গাঁয়ের মেঠো পথ, দুপাশে সবুজ ফসলি মাঠ, সারি সারি খেজুর গাছ। সুপারির খোল নিয়ে টানাটানি করছেন কিশোরের দল, কেউ দিচ্ছে গাছের উপর থেকে দিঘীতে লাফ। কৃষক-কৃষাণীরা ব্যস্ত মাঠের ধান ঘরে তুলতে। রহমত মিয়া রসের হাঁড়িটা গাছে ঝুলিয়ে বসিয়ে দিলেন নিপুণ হাতের কৌশলে। তাজা সবজি নিয়ে বাজারের দিকে হাঁটা ধরলেন একদল কৃষক। বেড়িবাঁধ থেকে আঁকাবাঁকা খালটি বঙ্গোপসাগরে। ক্ষুদ্র চাকা চাকা মাটির দলা। তার ওপর সবুজের আস্তরণ। যেন এক একটি সবুজ দ্বীপ। ঝাউ গাছগুলো বাতাসে দোল খাচ্ছে। মাঝিদের ডিঙি নৌকাগুলো দূর থেকে আঁচ করা যায়। শীতের দিনের শান্ত সাগর কোলাহলমুক্ত। পাখিদের ঝাঁক মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেল। বলছিলাম সীতাকুণ্ডের নদী মোহনায় অবস্থিত নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁধার গুলিয়াখালীর কথা। তবে কেবল গুলিয়াখালীই নয় এখানে আছে ১২৩০ ফুট উচ্চতার চন্দ্রনাথ পাহাড়, বোটানিক্যাল গার্ডেন ইকোপার্ক, বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতসহ বেশ কয়েকটি ঝর্ণা।
প্রতিদিন শত শত পর্যটকের পদচারণা এই শহরতলীতে। এরপরও সুনামের বদলে দুর্নাম কুড়াচ্ছে সীতাকুণ্ড প্রশাসন। বিশেষ করে পৌরসভা কর্তপক্ষের এক সিদ্ধান্ত ভোগাচ্ছে বছরের পর বছর। নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশন না করেই সড়কের পাশে ময়লা ফেলা শুরু হয়। সেই থেকে দুর্গন্ধ আর ময়লা-আবর্জনার পৌর শহর সীতাকুণ্ড। এসব কারণে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের বদলে সীতাকুণ্ডকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য আসছে দেশের নানা প্রান্ত থেকে।
দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইনখ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশের একটি স্থান যেন মরা পশু, মরা হাঁস-মুরগি আর ময়লা-আবর্জনা ফেলার ভাগাড় হয়ে উঠেছে।
ঢাকা থেকে আসার পথে উপজেলার বারৈয়াঢালা ইউনিয়নের ছোটদারোগারহাট পেরুলেই শুরু সীতাকুণ্ড পৌরসভার সীমানা। প্রথমে ১নং ওয়ার্ড নুনাছড়া, এরপর ২নং ওয়ার্ড শেখপাড়া এলাকা। সেখানে মহাসড়কের পাশে অন্তত ৪০০ গজ জায়গা জুড়ে চোখে পড়বে ময়লার ভাগাড়। মহাসড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা ময়লার দুর্গন্ধের এমন অবস্থা যেন নাক চেপে ধরেও সহ্য করার জোঁ নেই।
অথচ সীতাকুণ্ড পৌরসভা পার করেছে প্রতিষ্ঠার ২৬টি বছর। বছরের পর বছর সংস্থাটির কাণ্ডারিরা শুনিয়েছেন আধুনিক বর্জ্য শোধনাগারের গাল-গপ্প। আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার তো দূরের কথা এখন পর্যন্ত ময়লা-আবর্জনার সুষ্ঠু কোন ব্যবস্থাপনাই করতে পারেনি সংস্থাটি। ফলে দিনের পর দিন পৌরসভার এই প্রবেশ দ্বারই হয়েছে ময়লার ভাগাড়। মহাসড়কের পশ্চিম পাশের খালি জায়গায় ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে (ডাস্টবিন) পরিণত হয়েছে। পথচারীরা দুর্গন্ধে নাকে রুমাল চেপে চলাচল করছে কেউ কেউ হাত দিয়ে নাকমুখ চেপে ধরে চলাচল করছেন।
আবর্জনার দুর্গন্ধ বাতাসে মিশে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এই এলাকা দিয়ে চলাচল করার সময় ময়লার দুর্গন্ধে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন নারী ও শিশুরা। ভুগছেন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীসহ অন্যান্য সাধারণ মানুষ। ময়লার স্তূপে পথচারীদের চলাচলের ফুটপাথ বন্ধ হয়ে যায়। পৌরবাজার এবং বিভিন্ন ওয়ার্ডের ময়লা আবর্জনা ফেলতে শুরু করে সংশ্লিষ্টরা। পৌরসভা কর্তৃপক্ষের অবহেলায় ধীরে ধীরে তা ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়। এতে পথ চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হওয়ায় মহাসড়কের এ স্থানে প্রায়শ ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
বছরের পর বছর সড়কের ধারে ময়লা ফেলা হচ্ছে, কৃষি জমি, শস্য ও পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, সেইসাথে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। রোগজীবাণু বাসা বেঁধেছে, এখানেই ডেঙ্গুর চাষ হচ্ছে। তেমনি চলাচলে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারীরা।
কুমিল্লা থেকে গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটক তানজিল বলেন, হঠাৎ এই স্থানটি অতিক্রম করার সময় দুর্গন্ধ নাকে ধাক্কা দেয়। তখন মন খারাপ হয়ে যায়। পরে নাক চেপে ধরি। এই অবস্থায় এস্থান দিয়ে স্বাভাবিক যাতায়াত করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়।
আরেক পর্যটক সাকিব বলেন, এই জায়গা দিয়ে আমাদের বহনকারী গাড়ী য়াওয়ার সময় হঠাৎ নাকের মধ্যে খুব খারাপ একটা দুর্গন্ধ অনুভূত হল। তাৎক্ষণিক আমার বুমি বুমি ভাব শুরু হয়। আসলে এই পথ দিয়ে চলাচল করা কারো জন্য উচিত নয়।
স্থানীয়রা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী লাখো মানুষ ছাড়াও আশপাশের কয়েকটি স্কুল কলেজের হাজারো শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন এই পথে যাতায়াত করে। অথচ সড়কের পাশেই দিনের পর দিন এভাবে আবর্জনা পড়ে থাকায় দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। আবর্জনার ডিপোর উভয় পাশে অন্তত এক কিলোমিটার এলাকায় সারাক্ষণ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বিগত ২২ বছর ধরে পৌরসভার যাবতীয় বর্জ্য এখানে এনে ফেলা হচ্ছে। অথচ প্রতিবার নির্বাচনের আগে মেয়র প্রার্থীরা বিজয়ী হলে এখান থেকে বর্জ্য’র স্তূপ সরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে আশ্বাস শুধুমাত্র আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকে। এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে উল্টো ময়লার ডিপোকে আকারে আরও বড় করা হয়েছে। প্রথমদিকে সীমিত পরিসরে আবর্জনা ফেলা হলেও বর্তমানে প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। পৌরসভার ময়লা ফেলার সুযোগ নিয়ে আশেপাশের কয়েকটি মুরগির হ্যাচারী ও বিভিন্ন কারখানার উচ্ছিষ্ট বর্জ্যও এখানে ফেলা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
সীতাকুণ্ডবাসী এখন এই মাথাব্যাথা থেকে নিস্তার চাই। তাই সংশ্লিষ্টদের কাছে স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী এবং পরিবেশ প্রেমীদের দাবী দ্রুত ময়লার ভাগাড়টি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে কার্যকর প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা।
এ প্রসঙ্গে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক কে এম রফিকুল ইসলাম বলেন, পৌর এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রাখা আমাদের সীতাকুণ্ড পৌরসভা দায়িত্ব পালন করে থাকে। আমাদের এখানে পন্থিছিলাতে যে ডাম্পিং স্টোশনটি রয়েছে বিভিন্ন সময়ে স্টোশনটির অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ পেয়ে থাকি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। একটা সল্পমেয়াদী আর একটা হচ্ছে মধ্যম বা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। সল্পমেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বর্তমানে আমাদের যে সিস্টেমটা রয়েছে এটা নিয়মিতভাবে পরিষ্কার করা এবং আমাদের ডাম্পিং স্টোশন থেকে যে ময়লাগুলো আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে না পড়ে এটি নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে নিদিষ্টভাবে যে জায়গাটি রয়েছে ঐ জায়গার মধ্যে রাখা। পাশে যে খাল রয়েছে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি পাশের খালটি যেন কোনভাবে ভরাট না হয়ে যায় বা আমাদের ময়লাগুলো পড়ে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না করে। এটি কোনভাবে যেন খালের ক্ষতি না করে এটা আমাদের সল্পমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল। আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে আমরা যেটা চিন্তা করেছি পৌরসভার পক্ষ থেকে আমরা কিছু টেকনিক্যাল কনসালটেন্ট এর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। তারা আমাদের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দিবে পৌরসভার যে বর্জ্যগুলো রয়েছে সেগুলা আমরা কিভাবে ম্যানেজমেন্ট করলে পরিবেশের ক্ষতি না হয়ে থাকে।
বিজনেস বাংলাদেশ/ডিএস






















