কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে অনীহা বেড়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক সময় মতো সঠিক তথ্য পাচ্ছে না। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন তৈরি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে সময়মতো প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণ বিতরণ, ঋণ বিতরণের ধরন, আদায়, অনাদায়, আমানত সংগ্রহ, আমানত ফিরিয়ে দেওয়া, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো আর্থিক লেনদেন করে থাকে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার ভিত্তিতে এ সব ব্যাংক তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসব কার্যক্রমের তথ্য দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে দিতে হয়। কখনো কখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ, পর্যবেক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ত্বরিত তথ্য চায়। এর ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় গ্রহণ করে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সময় মতো প্রতিবেদন দিতে পারছে না।
এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ভর করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা কতটা ব্যবহার করছে ও রিপোর্ট না দিলে কি ব্যবস্থা নিচ্ছে তার ওপর। তিনি বলেন, ডিফল্ট, সিএসআরের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে যদি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কোনো অবহেলা করে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে শৈথিল্য দেখালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে তা বাংলাদেশ ব্যাংকেরই ব্যর্থতা। আর তথ্য ব্যবহারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গড়িমসি থাকলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও সময় মতো তথ্য দেবে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
ঋণের সুদ নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রতি মাসে প্রতিবেদন দিতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর স্বার্থ, গ্রাহকের স্বার্থ, বাজারে অর্থ সরবরাহ পরিস্থিতি, কৃষিঋণ বিতরণ, শেয়ার বাজার পরিস্থিতিসহ নানা ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে। এর ভিত্তিতে সব ব্যাংকের সমন্বিত প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকারও এসব তথ্যের ভিত্তিতে আর্থিক খাতের চিত্র পেয়ে থাকে।
সঠিক সময়ে ঋণ বিতরণ না করাতে সম্প্রতি একটি বাণিজ্যিক ব্যাংককে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পণ্য আমদানির জন্য এলসি (ঋণপত্র) খোলা, এলসির বিপরীতে বিদেশে টাকা প্রেরণ, নির্দেশিত সময়ের মধ্যে পণ্য দেশে আসা বা না আসার প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংককে তথ্য দেয়নি। উপরন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ওই প্রতিষ্ঠানের আবারও ঋণপত্র খোলে ব্যাংকটি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মিলে এ ধরনের অপ্রত্যাবশিত (বিল অব এন্ট্রি অভারডিউ) আমদানি বিলের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। মাস শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আগের মাসের কৃষিঋণ বিতরণ পরিস্থিতি বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ৭ থেকে ৮ তারিখের মধ্যে সমন্বিত প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংক সময় মতো তথ্য দেয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকও বাধ্য হয়ে ৭ থেকে ৮ তারিখের প্রতিবেদন তৈরি করে ২০ থেকে ২৫ তারিখে। প্রতি তিন মাসের মোট ঋণ বিতরণ, খেলাপির পরিমাণ, খেলাপি আদায়সহ যাবতীয় ঋণ পরিস্থিতির চিত্র সংবলিত প্রতিবেদন দেয় বাণিজ্যিক ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক এ সম্পর্কিত তথ্যের সমন্বয় করে পঞ্চম মাসের শুরুতে প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সময় মতো প্রতিবেদন না দেওয়া ও অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন দেওয়ার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন তৈরি করতে সময় লাগে পঞ্চম মাসের শেষ নাগাদ। ঋণ গ্রহীতার ধরন নিয়ে ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সব চেয়ে বড় ঋণ গ্রহীতা, মধ্যম ঋণ গ্রহীতা, গ্রাম-শহর, এসএমই, ছোট্ট ব্যবসা ইত্যাদির তথ্য ওই প্রতিবেদনে স্থান পায়। ‘সিডিউল ব্যাংক স্ট্যাটেসটিক্স’ শিরোনামে একটি প্রকাশনার ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংক তথ্য না দেওয়ার কারণে ২০১৮ সালে কোনো প্রকাশনা বের করতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। অথচ চলতি আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারি-মার্চ ও এপ্রিল-জুন দুটি প্রকাশনা বের করার কথা ছিল। বিষয়টি নিয়ে প্রকাশনা বিভাগে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলো তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি ও অবহেলা করে। আর রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব না দিতে চাওয়া ও পল্লী অঞ্চলের অধিকাংশ শাখাতে অনলাইনে যোগাযোগ না থাকার কারণে দ্রুত তথ্য দিতে পারে না। এসব কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পেতে দেরি হয়। আর এ কারণে সময় মতো বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বিত প্রতিবেদন করতে পারে না।


























