বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ দিয়ে ২০৩টি পুরোনো জাহাজ আমদানি করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয় মোট ৮ হাজার ১৯০ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে পুরোনো জাহাজ আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল পাঁচ হাজার ৪৪৭ কোটি ১২ লাখ টাকা। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে দুই হাজার ৭৪৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সাত হাজার ৬৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিতে। অর্থাৎ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় মুনাফা ভালো করেছে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রমতে, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ দিয়ে ২০৩টি পুরোনো জাহাজ আমদানিতে ব্যয় ছিল ৮ হাজার ১৯০ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে ১৭৬টি পুরোনো জাহাজ আমদানি করা হয়েছিল। অর্থাৎ গত অর্থবছর জাহাজ আমদানি বেড়েছে মোট ২৭টি। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৩৩টি জাহাজ আমদানি করা হয়েছিল। সে অর্থবছরে ২০টি জাহাজ বেশি আমদানি করা হলেও এক হাজার ১২৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা কম ব্যয় হয়েছিল। এদিকে বিপুল আমদানির জন্য স্ক্র্যাপ জাহাজ খাত থেকে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ সমাপ্ত অর্থবছরে ৫৫৪ কোটি ২০ লাখ টাকা রাজস্ব পায়, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৫৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এতে আগের বছরের তুলনায় কাস্টম হাউজের রাজস্ব আহরণ কমেছে ১০০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
পুরোনো জাহাজ আমদানির তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র ও মোস্তফা হাকিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনজুর আলমের মালিকানাধীন গোল্ডেন আয়রন ওয়ার্কস লিমিটেড, গোল্ডেন ইস্পাত, এইচএম স্টিল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, দেশের অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী ও ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর মালিকানাধীন এসএন করপোরেশন এবং তার ভাই লিয়াকত আলী চৌধুরীর মালিকানাধীন আসাদী স্টিল এন্টারপ্রাইজ, যমুনা শিপ ব্রেকারস, ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিনের সি-শোর ইন্টারন্যাশনাল, আরাফিন এন্টারপ্রাইজ এবং এসএইচ এন্টারপ্রাইজ, ব্যবসায়ী সেকান্দার হোসাইনের কেআর শিপ রিসাইক্লিং লিমিটেড, কেআর স্টিল, কিং করপোরেশন, ব্যবসায়ী ও মিডল্যান্ড ব্যাংকের পরিচালক মাস্টার আবুল কাশেমের ম্যাক করপোরেশন, মাদার স্টিল লিমিটেড এবং কবির গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহজাহানের মালিকানাধীন কবির স্টিল লিমিটেড, খাজা স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং প্যাসিফিক স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি পুরোনো জাহাজ আমদানি করে।
এছাড়া মাস্টার অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং জেএইচ এন্টারপ্রাইজ, তাহের অ্যান্ড কোং লিমিটেড, এসবি করপোরেশন, সাম স্টিল ও এমএম শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রিজ, প্রিমিয়ার ট্রেড করপোরেশন, সীমা স্টিল, এসএল স্টিল, পিএইচপি শিপ ব্রেকার অ্যান্ড রিসাইক্লিং, এসএল স্টিল ও এসএল স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডসহ প্রায় ৭০টি স্ক্র্যাপ জাহাজ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ২০৩টি পুরোনো জাহাজ আমদানি করে। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনের মতে, বর্তমানে দেশে রডের চাহিদা আছে ৪৫ লাখ টনের। এর মধ্যে এ শিল্প হতে স্ক্র্যাপের জোগান দেয় ৩০ হতে ৩৫ লাখ টন। এ সরবরাহকৃত স্ক্র্যাপ হতে রড উৎপাদন করে ১০০টি স্টিল মিল ও ৫০০টি রি-রোলিং মিল। দেশের মোট ইস্পাতের চাহিদার ৮০ শতাংশই পূরণ করা হয় পুরোনো আমদানিকৃত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ করে। এসব ইস্পাত ব্যবহৃত হয় দেশের রাস্তাঘাট, সেতু, ফ্লাইওভার, ভবনসহ বড় অবকাঠামো নির্মাণে। বর্তমানে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণের মতো মেগা প্রকল্পগুলোসহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের অবকাঠামোগত আরও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় এ খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় ভালো মুনাফা হচ্ছে। বাংলাদেশ শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক সদস্য প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা শেয়ার বিজকে বলেন, দেশের অর্থনীতিতে প্রতিনিয়ত ব্যাপক অবদান রাখছে এ খাত। কয়েক বছর আগে এ খাতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার কারণে কিছুটা স্থবিরতা ছিল।
কিন্তু বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেক প্রকল্প চলমান থাকায় কোম্পানিগুলোর কাছে কাঁচামালের চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে এ খাত আবারও চাঙা হয়ে ওঠে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারদর ঘন ঘন ওঠানামা এবং ডলারের উচ্চমূল্য আমাদের চিন্তায় ফেলে দিচ্ছে। এভাবে হলে আগামীতে বাজারে অস্থিরতা দেখা দেবে। উল্লেখ্য, ৬০-এর দশকে সীতাকু- উপজেলার ফৌজদারহাট সমুদ্র উপকূলে ঝড়ে আটকে যাওয়া জাহাজ কুইন আল পাইন ভেঙে স্থানীয় কয়েকজন পুঁজিপতি এখানে জাহাজ ভাঙা শিল্পের সূচনা করেন। তারপর এ ব্যবসায় প্রচুর লাভের কথা বিবেচনা করে ব্যবসায়ীরা গড়ে তোলেন শিপইয়ার্ড। ফলে এতদিনে উপজেলার ফৌজদারহাট থেকে বার আউলিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে জাহাজভাঙা শিল্প।
বর্তমানে এ অঞ্চলে রয়েছে প্রায় ১৫৪টি জাহাজভাঙা প্রতিষ্ঠান। কয়েক বছরের চাঙা ব্যবসায় ব্যাংকগুলোও বেশি মুনাফার আশায় এ শিল্পে অর্থায়ন করছে। কিন্তু কয়েক বছরের মন্দা ও লোকসানের কারণে অধিকাংশ জাহাজভাঙা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।


























