আগামী ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ইরানের অর্থনীতি ২৫ শতাংশেরও বেশি সংকুচিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। দাবি, দেশটিতে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তীব্র হচ্ছে, তেলের উৎপাদন কমতে শুরু করেছে এবং আগামী শীত মৌসুমে জ্বালানির বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে ইরানিদের আগেভাগেই পেট্রল ও ঘর গরম রাখার জ্বালানি মজুত করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর), ইরান ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, ওয়াশিংটনের ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় আগামী আট সপ্তাহে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও তীব্র করা হবে। তার মতে, এ চাপের প্রভাবে দেশটির অর্থনীতি এমন সংকোচনের মুখে পড়তে পারে, যা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দেশটির অর্থনৈতিক সংকোচনকেও ছাড়িয়ে যাবে।
ইরানি সাংবাদিক কামবিজ তাভানার সঙ্গে আলাপকালে বেসেন্ট বলেন, ‘আমি পূর্বাভাস দিচ্ছি, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত ইরানের অর্থনীতি ২৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দেশটির অর্থনীতি যতটা সংকুচিত হয়েছিল, এটি তার চেয়েও বেশি।’
মার্কিন অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, ওয়াশিংটনের এই অভিযান ইরানের সাধারণ জনগণের পরিবর্তে দেশটির নেতৃত্বকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে আসন্ন শীতে জ্বালানিসংকটের বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
ইরানের জনগণকে উদ্দেশ করে বেসেন্ট বলেন, ‘আমার পরামর্শ হবে, আপনারা কর দেবেন না। কারণ, সরকারের কাছ থেকে বিনিময়ে কিছুই পাবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘর গরম রাখার জ্বালানি মজুত করা শুরু করুন। এ ধরনের জ্বালানির বড় সংকট দেখা দিতে যাচ্ছে। পেট্রলের ক্ষেত্রে সবার উচিত এখনই গাড়ির ট্যাংক পূর্ণ করে রাখা।’
সাধারণ ইরানিদের ওপর অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে বেসেন্ট বলেন, খাদ্য ও ওষুধ আমদানির জন্য মানবিক সহায়তার পথ এখনো খোলা রয়েছে। তবে আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত ডলার ইরান সরকারের হাতে আর থাকছে না বলে দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ, ইরান সরকার অর্থ ছাপিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, সরকারি কর্মীদের বেতন পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে এবং সামাজিক সুবিধা কমানোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।
বেসেন্টের মতে, অর্থনৈতিক চাপ ইরানের রাজনীতিবিদ, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতার মধ্যে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
আইআরজিসির কয়েকজন কমান্ডারকে সাধারণ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছে, সে সম্পর্কে তাদের যথেষ্ট ধারণা নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দুই দফা যুদ্ধ, ইরানের তেল রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া মার্কিন নৌ অবরোধ এবং দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অবশিষ্ট উৎসগুলোকে লক্ষ্য করে সম্প্রসারিত নিষেধাজ্ঞা, সব মিলিয়ে ইরানের অর্থনীতি ক্রমেই চাপে পড়ছে।
বেসেন্ট বলেন, ‘তেল আবিষ্কারের পর সম্ভবত এই প্রথম ইরানের সমুদ্রে রফতানির অপেক্ষায় কোনো তেল নেই। খার্গ দ্বীপে তেল বোঝাইয়ের কোনো কার্যক্রম হয়নি। উৎপাদনও কমতে শুরু করেছে।’
ইরানের তেল রফতানির ক্ষেত্রে খার্গ দ্বীপ গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে সেখানে তেল বোঝাই বন্ধ থাকার বিষয়টিকে দেশটির জ্বালানি খাতের ওপর চাপের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আমরা আট সপ্তাহ ধরে এই অভিযান চালাচ্ছি। আমি বলতে পারি, আগামী আট সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও তীব্র হবে।’
বেসেন্ট জানান, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রস্তুত। তবে তেহরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে বলে জোর দেন তিনি।
এদিকে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। রোববার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান সফর করেন। এরপর সোমবার সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উত্তেজনা কমানো এবং আলোচনার পথ পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে তৎপরতা চালান।
তবে অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও নিজেদের মূল দাবিগুলো থেকে সরে আসার তেমন কোনো ইঙ্গিত দেয়নি তেহরান। ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।
ডিএস./






















