গত ১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ রংপুরের ব্যবসায়ী আশরাফুল হক কে হত্যা এবং লাশ খন্ড-বিখন্ড করে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের পাশে দুটি ড্রামে ফেলে রাখার মামলায় প্রধান আসামি জরেজের প্রেমিকা শামীমা আক্তার কোহিনুর (৩৩)কুমিল্লা’কে গত ১৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ সকালে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তার নিজ বাড়ি হতে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৩।
মামলার সূত্রে জানাযায় যে, গত ১১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ রাত ০৮ টায় ব্যবসায়ী ভিকটিম আশরাফুল হক তার ব্যবসা সংক্রান্ত পাওনা আদায়ের লক্ষে একই গ্রামের বাসিন্দা বন্ধু জরেজুল ইসলাম এর সাথে রংপুর হতে ঢাকায় রওনা করে।
পরদিন সকাল হতে তার পরিবার ভিকটিম এর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তা বন্ধ পায়। পরবর্তীতে গত ১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ হাইকোর্টস্থ পানির পাম্প সংলগ্ন দুইটি নীল রংয়ের ড্রামে অজ্ঞাত নামা পুরুষের ২৬ খন্ডের মরদেহ রাজধানীর শাহবাগ থানা পুলিশ উদ্ধার করে। শাহবাগ থানা পুলিশ লাশের হাতের আঙ্গুলের ছাপ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করে অজ্ঞাত লাশটি নিখোজ ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের।

রাতে ভিকটিমের বোন বাদি হয়ে শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা রুজু করলে র্যাব মামলাটির রহস্য উদঘাটন ও অভিযুক্ত আসামিদের গ্রেফতারের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু করে। গোয়েন্দা সূত্র হতে প্রাপ্ত তথ্য ও তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় এই হত্যা কান্ডের প্রধান আসামি জরেজের প্রেমিকা শামীমা আক্তার কোহিনুর (৩৩)’কে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত আসামি শামীমা আক্তার কোহিনুরের দেওয়া তথ্যমতে ও তার মোবাইল ফোন বিশ্লেষনে জানাযায় হত্যা কান্ডের প্রধান আসামি জরেজের সাথে তার এক বছরের অধিক সময় ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। জরেজ শামীমাকে জানায় তার এক বন্ধুকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্লাকমেইল করে ১০ লক্ষ টাকা আদায় করা যাবে।
যা জরেজ ৭ লক্ষ টাকা নিবে আর শামীমা ৩ লক্ষ টাকা ভাগ করে নিবে। উক্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী শামীমা ভিকটিম আশরাফুল ইসলামের সাথে একমাস পূর্ব হতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ শুরু করে তার প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। মোবাইল ফোনে তাদের নিয়মিত অডিও এবং ভিডিও কলে কথা চলতে থাকে। পরবর্তীতে গত ১১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ রাত ০৮ টায় জরেজ ভিকটিম আশরাফুলকে নিয়ে ঢাকায় রওনা করে।
ঢাকায় আসার পর গত ১২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ জরেজ ও আশরাফুল শামীমার সাথে দেখা করে ঢাকা মহানগরীর শনির আখড়ার নূরপুর এলাকায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে একটি বাসা ভাড়া করে তিনজন একত্রে ভাড়া বাসায় ওঠে। রংপুর হতে ঢাকায় আসার পূর্বে জরেজ তার প্রেমিকা শামীমা আক্তার কোহিনুরকে ফোনে জানায় ভিকটিম আশরাফুলের সহিত সে যেন অন্তরঙ্গ ভিডিও ধারণ করে এবং পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সেই ভিডিও দেখিয়ে যাতে ১০ লক্ষ টাকা আদায় করা যায়।
দুপুরে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেঃ কর্নেল ফায়েজুল আরেফিন সাংবাদিকদের জানান পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ভিকটিম আশরাফুলকে মালটার শরবতের সাথে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে হালকা অচেতন করে যাতে বাইরে হতে জরেজ অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ভিডিও ধারণ করলে আশরাফুল তা বুঝতে না পারে। পরবর্তীতে যখন একান্ত সময় কাটায় তখন জরেজ বাইরে হতে ভিডিও ধারণ করে। উক্ত ভিডিও শামীমার মোবাইল হতে ভিডিও ধারণ করা হয় যা বর্তমানে উদ্ধারকৃত মোবাইলে রয়েছে।
তিনি আরো জানান,শামীমার দেওয়া তথ্য মতে ১২ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ দুপুরে আশরাফুল পুরোপুরি অচেতন হয়ে পড়লে জরেজ আশরাফুলের হাত দড়ি দিয়ে বেধে ফেলে এবং মুখ কসটেপ দিয়ে আটকে দেয়। জরেজ অতিরিক্ত ইয়াবা সেবন করে উত্তেজিত হয়ে অচেতন থাকা ভিকটিম আশরাফকে হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। অতিরিক্ত আঘাত এবং মুখ কসটেপ দিয়ে আটকানো থাকায় শ্বাস না নিতে পেরে ঘটনা স্থলেই আশরাফুল মৃত্যুবরন করে।
লাশ একই ঘরে রেখে জরেজ ও শামীমা রাত্রীযাপন করে এবং তারা শারিরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। আশরাফুলের মৃতদেহ গুম করার উদ্দেশ্য গত ১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ সকালে জরেজ নিকটস্থ বাজার হতে চাপাতি ও ড্রাম কিনে আনে।
জরেজ চাপাতি দিয়ে লাশ ২৬ টুকরা করে দুইটি নীল রংয়ের ড্রামে ভরে রাখে। পরবর্তীতে দুপুর ০২টা ৪৩ মিনিটে একটি সিএনজি ভাড়া করে ড্রাম দুটি সিএনজিতে নিয়ে দুপুর ০২টা ৫২ মিনিটে বাসা হতে রওনা করে। প্রতি মধ্যে তারা ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভবনা চিন্তা করে সিএনজি পরিবর্তন করে অন্য একটি সিএনজিতে রওনা করে।
দুপুর ০৩ টা ১৩ মিনিটে হাইকোট মাজার গেইটের নিকট আসলে রাস্তায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দেখে লাশভর্তি ড্রামদুটি হাইকোর্টের পানির পাম্প সংলগ্ন প্রধান সড়কের পাশে একটি বড় গাছের নিচে ফেলে তারা অতিদ্রুত হাইকোট এলাকা হতে একটি অটো যোগে সায়দাবাদ চলে যায়। সায়দাবাদ যাওয়ার পর জরেজ শামীমাকে কুমিল্লায় তার নিজ বাড়িতে চলে যেতে বলে এবং সে রংপুর তার নিজের বাড়িতে চলে যাবে বলে শামীমাকে জানায়।
সে অনুযায়ী শামীমা কুমিল্লা তার নিজ বাড়ীতে গমন করে এবং জরেজের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। শামীমার দেওয়া তথ্য মতে ভিকটিম আশরাফ এর রক্তমাখা সাদা রংয়ের পায়জামা-পাঞ্জাবীসহ হত্যার কাজে ব্যবহৃত দড়ি, কসটেপ, একটি গোলগলা গেঞ্জি এবং একটি হাফ প্যান্ট একটি বস্তার ভিতর মুখবাধা অবস্থায় শনির আখড়াস্থ নূরপুর এলাকা হতে র্যাব-৩ এর একটি আভিযানিক দল উদ্ধার করে।
তবে এই নৃশংস হত্যাকান্ডের পিছনে পূর্ব শত্রুতা আছে কিনা তা মূল আসামি জরেজ কে জিজ্ঞাসা বাদে বেরিয়ে আসবে।ধৃত আসামির বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
ডিএস./


























