আমদানি পণ্যের আড়ালে অর্থ পাচার হচ্ছে। ব্যাংক ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি কমছে। মৌখিক নির্দেশনায় সুদহার কমিয়ে এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। জাতীয় সঞ্চয়পত্রে সুদহার বেশি। ব্যাংক খাতে আমানত সংগ্রহ কমে যাচ্ছে। এক সময়ে তারল্য সংকট বৃদ্ধি পেয়ে বড় সমস্যা তৈরি করবে। এটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে আর্থিক খাতে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের নিয়ে আয়োজিত এক সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা।
এর উত্তরণে সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন বৃদ্ধি করতে জোর দেন তারা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে নিজেদের কার্যালয়ে সদস্যদের জন্য ‘বর্তমান অর্থবাজার পরিস্থিতি ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সম্মেলনটির আয়োজন করে দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)। সংগঠনটির সভাপতি দেওয়ান নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের সংগঠন এবিবি’র চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্যাংক খাতে সুদহার নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক বিষয়ে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি ও খবরদারি আরও বৃদ্ধি করতে হবে। আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হয়ে তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। ১০ শতাংশ খেলাপি ও ঋণ-আমানত-অনুপাতের বর্তমান অবস্থানে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। কম সুদে ঋণ দিতে গেলে ব্যাংক খাতে তারল্য প্রবাহ কমে যাবে। এটি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রায়ত্তের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকে মূলধন জোগানো জাতীয় বাজেটের অংশ হয়ে যাচ্ছে। লোকসানি প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি দেওয়া রাষ্ট্রীয় নীতি হয়ে উঠছে। এজন্য সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। আমদানির পরিমাণ অস্বাভাবিক বৃদ্ধিই বলছে অর্থ পাচার হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) বরাত দিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাটির দেওয়া তথ্য বলছেÑপ্রতিবছর ৯ বিলিয়ন ডলার অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ৮২ শতাংশই যাচ্ছে এলসির মাধ্যমে। আমদানির বিপরীতে ওভার ইনভয়েসিং ও রফতানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে এ অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে চলে যাচ্ছে বিদেশে।
আইসিএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহমুদুল হাসান খসরুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ব্র্যাক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল কাদের। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বিভিন্ন ব্যাংকার ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টরা। মূল প্রবন্ধে আবদুল কাদের বলেন, এক অঙ্কে সুদহার নামিয়ে আনতে ব্যাংকগুলো সরকারি বন্ড ভেঙে ঋণ দেওয়া শুরু করেছে। সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ঘোষণা বাজার উপযোগী হয়নি। এটি জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীত। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তারল্য সংকটে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ কমিয়ে দেবে। ফলে বিনিয়োগ কমে যাবে। খেলাপি ঋণ নিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কঠিন পরিস্থিতি ধারণ করেছে। এটি ভালো ঋণগ্রহীতার সংস্কৃতিও নষ্ট করছে। প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে এবিবির চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বলেন, একজন প্রধান নির্বাহী হিসেবে চাকরি বাঁচাতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তই মানতে হয় আমাদের।
যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান নির্বাহীদের চাকরি রক্ষায় সচেষ্ট; কিন্তু বোর্ড না চাইলে আমি তো ব্যাংকে থাকতে পারব না। এজন্য পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদেরও ব্যাংকিং সংস্কৃতিতে চলার জন্য উৎসাহ দিতে হবে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সব জায়গায়ই হয়; কিন্তু অর্থনীতিতে এর প্রভাব কম হয়। আমাদেরও সে জায়গায় যেতে হবে। আমরা আশাবাদী, ভবিষ্যতে হয়তো এটা ঠিক হয়ে যাবে। ডেইলি স্টারের বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান বলেন, এখনও ব্যাংকগুলো ১০ শতাংশের ওপরে আমানত নিচ্ছে। ঋণ-আমানত (এডিআর) অনুপাত বিষয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারির পূর্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রভাব নিয়ে কোনো পর্যালোচনা করেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটি করতে পারে না। কয়েকটি ব্যাংকে তারল্য সংকট থাকলেও সব ব্যাংকের জন্য একই নির্দেশনা দেওয়া যায় না। এরকম সিদ্ধান্ত ব্যাংকের সম্পদ ও তারল্য খাতে অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি করেছে। প্রাইম ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, সুদহার ছয় ও ৯ শতাংশ ঘোষণা কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে আসেনি। এখানে স্পষ্ট করা হয়নি কোন কোন খাতে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করা হবে।
তিন মাসের আমানত সংগ্রহে ছয় শতাংশ সুদ সংগ্রহের কথা বলা হলেও চার, ছয় ও এক বছরের আমানতের সুদহার বিষয়ে বলা হয়নি। এটা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। ব্র্যাক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোয় মূলধন সংকট হয়েছে ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নয়; এটি তাদের নিজেদের সমস্যা।


























