১০:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

ঝুঁকিতে ৪ বেসরকারি ব্যাংক

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত কতটা ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম প্রতি বছরই তা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়। স্ট্রেস টেস্টিং নামক এ পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, শীর্ষ তিন ঋণ গ্রাহক খেলাপি বা সমস্যাগ্রস্ত হলে ১৯টি ব্যাংক সর্বোচ্চ ঝুঁকির মুখে পড়বে। এছাড়া আরও ছয় ব্যাংক মূূলধন সংকটে পড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বেঁধে দেওয়া দৈনিক নগদ জমার হার বা সিআরআর দিতে পারবে না ব্যাংকগুলো। এ তালিকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি রয়েছে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের নাম। স্ট্রেস টেস্টিংয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল।

এর মধ্যে শুধু শীর্ষ এক গ্রাহক খেলাপি হলে ভেঙে পড়বে একটি ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা। ঝুঁকি থাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেÑ (১) ন্যাশনাল ব্যাংক, (২) এক্সিম ব্যাংক, (৩) ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (৪) ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। স্ট্রেস টেস্টিং বা সহনশীল সক্ষমতার পরীক্ষা হচ্ছে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সহনক্ষমতা যাচাই করার পদ্ধতি। এজন্য একটি ব্যাংকের ঋণ, বাজার ও তারল্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়। মোট ৪৮টি ব্যাংকের ওপর এমন পরীক্ষা চালিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাকি ৯ ব্যাংকের মূলধন সংকট থাকায় তাদের এ পরীক্ষার আওতায় আনা হয়নি। এ পরীক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখতে পেয়েছে, সুদের হার বৃদ্ধি পেলে কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থা আরও নাজুক হবে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এতে আমানত সংগ্রহে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে ব্যাংকগুলোর, যা চাপ বাড়াবে মূলধনের ওপর।

এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে। তবে এ পরীক্ষায় বাদ দেওয়া হয়েছে নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংককে। কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ফারমার্স ব্যাংক এখন ঝুঁকিমুক্ত হয়নি। সার্বিক সহনশীল সক্ষমতার পরীক্ষায় নেওয়া হলে ব্যাংকের সার্বিক চিত্র আরও ভয়াবহ আকারে প্রকাশ পাবে। একটি ব্যাংকের জন্য পুরো ব্যাংকের চিত্র ভুলভাবে উপস্থাপন হবে। এতে সঠিক চিত্র উঠে আসবে না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে ব্যাংক খাতে মিশ্র ঝুঁকির প্রবণতা রয়েছে। এই তিন ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রার হার ও খেলাপি ঋণ। যদিও বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকই এমন চাপ সহ্য করার মতো সক্ষমতায় রয়েছে। তবে ঋণ, বাজার ও তারল্য ঝুঁকি একসঙ্গে চাপে ফেললে ব্যাংক খাতে মূলধন সংরক্ষণে বেকায়দায় ফেলবে ব্যাংকগুলোকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৫৮টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৮টি ব্যাংকই সিআরআর নির্দিষ্ট অনুপাতে সংরক্ষণ করতে পারছে। বাকি ৯টি ব্যাংক সিআরআর নির্দিষ্ট মাত্রায় সংরক্ষণ করতে পারছে না। এর মধ্যে নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি থাকায় মোটেও সিআরআর জমা করতে পারছে না লসে থাকা পাঁচ ব্যাংক। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ তিন শতাংশ বৃদ্ধি পেলে সিআরআর ১০ শতাংশে নিচে নামবে চার ব্যাংকের। এর মধ্যে আরও দুই ব্যাংক ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তারল্য সংকটে পড়লে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ, দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো ও পরিচালন ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়বে। কয়েকটি ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত দেওয়া দুঃসাধ্য হবে। মূলধন সংকটে পড়ে ভেঙে পড়বে পুরো ব্যাংক খাতের চিত্র। বর্তমানে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। অথচ এ সময় পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে আট লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এর মধ্যে ছয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই রয়েছে ৪৩ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন ব্যাংকগুলো বড় গ্রাহকদের দিকেই বেশি আগ্রহ দেখায়। এজন্য এক গ্রাহকের খেলাপি হলে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে চলে যায়। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই স্ট্রেস টেস্টিং করে ব্যাংকের অবস্থান মূল্যায়ন করে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বপ্রথম ২০০৯ সালে এ পরীক্ষা করেছিল। এরপর থেকে প্রতি বছর করে আসছে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে আজ তারেক রহমানের জনসভা

ঝুঁকিতে ৪ বেসরকারি ব্যাংক

প্রকাশিত : ০৮:৫৫:৪২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ অগাস্ট ২০১৮

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত কতটা ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম প্রতি বছরই তা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়। স্ট্রেস টেস্টিং নামক এ পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, শীর্ষ তিন ঋণ গ্রাহক খেলাপি বা সমস্যাগ্রস্ত হলে ১৯টি ব্যাংক সর্বোচ্চ ঝুঁকির মুখে পড়বে। এছাড়া আরও ছয় ব্যাংক মূূলধন সংকটে পড়বে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বেঁধে দেওয়া দৈনিক নগদ জমার হার বা সিআরআর দিতে পারবে না ব্যাংকগুলো। এ তালিকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি রয়েছে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের নাম। স্ট্রেস টেস্টিংয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল।

এর মধ্যে শুধু শীর্ষ এক গ্রাহক খেলাপি হলে ভেঙে পড়বে একটি ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা। ঝুঁকি থাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেÑ (১) ন্যাশনাল ব্যাংক, (২) এক্সিম ব্যাংক, (৩) ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (৪) ও আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক। স্ট্রেস টেস্টিং বা সহনশীল সক্ষমতার পরীক্ষা হচ্ছে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সহনক্ষমতা যাচাই করার পদ্ধতি। এজন্য একটি ব্যাংকের ঋণ, বাজার ও তারল্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়। মোট ৪৮টি ব্যাংকের ওপর এমন পরীক্ষা চালিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাকি ৯ ব্যাংকের মূলধন সংকট থাকায় তাদের এ পরীক্ষার আওতায় আনা হয়নি। এ পরীক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখতে পেয়েছে, সুদের হার বৃদ্ধি পেলে কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থা আরও নাজুক হবে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এতে আমানত সংগ্রহে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে ব্যাংকগুলোর, যা চাপ বাড়াবে মূলধনের ওপর।

এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে। তবে এ পরীক্ষায় বাদ দেওয়া হয়েছে নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংককে। কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় ফারমার্স ব্যাংক এখন ঝুঁকিমুক্ত হয়নি। সার্বিক সহনশীল সক্ষমতার পরীক্ষায় নেওয়া হলে ব্যাংকের সার্বিক চিত্র আরও ভয়াবহ আকারে প্রকাশ পাবে। একটি ব্যাংকের জন্য পুরো ব্যাংকের চিত্র ভুলভাবে উপস্থাপন হবে। এতে সঠিক চিত্র উঠে আসবে না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে ব্যাংক খাতে মিশ্র ঝুঁকির প্রবণতা রয়েছে। এই তিন ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে সুদের হার, বৈদেশিক মুদ্রার হার ও খেলাপি ঋণ। যদিও বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকই এমন চাপ সহ্য করার মতো সক্ষমতায় রয়েছে। তবে ঋণ, বাজার ও তারল্য ঝুঁকি একসঙ্গে চাপে ফেললে ব্যাংক খাতে মূলধন সংরক্ষণে বেকায়দায় ফেলবে ব্যাংকগুলোকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৫৮টি ব্যাংকের মধ্যে ৪৮টি ব্যাংকই সিআরআর নির্দিষ্ট অনুপাতে সংরক্ষণ করতে পারছে। বাকি ৯টি ব্যাংক সিআরআর নির্দিষ্ট মাত্রায় সংরক্ষণ করতে পারছে না। এর মধ্যে নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি থাকায় মোটেও সিআরআর জমা করতে পারছে না লসে থাকা পাঁচ ব্যাংক। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ তিন শতাংশ বৃদ্ধি পেলে সিআরআর ১০ শতাংশে নিচে নামবে চার ব্যাংকের। এর মধ্যে আরও দুই ব্যাংক ব্যাসেল-৩ বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তারল্য সংকটে পড়লে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ, দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো ও পরিচালন ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়বে। কয়েকটি ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত দেওয়া দুঃসাধ্য হবে। মূলধন সংকটে পড়ে ভেঙে পড়বে পুরো ব্যাংক খাতের চিত্র। বর্তমানে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। অথচ এ সময় পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে আট লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এর মধ্যে ছয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই রয়েছে ৪৩ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এখন ব্যাংকগুলো বড় গ্রাহকদের দিকেই বেশি আগ্রহ দেখায়। এজন্য এক গ্রাহকের খেলাপি হলে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে চলে যায়। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই স্ট্রেস টেস্টিং করে ব্যাংকের অবস্থান মূল্যায়ন করে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বপ্রথম ২০০৯ সালে এ পরীক্ষা করেছিল। এরপর থেকে প্রতি বছর করে আসছে।