ঋণের টাকা সময়মতো পরিশোধ না করায় চলতি বছরের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতে ৩৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে ২০ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এসব মামলার বিপরীতে ব্যাংকগুলোর মোট পাওনা ২৩৫ কোটি ৬০ লাখ ৩৩ হাজার ৭২০ টাকা। এর মধ্যে বৃহৎ পাঁচটির কাছে ব্যাংকের পাওনা ২০৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। আর ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে ৩৩ গ্রাহকের কাছে খেলাপি ৩১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
এসব পাওনা আদায়ে ১১টি মামলা করে একক ব্যাংক হিসেবে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। অর্থঋণ আদালত সূত্রে জানা যায়, ঋণ পরিশোধ না করায় চট্টগ্রামের আরও ৩৮ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণের তালিকায় পড়ে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ভোজ্যতেল ও গুঁড়োদুধ আমদানিকারক ও বিপণনকারী, পোশাক উৎপাদন ও জাহাজ ভাঙা শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের পাইকারি পণ্য বিক্রেতা। এসব খেলাপি গ্রাহকের কাছে আটকে থাকা ২৩৫ কোটি ৬০ লাখ ৩৩ হাজার ৭২০ টাকা আদায়ে চলতি বছরের জুলাই মাসে ২০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৩৮টি মামলা করে। এর মধ্যে ১১টি মামলা করে একক ব্যাংক হিসেবে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক।
এরপর ইস্টার্ন ব্যাংক ও লংকাবাংলা ফাইন্যান্স তিনটি এবং ইউসিবিএল, এক্সিম ব্যাংক ও আইডিএলসি দুটি করে মামলা করে। বাকি আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, মাইডাস ফাইন্যান্স, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, বিডিবিএল, ব্যাংক এশিয়া, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ফিনিক্স ফাইন্যান্স লিমিটেড, ট্রাস্ট ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এবি ব্যাংক ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক প্রত্যেকেই একটি করে মামলা করে। গত মাসে বৃহৎ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা দাঁড়ায় ২০৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এ তালিকায় রয়েছে আলোচিত ঋণখেলাপি এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যান ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক শাহাবুদ্দীন আলমের মালিকানাধীন এসএ অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড এবং সামান্নাজ সুপার অয়েল লিমিটেড,
নূর জাহান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহম্মেদ রতনের মালিকানাধীন মেসার্স জাসমির ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেড, সানোয়ারা গ্রুপ অব কোম্পানিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সানোয়ারা ডেইরি ফুডস লিমিটেড এবং জাতীয় পার্টির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহজাবিন মোরশেদের স্বামী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম এবং তার পরিবারের মালিকানাধীন ক্রিস্টাল গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ক্রিস্টাল ফিশারিজ লিমিটেড। অপরদিকে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে ৩৩ গ্রাহকের খেলাপি তালিকায় রয়েছে মো. হোসেন, মেসার্স মিয়া ট্রেডিং করপোরেশন, মো. আলাউদ্দিন, আইমান এন্টারপ্রাইজ, বেঙ্গল ইন্টারপ্রাইজ, আল হক পোলট্রি অ্যান্ড ডেইরি ফার্ম, প্ল্যাকিং কমপ্লেক্স লিমিটেড, এসআই এন্টারপ্রাইজ,
এইচএসএম ইলেকট্রনিক্স, কামাল উদ্দিন, মো. ইসহাক, মোস্তাফিজুর রহমান, মইনউদ্দিন, মোজাম্মেল হক, জিকি আয়রন মার্ট, টিএম এন্টারপ্রাইজ, আনিকা এন্টারপ্রাইজ, ফাল্গ-নী অটোমোবাইল, মক্কা গিফট সেন্টার, ফারজানা কেব্লস, ভাইয়া স্টোর, শুভেচ্ছা করপোরেশন, শানে ফাহিম ভা-ারি, এশিয়া টেইলার্স, রাজেশ্বরী ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, শাহিন ইন্টারন্যাশনাল, রুবি ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রেডিং, শাহিন উদ্দিন, গোলাম কিবরিয়া, আবু নাসের মো. নজরুল ইসলাম, সুজন পালিত, চিটাগং মোটরস ওয়ার্কশপ ও ফেমাস রাইস প্রভৃতি। ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর্থিক অবস্থা ভালো দেখাতে ডিসেম্বরে বাছবিচার ছাড়াই ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে। কিন্তু মার্চে এসে পুনঃতফসিলকৃত ঋণসহ নতুন ঋণও খেলাপি হয়ে পড়ে। এছাড়া বিশেষ সুবিধায় ২০১৫ সালে পুনর্গঠন করা ঋণের বড় একটি অংশও এখন খেলাপি।
সব মিলিয়ে আবারও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। আর খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ সুশাসনের ঘাটতি থাকায় ব্যাংকগুলোয় অনিয়ম-দুর্নীতি বেড়ে যাচ্ছে। নূরজাহান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহম্মেদ রতন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের ঘন ঘন দর ওঠানামা, দেশীয় বাজারের তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে অনিয়মিত হয়ে পড়ে ব্যাংকিং লেনদেন। ব্যবসায় লোকসান গুনতে হয়েছে কয়েকগুণ। এ অবস্থায় খেলাপি হয়ে পড়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, দেশে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ আসছে না। ব্যবসা-বাণিজ্যে ফিরছে না গতি।
এমন পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়ছে না, অন্যদিকে আগে বিতরণ হওয়া ঋণের টাকাও ফেরত পাচ্ছে না ব্যাংক। যা সার্বিক অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারিতে খেলাপি ঋণের দায়ে ১২টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৩টি, মার্চে ৪৯টি, এপ্রিলে ৩২টি, মে মাসে ৩৪টি এবং জুনে ২৭টি মামলা করা হয়।


























