০৫:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সীতাকুণ্ডে কৃষি জমিতে বালু ভরাটের মহোৎসব, সবজি উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে সবজি উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এই ইউনিয়নের উর্বর কৃষি জমিতে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের সবজি স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হয়। তবে সম্প্রতি এই গুরুত্বপূর্ণ কৃষি জমিতে কারখানা স্থাপনের নামে ব্যাপক হারে সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন করে কৃষি জমি ভরাট ও ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। যা স্থানীয় কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজার কয়েকশত একর ফসলি জমি দুইটি স্কেভেটর দিয়ে কেটে চারপাশে ৪০ থেকে ৫০ ফুট উঁচু বাঁধ নির্মাণ করে পরিখা তৈরী করা হয়েছে। পরবর্তীতে বেড়িবাঁধ কেটে পাইপ দিয়ে সমুদ্র থেকে বালু ফেলে জমিগুলো ভরাট করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ব্যস্ত থাকাকালে একটি চক্র শত শত একর আবাদি জমি নষ্ট করে সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন করে কৃষি জমি ভরাট করে সেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে। এতে ধীরে ধীরে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। একসময় যেসব জমিতে শীতকালীন সবজি, লাউ, শসা, বেগুন, মরিচ ও টমেটো উৎপাদন হতো, সেসব জমি এখন বালুর নিচে চাপা পড়ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকাবাসী।

এর আগে গত ২৪ নভেম্বর একই এলাকায় সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন করে কৃষিজমি ভরাটের চেষ্টা হলে কৃষকরা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে তাদের প্রতিহত করে এবং পরবর্তীতে গত ২৭ নভেম্বর গ্রামের শত শত কৃষক কৃষি জমি রক্ষার্থে মানববন্ধন ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে স্মারক লিপি প্রদান করে। সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন করে কৃষিজমি ভরাটের বিষয়ে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় কৃষক শওকত হোসেন বলেন, “এই জমিই আমাদের জীবিকার একমাত্র উৎস। এখন বালু দিয়ে জমি ভরাট করা হলে আমরা কোথায় চাষাবাদ করবো? এতে আমাদের বড় ক্ষতি হবে।”

আরেক কৃষক নুরউদ্দিন জানান, সৈয়দপুর ইউনিয়নকে এলাকার সবজি উৎপাদনের কেন্দ্র বলা হয়। এখানকার জমি নষ্ট হলে পুরো এলাকায় সবজির উৎপাদন কমে যাবে এবং বাজারে এর প্রভাব পড়বে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, প্যাসিফিক জিন্সের কর্ণধার সৈয়দ এম তানভীরের ভাড়াটিয়া লোকজন কৃষি জমি ভরাটের সঙ্গে জড়িত। সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন করে কৃষি জমি ভরাটে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে আবাসন বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য কৃষি জমি বালু দিয়ে ভরাট করছেন। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষি খাতেও মারাত্মক প্রভাব পড়বে।

স্থানীয়দের দাবি, কৃষি জমি রক্ষা, অবৈধ ভরাট বন্ধ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। অন্যথায় কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

সৈয়দপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা এড. হোসাইন আশরাফ বলেন, পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজার সমুদ্র উপকূলে একদিকে কৃষি জমি কেটে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্র থেকে বালু তুলে শত শত একর কৃষি জমি ভরাট করা হচ্ছে, ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে উপকূলীয় এলাকায় বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটতে পারে।

তিনি আরও বলেন, একটি সিন্ডিকেট কৃষকদের জমির মাটি কেটে নিচ্ছে। কিছু কৃষক আর্থিক লোভে জমি দিতে বাধ্য হচ্ছেন, ফলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। এলাকার শত শত কৃষক বেকার হয়ে পড়েছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি জমি রক্ষায় দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে সৈয়দপুর ইউনিয়নের সবজি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এ বিষয়ে প্যাসিফিক জিন্সের কর্ণধার সৈয়দ এম তানভিরকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ফখরুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের সময় কেউ সুযোগ নিয়ে পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজার ফসলি জমি নষ্ট করে থাকতে পারে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব যদি আইনের ব্যত্যয় ঘটে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ডিএস./

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

নারায়ণগঞ্জে ব্যবসায়ী হত্যায় একজনের মৃত্যুদণ্ড

সীতাকুণ্ডে কৃষি জমিতে বালু ভরাটের মহোৎসব, সবজি উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা

প্রকাশিত : ০৪:৪৮:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে সবজি উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এই ইউনিয়নের উর্বর কৃষি জমিতে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের সবজি স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হয়। তবে সম্প্রতি এই গুরুত্বপূর্ণ কৃষি জমিতে কারখানা স্থাপনের নামে ব্যাপক হারে সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন করে কৃষি জমি ভরাট ও ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। যা স্থানীয় কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজার কয়েকশত একর ফসলি জমি দুইটি স্কেভেটর দিয়ে কেটে চারপাশে ৪০ থেকে ৫০ ফুট উঁচু বাঁধ নির্মাণ করে পরিখা তৈরী করা হয়েছে। পরবর্তীতে বেড়িবাঁধ কেটে পাইপ দিয়ে সমুদ্র থেকে বালু ফেলে জমিগুলো ভরাট করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ব্যস্ত থাকাকালে একটি চক্র শত শত একর আবাদি জমি নষ্ট করে সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন করে কৃষি জমি ভরাট করে সেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে। এতে ধীরে ধীরে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। একসময় যেসব জমিতে শীতকালীন সবজি, লাউ, শসা, বেগুন, মরিচ ও টমেটো উৎপাদন হতো, সেসব জমি এখন বালুর নিচে চাপা পড়ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকাবাসী।

এর আগে গত ২৪ নভেম্বর একই এলাকায় সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন করে কৃষিজমি ভরাটের চেষ্টা হলে কৃষকরা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে তাদের প্রতিহত করে এবং পরবর্তীতে গত ২৭ নভেম্বর গ্রামের শত শত কৃষক কৃষি জমি রক্ষার্থে মানববন্ধন ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে স্মারক লিপি প্রদান করে। সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন করে কৃষিজমি ভরাটের বিষয়ে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় কৃষক শওকত হোসেন বলেন, “এই জমিই আমাদের জীবিকার একমাত্র উৎস। এখন বালু দিয়ে জমি ভরাট করা হলে আমরা কোথায় চাষাবাদ করবো? এতে আমাদের বড় ক্ষতি হবে।”

আরেক কৃষক নুরউদ্দিন জানান, সৈয়দপুর ইউনিয়নকে এলাকার সবজি উৎপাদনের কেন্দ্র বলা হয়। এখানকার জমি নষ্ট হলে পুরো এলাকায় সবজির উৎপাদন কমে যাবে এবং বাজারে এর প্রভাব পড়বে।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, প্যাসিফিক জিন্সের কর্ণধার সৈয়দ এম তানভীরের ভাড়াটিয়া লোকজন কৃষি জমি ভরাটের সঙ্গে জড়িত। সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন করে কৃষি জমি ভরাটে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে আবাসন বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য কৃষি জমি বালু দিয়ে ভরাট করছেন। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষি খাতেও মারাত্মক প্রভাব পড়বে।

স্থানীয়দের দাবি, কৃষি জমি রক্ষা, অবৈধ ভরাট বন্ধ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। অন্যথায় কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

সৈয়দপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা এড. হোসাইন আশরাফ বলেন, পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজার সমুদ্র উপকূলে একদিকে কৃষি জমি কেটে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্র থেকে বালু তুলে শত শত একর কৃষি জমি ভরাট করা হচ্ছে, ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে উপকূলীয় এলাকায় বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটতে পারে।

তিনি আরও বলেন, একটি সিন্ডিকেট কৃষকদের জমির মাটি কেটে নিচ্ছে। কিছু কৃষক আর্থিক লোভে জমি দিতে বাধ্য হচ্ছেন, ফলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষি ও জীবিকায় মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। এলাকার শত শত কৃষক বেকার হয়ে পড়েছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি জমি রক্ষায় দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে সৈয়দপুর ইউনিয়নের সবজি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এ বিষয়ে প্যাসিফিক জিন্সের কর্ণধার সৈয়দ এম তানভিরকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ ফখরুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনি দায়িত্ব পালনের সময় কেউ সুযোগ নিয়ে পশ্চিম সৈয়দপুর মৌজার ফসলি জমি নষ্ট করে থাকতে পারে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব যদি আইনের ব্যত্যয় ঘটে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ডিএস./