ ডি। তারা জানান, দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর মানুষের সীমাহীন লোভে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। জৌলুস হারিয়েছে শত বছরের প্রাচীন বাউত উৎসব। আশঙ্কা প্রকাশ করে তারা বলেন, বিল ও মাছ রক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে, ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ডিএস

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

সন্ধ্যা ৭টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা

পলো জালে পাবনার রুহুল বিলে চিরায়ত বাউত উৎসব, খালি হাতে ফিরছেন বাউতরা

প্রকাশিত : ০৫:১৫:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ নভেম্বর ২০২৪

কাকডাকা ভোরে দলে দলে ছুটছে মানুষ। কারো কাঁধে পলো, আবার কারো কাঁধে-বা বিভিন্ন রকমের জাল। এদের সবার গন্তব্য চলনবিল। পলো ও বিভিন্ন জালে দল বেধে মাছ ধরার চিরায়ত উৎসব ‘বাউত উৎসব’এ যোগ দিতে যাচ্ছেন তারা। এরপর বিলের পানিতে সারি সারি দাঁড়িয়ে দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন স্লোগান ও সঙ্গীতে মাছ ধরার অভিযান শুরু। শনিবার (৩০ নভেম্বর) সকালে এমন চিত্র দেখা যায় পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার চলনবিলের রুহুল বিলে। তবে দিনবদলের সাথে মাছ কমে যাওয়ায় অধিকাংশ বাউতই ফিরছেন খালি হাতে। ক্রমেই ঐতিহ্য হারাচ্ছে এ উৎসব।

সরেজমিনে দেখা যায়, বালক থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত পলো এবং জাল নিয়ে ছুটছে বিলের উদ্দেশ্যে। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, নাটোর ও রাজশাহী সহ দূর দুরান্তের জেলা থেকে মিনিবাস ও পিকআপ সহ বিভিন্ন যানে এসেছেন অনেকেই। অনেকটা উৎসব আমেজে বিলের দিকে তাদের ছুটে চলা। কেউ কেউ নেমে পড়েছেন বিলের পানিতে। শুরু করেছেন মাছ ধরা। অনেকেই হাতে থাকা পলো সযত্নে বিলের পানিতে চেপে ধরছেন, বুঝতে চেষ্টা করছেন পলোতে কোনো মাছ খোট দেয় কি না অথবা ভেতরে মাছ পড়লো কি না। কেউ কেউ সন্দিহান মনকে সান্ত্বনা দিতে চেপে ধরে পলোর ভেতরে হাত ঢুকিয়ে মাছের উপস্থিতি নিশ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে ঠেলা জাল, মই জাল ও খেওয়া জাল সহ বিভিন্ন জালে মাছ শিকারের চেষ্টা করছেন অনেকেই। এদের ভাগ্যে জুটছে বড়-ছোট বিভিন্ন সাইজের নানা প্রজাতির মাছ। কেউ পাচ্ছেন রুই, শোল, গজার, কেউ-বা কাতলা ও আইর, আবার কেউ-বা পাচ্ছেন বোয়াল। এভাবেই মনের আনন্দে মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠেছেন বাউতরা। পেশায় জেলে নয় এমন মানুষের সংখ্যাও ব্যাপক এখানে।

স্থানীয় বাউতরা জানান, প্রতিবছর অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি থেকে পৌষ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার সংঘবদ্ধভাবে মাছ শিকারে নামেন বাউতরা। এ উৎসবে যারা অংশ নেন তাদের বাউত বলা হয়। তবে অপরিকল্পিত পুকুর খনন ও বাধ নির্মাণে জৌলুস হারিয়েছে বিল। চায়না জাল ও দুয়ারির দাপটে আকাল দেখা দিয়েছে মাছের। এতে দুর দুরান্ত থেকে আসা বাউতরা এ উৎসবে অংশ নেয়ায় আগ্রহ হারাচ্ছে।

চল্লিশ বছর ধরে এই বিলে মাছ ধরেন স্থানীয় বাসিন্দা গোলাম হোসেন। সে সময় বিল মাছে ভরপুর থাকলেও এখন তেমন মাছ নেই। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিলও প্রভাবশালীদের দখলে। অফিসারদের ম্যানেজ করে বিলের বিভিন্ন অংশকে পুকুর বানিয়েছেন। এখানে কেউ নামতে পারে না। এছাড়া যেখানে সেখানে বিবেচনা ছাড়াই বাধ নির্মাণ করায় বিলে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। এর ফলে মাছ কমে গেছে।

স্থানীয় আরেক বাউত সাইদুল ইসলাম বলেন, এই বিল থেকে একসময় গজার ও বোয়াল সহ বড় বড় মাছ কাঁধে করে নিতে পারি নাই। অথচ এখন মাছই নাই। পুকুর কেটে, বাধ তৈরি করে মাছের অভয়াশ্রম ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আবার উৎসবের আগেই বিলে বিষ প্রয়োগ করে মাছ মেরে নেয়া হয়। ফলে মাছ নাই। এখন যারা আসেন, তারা সবাই শখ ও আনন্দ করতে আসেন। মাছ নিয়ে যেতে পারেন না।

দুই দশক ধরে এই বিলে মাছ শিকার করেন হাসেম। দীর্ঘ সময় বিলে কাটালেও আজ তার ভাগ্যে কোনো মাছ জোটেনি। তিনি বলেন, কোনোদিন মাছ ছাড়া ফিরে যাই নাই। আজ যেতে হচ্ছে। চায়না জালে সব শেষ করে দিয়েছে।

সাঁথিয়ার সেলন্দা এলাকা থেকে শফিকুল ইসলাম, টাঙ্গাইল থেকে গাজীউর রহমান, ঝিনাইদহের শৈলকুপা থেকে মোতাহার হোসেন ও ফরিদপুর উপজেলা থেকে বরাত আলী সহ দুর থেকে বাউত উৎসবে অংশ নেয়া কয়েকজনের সাথে কথা হয়। তারা জানান, দুর থেকে আসছি উৎসবে। এখানে মাছ পাওয়াই বড় বিষয় নয়। স্লোগান, গান ও হইহুল্লোড়ে উৎসবটা উপভোগ করাই মুল বিষয়। তবে ছোট বড় দু’একটা মাছ পাওয়া গেলেও মাছ রক্ষায় উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে দাবি তাদের।

বাউত উৎসবে ছবি তুলতে এসেছেন প্রথম আলোর বিশেষ ফটো সাংবাদিক জাহিদুল করিম ও পাবনা অফিসের ফটো সাংবাদিক ও পরিবেশ বিষয়ক সংগঠক হাসান মাহমুদ ডি। তারা জানান, দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর মানুষের সীমাহীন লোভে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়েছে। জৌলুস হারিয়েছে শত বছরের প্রাচীন বাউত উৎসব। আশঙ্কা প্রকাশ করে তারা বলেন, বিল ও মাছ রক্ষায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে, ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ডিএস