০৩:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভবদহের বিলে ধানের বাম্পার ফলন, কৃষকের মুখে হাসি

অভয়নগর উপজেলার ভবদহ পাড়ের মানুষের ম্লান মুখে হাসি ফুটেছে। মাঠভরা ধানে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছেন কৃষকরা। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ায় ৬০০ হেক্টর জমিতে বেড়েছে চাষাবাদ। চলতি বছরের শেষে বোরো ধান রোপণ করে তিন ফসল ঘরে তোলার সম্ভাবনা জেগে উঠেছে কৃষক পরিবারে। নদী ও খাল খননসহ টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) প্রকল্প চালু হলে ঘুচবে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমস্যা।

এই প্রথম জলাবদ্ধ ভবদহবাসীর মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। একসময়ের জলাবদ্ধ জমিতে যারা মাছ শিকার ও শাপলা তুলে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা এখন ধান ফলাতে শুরু করেছেন। বর্ষা মৌসুমের আগেই সরকারিভাবে ভবদহের ২১ ও ৯ ভেন্ট স্নুইস গেটসহ টেকা, শ্রীহরী, মুক্তেশ্বরী ও ভৈরব নদী খননসহ আমডাঙ্গা খালের প্রশস্ততা বৃদ্ধির ফলে চলতি মৌসুমে আমন ধানের বাম্পার ফলনের পর উফশী আউশ ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।

পাকা ধানও কাটতে শুরু করেছেন কৃষক। ২০১৭ সালের উৎপাদনের দ্বিগুণ ফলন হয়েছে এবার। ৩০ হেক্টর জমির স্থলে ৬০০ হেক্টর জমিতে বেড়েছে ফলন। একসময়ের জলাবদ্ধ জমিতে সোনার রংয়ে ফলা পাকা ধানের গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। ভবদহ এলাকার কৃষক উপজেলার পায়রা ইউনিয়নের কালিশাকুল গ্রামের তাপস মন্ডল বলেন, প্রায় ৩০ বছর পর এবার প্রথম আমার জমিতে দুটি ফসল হয়েছে। সামনে আরেকডা ফসল করব।

তিনি সরকারের কৃষি প্রণোদনার আওতায় বিনামূল্যে উফশী আউশ ধান বীজ ও সার প্রদানের কথা তুলে ধরে বলেন, পানির যন্ত্রণা থেকে এবার আমরা মুক্তি পাইছি। সমশপুর গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, আগে মাছ শিকার করে সংসার চলত। এবার আমন ও আউশ ধান ঘরে তুলতি শুরু করিছি। ফকিরহাটের আনোয়ার হোসেন ও সুন্দলী এলাকার কৃষক দীপায়ন বিশ্বাস বলেন, নদী ও খাল খননের জন্নি জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পাইছি। তয় এহেবারে জলাবদ্ধতা বন্ধ করতি হলে টিআরএম প্রকল্প চালু করতি হবে।

তাইলে আমরা শান্তিতে থাকতি পারব। এহন মাছ আর শাপলা তুলে সংসার চালাতি হবে না। ভবদহ এলাকার পায়রা, বারান্দি, ফকিরহাট ব্লকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, তার ব্লকে ৭০ জন চাষির ১২০ হেক্টর জমিতে উফশী আউশ ব্রি ধান-২৮ রোপণ করে ৪.২ টন ফলন পেয়েছে। একসময়ের মাঠ ভরা পানিতে এখন ধানের বাম্পার ফলন, কথাটি বলে লুৎফর রহমানের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ গোলাম ছামদানী কৃষিতে সরকারের উন্নয়নের কথা তুলে ধরে বলেন, ভবদহবাসীর জন্য পরিকল্পনা ছিল আমন ও উফশী আউশ ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ কৃষককে আকৃষ্ট করা। তাতে আমরা সফল হয়েছি। তবে এ সফলতার পেছনে কৃষি মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবদান রয়েছে। ভবদহের পানিবন্দি খাল, বিল ও মাঠ থেকে পানি অপসারণের ব্যবস্থা করায় এ সফলতা এসেছে। এই প্রথম এ অঞ্চলের মানুষ এক মৌসুমে তিনটি ফসল ঘরে তুলতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উপজেলাব্যাপী ২০১৭ সালে ৬ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন করা হয়েছিল।

চলতি বছর ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনের ফলে ৬ হাজার ৭০০ হেক্টর ছাড়িয়ে অতিরিক্ত ৭২৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হচ্ছে। ইতোপূর্বে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। এখন উফশী আউশ ধানের বাম্পার ফলন ঘরে উঠাতে শুরু করেছে কৃষক।

ভবদহের পায়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি বিষ্ণুপদ দত্ত বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক চেষ্টায় ভবদহের মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। চলতি বছরের শুরুতে ভবদহ এলাকার নদী, খাল ও বিলের জল অপসারণে দীর্ঘমেয়াদি খনন কাজ হয়েছিল বিধায় জলাবদ্ধ জমিতে এবার ধান উৎপন্ন হয়েছে। অচিরেই টিআরএম প্রকল্প চালু হলে ভবদহের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে।

টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) প্রকল্পের জট খুলেছে বলে তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় টিআরএম প্রকল্প চালুসহ ভবদহের সার্বিক উন্নয়নে ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে গত ৫ আগস্ট একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। বিষয়টি যশোর পাউবোর (পানি উন্নয়ন বোর্ড) নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী নিশ্চিত করেছেন।

উল্লেখ্য, যশোর ও খুলনা জেলার বিল কপালিয়া, বিল ভায়না, বিল খুকশিয়া, বিল বোকড়সহ ২৭ বিলের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র প্রবাহপথ ভবদহ স্নুইস গেট। এই গেট দিয়ে পানি না বের হওয়ার কারণে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে জলাবদ্ধ ভবদহ এলাকায় মানুষ কোনো ফসল ফলাতে পারেননি।

বিবি/রেআ

ট্যাগ :

নীলফামারীতে সরাসরি প্রশ্নের উত্তর দিলেন ছয় প্রার্থী, আশ্বাস দিলেন অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর

ভবদহের বিলে ধানের বাম্পার ফলন, কৃষকের মুখে হাসি

প্রকাশিত : ০১:১৭:১১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ অক্টোবর ২০১৮

অভয়নগর উপজেলার ভবদহ পাড়ের মানুষের ম্লান মুখে হাসি ফুটেছে। মাঠভরা ধানে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছেন কৃষকরা। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ায় ৬০০ হেক্টর জমিতে বেড়েছে চাষাবাদ। চলতি বছরের শেষে বোরো ধান রোপণ করে তিন ফসল ঘরে তোলার সম্ভাবনা জেগে উঠেছে কৃষক পরিবারে। নদী ও খাল খননসহ টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) প্রকল্প চালু হলে ঘুচবে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমস্যা।

এই প্রথম জলাবদ্ধ ভবদহবাসীর মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। একসময়ের জলাবদ্ধ জমিতে যারা মাছ শিকার ও শাপলা তুলে জীবিকা নির্বাহ করতেন তারা এখন ধান ফলাতে শুরু করেছেন। বর্ষা মৌসুমের আগেই সরকারিভাবে ভবদহের ২১ ও ৯ ভেন্ট স্নুইস গেটসহ টেকা, শ্রীহরী, মুক্তেশ্বরী ও ভৈরব নদী খননসহ আমডাঙ্গা খালের প্রশস্ততা বৃদ্ধির ফলে চলতি মৌসুমে আমন ধানের বাম্পার ফলনের পর উফশী আউশ ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।

পাকা ধানও কাটতে শুরু করেছেন কৃষক। ২০১৭ সালের উৎপাদনের দ্বিগুণ ফলন হয়েছে এবার। ৩০ হেক্টর জমির স্থলে ৬০০ হেক্টর জমিতে বেড়েছে ফলন। একসময়ের জলাবদ্ধ জমিতে সোনার রংয়ে ফলা পাকা ধানের গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। ভবদহ এলাকার কৃষক উপজেলার পায়রা ইউনিয়নের কালিশাকুল গ্রামের তাপস মন্ডল বলেন, প্রায় ৩০ বছর পর এবার প্রথম আমার জমিতে দুটি ফসল হয়েছে। সামনে আরেকডা ফসল করব।

তিনি সরকারের কৃষি প্রণোদনার আওতায় বিনামূল্যে উফশী আউশ ধান বীজ ও সার প্রদানের কথা তুলে ধরে বলেন, পানির যন্ত্রণা থেকে এবার আমরা মুক্তি পাইছি। সমশপুর গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, আগে মাছ শিকার করে সংসার চলত। এবার আমন ও আউশ ধান ঘরে তুলতি শুরু করিছি। ফকিরহাটের আনোয়ার হোসেন ও সুন্দলী এলাকার কৃষক দীপায়ন বিশ্বাস বলেন, নদী ও খাল খননের জন্নি জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পাইছি। তয় এহেবারে জলাবদ্ধতা বন্ধ করতি হলে টিআরএম প্রকল্প চালু করতি হবে।

তাইলে আমরা শান্তিতে থাকতি পারব। এহন মাছ আর শাপলা তুলে সংসার চালাতি হবে না। ভবদহ এলাকার পায়রা, বারান্দি, ফকিরহাট ব্লকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, তার ব্লকে ৭০ জন চাষির ১২০ হেক্টর জমিতে উফশী আউশ ব্রি ধান-২৮ রোপণ করে ৪.২ টন ফলন পেয়েছে। একসময়ের মাঠ ভরা পানিতে এখন ধানের বাম্পার ফলন, কথাটি বলে লুৎফর রহমানের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ গোলাম ছামদানী কৃষিতে সরকারের উন্নয়নের কথা তুলে ধরে বলেন, ভবদহবাসীর জন্য পরিকল্পনা ছিল আমন ও উফশী আউশ ধানের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ কৃষককে আকৃষ্ট করা। তাতে আমরা সফল হয়েছি। তবে এ সফলতার পেছনে কৃষি মন্ত্রণালয় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবদান রয়েছে। ভবদহের পানিবন্দি খাল, বিল ও মাঠ থেকে পানি অপসারণের ব্যবস্থা করায় এ সফলতা এসেছে। এই প্রথম এ অঞ্চলের মানুষ এক মৌসুমে তিনটি ফসল ঘরে তুলতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উপজেলাব্যাপী ২০১৭ সালে ৬ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন করা হয়েছিল।

চলতি বছর ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনের ফলে ৬ হাজার ৭০০ হেক্টর ছাড়িয়ে অতিরিক্ত ৭২৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হচ্ছে। ইতোপূর্বে আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে। এখন উফশী আউশ ধানের বাম্পার ফলন ঘরে উঠাতে শুরু করেছে কৃষক।

ভবদহের পায়রা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সভাপতি বিষ্ণুপদ দত্ত বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক চেষ্টায় ভবদহের মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। চলতি বছরের শুরুতে ভবদহ এলাকার নদী, খাল ও বিলের জল অপসারণে দীর্ঘমেয়াদি খনন কাজ হয়েছিল বিধায় জলাবদ্ধ জমিতে এবার ধান উৎপন্ন হয়েছে। অচিরেই টিআরএম প্রকল্প চালু হলে ভবদহের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে।

টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) প্রকল্পের জট খুলেছে বলে তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় টিআরএম প্রকল্প চালুসহ ভবদহের সার্বিক উন্নয়নে ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে গত ৫ আগস্ট একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। বিষয়টি যশোর পাউবোর (পানি উন্নয়ন বোর্ড) নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী নিশ্চিত করেছেন।

উল্লেখ্য, যশোর ও খুলনা জেলার বিল কপালিয়া, বিল ভায়না, বিল খুকশিয়া, বিল বোকড়সহ ২৭ বিলের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র প্রবাহপথ ভবদহ স্নুইস গেট। এই গেট দিয়ে পানি না বের হওয়ার কারণে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে জলাবদ্ধ ভবদহ এলাকায় মানুষ কোনো ফসল ফলাতে পারেননি।

বিবি/রেআ