০৩:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ প্রকল্পের মধ্যেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা, লাইট ক্রুড ও কনডেনসেট নিয়ে প্রশ্ন; জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বিশেষজ্ঞদের

অনুমোদনহীন প্ল্যান্টে হেভি ক্রুড আমদানির উদ্যোগ সুপার পেট্রোকেমিক্যালের

সরকারি অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত না করেই নির্মাণাধীন বেসরকারি রিফাইনারির জন্য বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানির অনুমতি চেয়েছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালের জন্য ১২ লাখ টন ক্রুড আমদানির আবেদন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে। এর মধ্যে ৮ লাখ টন হেভি ক্রুড এবং ৪ লাখ টন লাইট ক্রুড রয়েছে। অথচ কয়েক মাস আগেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি তাদের নির্মাণাধীন প্ল্যান্টকে মূলত লাইট ক্রুড পরিশোধন উপযোগী বলে উল্লেখ করেছিল। একই সঙ্গে লাইট ক্রুডের সঙ্গে কনডেনসেটকে এক করে উপস্থাপনের বিষয়টিও কারিগরি মহলে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) বাস্তবায়নের উদ্যোগ যখন এগিয়ে চলছে, ঠিক সেই সময়ে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিট স্থাপন এবং হেভি ক্রুড আমদানির তৎপরতা জ্বালানি খাতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন, কারিগরি সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্র নিশ্চিত না করেই কীভাবে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিফাইনারি নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে এবং আমদানি অনুমতি চাইছে?

সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৭ অক্টোবর বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষের জন্য ৪ লাখ টন লাইট ক্রুড এবং ৮ লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানির অনুমতি চান। চিঠিতে বিপিসির ১০ আগস্টের একটি চাহিদাপত্রের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ২০২৭ সালে তারা বিপিসিকে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ টন অকটেন, ১ লাখ ১৯ হাজার টন পেট্রোল, ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টন ডিজেল এবং ৩ লাখ ৬১ হাজার টন হাই সালফার ফার্নেস অয়েল (এইচএফও) সরবরাহ করবে। এসব পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ১২ লাখ টন ক্রুড আমদানির অনুমতি প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে প্রতিষ্ঠানটির আগের চিঠির সঙ্গে সাম্প্রতিক আবেদনের তথ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। গত ১৪ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি তাদের নির্মাণাধীন প্ল্যান্টকে মূলত লাইট ক্রুড পরিশোধন উপযোগী হিসেবে বর্ণনা করেছিল। মাত্র সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে ২৭ অক্টোবর বিপিসির কাছে দেওয়া আবেদনে ৮ লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানির অনুমতি চাওয়ায় প্ল্যান্টটির প্রকৃত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এর আগে গত ১২ আগস্ট বিপিসিকে দেওয়া আরেক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রণব কুমার সাহা জানান, তাদের নির্মাণাধীন দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিট (সিডিইউ) ২০২৭ সালের মার্চে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনায় রিফাইনারি স্থাপনের প্রয়োজনীয় বৈধ সরকারি অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। ফলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির চিঠিপত্রে লাইট ক্রুডের পাশে বন্ধনীর মধ্যে কনডেনসেট শব্দ ব্যবহার করেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, কনডেনসেট ও লাইট ক্রুড দুটি ভিন্ন ধরনের পণ্য। এগুলোর উৎস, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের কারিগরি মানদণ্ড এক নয়। ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক এক মহাব্যবস্থাপক জানান, বিপিসি কখনোই কনডেনসেটকে লাইট ক্রুড হিসেবে গণ্য করে না। কনডেনসেট মূলত গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া উপজাত, অন্যদিকে ক্রুড অয়েল আসে তেলক্ষেত্র থেকে। দুটি পণ্য থেকেই জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হলেও এগুলোর প্রকৃতি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য ও ভূতত্ত্ববিদ মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, “কনডেনসেট ও লাইট ক্রুড এক নয়। কনডেনসেট আসে গ্যাসক্ষেত্র থেকে এবং লাইট ক্রুড আসে তেলক্ষেত্র থেকে। যদিও দুটোই প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি তৈরি হয়, কিন্তু আমদানি ও কারিগরি মানদণ্ডে এগুলোর প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।”

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অপরিশোধিত তেল আমদানি ও পরিশোধন দেশের জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থাপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, কারিগরি সক্ষমতা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং উৎপাদিত জ্বালানির মান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বিশেষ করে হেভি ক্রুড পরিশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অবকাঠামো না থাকলে উৎপাদন প্রক্রিয়া, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, “জ্বালানি অত্যন্ত স্পর্শকাতর জাতীয় পণ্য। সরকারি বৈধ অনুমোদন ছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে রিফাইনারি নির্মাণ সরাসরি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে। অনুমোদনহীন এমন কার্যক্রম আইনত দণ্ডনীয় এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনা উচিত।”

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের আরেকটি জায়গা হচ্ছে, ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়াতে সরকার যখন বড় ধরনের বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তখন নতুন বেসরকারি রিফাইনারির অনুমোদন ও আমদানি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলেও সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড ও স্বচ্ছ অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম জানান, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের পাঠানো চিঠিটি তাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি বিপিসির কারিগরি টিম পর্যালোচনা করছে। তবে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছাড়া একটি রিফাইনারি স্থাপনের কাজ কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে চলমান রয়েছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি।

উল্লেখ্য, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল বর্তমানে তাদের ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টে ইস্টার্ন রিফাইনারির ন্যাফতা এবং দেশি-বিদেশি কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে বিপিসিকে বিভিন্ন ধরনের পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ করে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি বিপিসিকে বিভিন্ন গ্রেডের মোট ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩৭ টন জ্বালানি পণ্য সরবরাহ করেছে। তবে বিদ্যমান ফ্রাকশনেশন কার্যক্রমের পাশাপাশি দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল ক্ষমতার ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিট নির্মাণ এবং ১২ লাখ টন হেভি ও লাইট ক্রুড আমদানির আবেদন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনাকে সামনে এনেছে।

এখন সংশ্লিষ্ট মহলে মূল প্রশ্ন, বিদ্যমান ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট পরিচালনার অনুমোদন ও সক্ষমতার ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ ক্রুড রিফাইনারি নির্মাণ এবং বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ চাওয়া কতটা বিধিসম্মত? এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বিপিসি এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থান কী, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি নিরাপত্তা, সরকারি বিনিয়োগ এবং জাতীয় পরিশোধন পরিকল্পনার স্বার্থে বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই ও পর্যালোচনার দাবি রাখে।

ডিএস./

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

জয়পুরহাটে সড়কে কিশোরের মৃত্যু, অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুরে যান চলাচল বন্ধ

ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ প্রকল্পের মধ্যেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা, লাইট ক্রুড ও কনডেনসেট নিয়ে প্রশ্ন; জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বিশেষজ্ঞদের

অনুমোদনহীন প্ল্যান্টে হেভি ক্রুড আমদানির উদ্যোগ সুপার পেট্রোকেমিক্যালের

প্রকাশিত : ০২:৩৩:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

সরকারি অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত না করেই নির্মাণাধীন বেসরকারি রিফাইনারির জন্য বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানির অনুমতি চেয়েছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালের জন্য ১২ লাখ টন ক্রুড আমদানির আবেদন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে। এর মধ্যে ৮ লাখ টন হেভি ক্রুড এবং ৪ লাখ টন লাইট ক্রুড রয়েছে। অথচ কয়েক মাস আগেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি তাদের নির্মাণাধীন প্ল্যান্টকে মূলত লাইট ক্রুড পরিশোধন উপযোগী বলে উল্লেখ করেছিল। একই সঙ্গে লাইট ক্রুডের সঙ্গে কনডেনসেটকে এক করে উপস্থাপনের বিষয়টিও কারিগরি মহলে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) বাস্তবায়নের উদ্যোগ যখন এগিয়ে চলছে, ঠিক সেই সময়ে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিট স্থাপন এবং হেভি ক্রুড আমদানির তৎপরতা জ্বালানি খাতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন, কারিগরি সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্র নিশ্চিত না করেই কীভাবে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিফাইনারি নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে এবং আমদানি অনুমতি চাইছে?

সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২৭ অক্টোবর বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষের জন্য ৪ লাখ টন লাইট ক্রুড এবং ৮ লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানির অনুমতি চান। চিঠিতে বিপিসির ১০ আগস্টের একটি চাহিদাপত্রের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ২০২৭ সালে তারা বিপিসিকে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ টন অকটেন, ১ লাখ ১৯ হাজার টন পেট্রোল, ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টন ডিজেল এবং ৩ লাখ ৬১ হাজার টন হাই সালফার ফার্নেস অয়েল (এইচএফও) সরবরাহ করবে। এসব পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ১২ লাখ টন ক্রুড আমদানির অনুমতি প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে প্রতিষ্ঠানটির আগের চিঠির সঙ্গে সাম্প্রতিক আবেদনের তথ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। গত ১৪ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি তাদের নির্মাণাধীন প্ল্যান্টকে মূলত লাইট ক্রুড পরিশোধন উপযোগী হিসেবে বর্ণনা করেছিল। মাত্র সাড়ে তিন মাসের ব্যবধানে ২৭ অক্টোবর বিপিসির কাছে দেওয়া আবেদনে ৮ লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানির অনুমতি চাওয়ায় প্ল্যান্টটির প্রকৃত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এর আগে গত ১২ আগস্ট বিপিসিকে দেওয়া আরেক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রণব কুমার সাহা জানান, তাদের নির্মাণাধীন দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিট (সিডিইউ) ২০২৭ সালের মার্চে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনায় রিফাইনারি স্থাপনের প্রয়োজনীয় বৈধ সরকারি অনুমোদনের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। ফলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির চিঠিপত্রে লাইট ক্রুডের পাশে বন্ধনীর মধ্যে কনডেনসেট শব্দ ব্যবহার করেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, কনডেনসেট ও লাইট ক্রুড দুটি ভিন্ন ধরনের পণ্য। এগুলোর উৎস, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের কারিগরি মানদণ্ড এক নয়। ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক এক মহাব্যবস্থাপক জানান, বিপিসি কখনোই কনডেনসেটকে লাইট ক্রুড হিসেবে গণ্য করে না। কনডেনসেট মূলত গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া উপজাত, অন্যদিকে ক্রুড অয়েল আসে তেলক্ষেত্র থেকে। দুটি পণ্য থেকেই জ্বালানি উৎপাদন সম্ভব হলেও এগুলোর প্রকৃতি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য ও ভূতত্ত্ববিদ মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, “কনডেনসেট ও লাইট ক্রুড এক নয়। কনডেনসেট আসে গ্যাসক্ষেত্র থেকে এবং লাইট ক্রুড আসে তেলক্ষেত্র থেকে। যদিও দুটোই প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি তৈরি হয়, কিন্তু আমদানি ও কারিগরি মানদণ্ডে এগুলোর প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।”

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অপরিশোধিত তেল আমদানি ও পরিশোধন দেশের জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থাপনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, কারিগরি সক্ষমতা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং উৎপাদিত জ্বালানির মান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বিশেষ করে হেভি ক্রুড পরিশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অবকাঠামো না থাকলে উৎপাদন প্রক্রিয়া, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, “জ্বালানি অত্যন্ত স্পর্শকাতর জাতীয় পণ্য। সরকারি বৈধ অনুমোদন ছাড়া ব্যক্তিপর্যায়ে রিফাইনারি নির্মাণ সরাসরি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে। অনুমোদনহীন এমন কার্যক্রম আইনত দণ্ডনীয় এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনা উচিত।”

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের আরেকটি জায়গা হচ্ছে, ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়াতে সরকার যখন বড় ধরনের বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তখন নতুন বেসরকারি রিফাইনারির অনুমোদন ও আমদানি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলেও সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড ও স্বচ্ছ অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম জানান, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের পাঠানো চিঠিটি তাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি বিপিসির কারিগরি টিম পর্যালোচনা করছে। তবে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ছাড়া একটি রিফাইনারি স্থাপনের কাজ কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে চলমান রয়েছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দেননি।

উল্লেখ্য, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল বর্তমানে তাদের ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টে ইস্টার্ন রিফাইনারির ন্যাফতা এবং দেশি-বিদেশি কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে বিপিসিকে বিভিন্ন ধরনের পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহ করে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি বিপিসিকে বিভিন্ন গ্রেডের মোট ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩৭ টন জ্বালানি পণ্য সরবরাহ করেছে। তবে বিদ্যমান ফ্রাকশনেশন কার্যক্রমের পাশাপাশি দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল ক্ষমতার ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিট নির্মাণ এবং ১২ লাখ টন হেভি ও লাইট ক্রুড আমদানির আবেদন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনাকে সামনে এনেছে।

এখন সংশ্লিষ্ট মহলে মূল প্রশ্ন, বিদ্যমান ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট পরিচালনার অনুমোদন ও সক্ষমতার ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ ক্রুড রিফাইনারি নির্মাণ এবং বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ চাওয়া কতটা বিধিসম্মত? এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বিপিসি এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থান কী, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি নিরাপত্তা, সরকারি বিনিয়োগ এবং জাতীয় পরিশোধন পরিকল্পনার স্বার্থে বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই ও পর্যালোচনার দাবি রাখে।

ডিএস./