শহরের সাটিরপাড়া কালিকুমার ইনস্টিটিউশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পেছনে দুই কক্ষের একটি বাড়ি। ইটের গাঁথুনি থাকলেও প্রলেপ না পড়ায় অনেকটা শ্রীহীন। ঘরে ঢুকলেই দারিদ্রতার মলিন চিত্র চোখে পড়ে।
বিছানার পাশে মায়ের জীবনযুদ্ধের হাতিয়ার সেলাইযন্ত্র মেশিন। আর পাশের ৩৫ বর্গফুটের কক্ষটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা লেখকের বই।
অথচ শ্রীহীন এই বাড়ির ছেলে শামীম আহমেদ জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছে সারা দেশে। বেসরকারি একটি টেলিভিশনে ‘বাংলাদেশ জিজ্ঞাসা’ প্রতিযোগিতায় ৮০ হাজার প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে হয়েছেন দেশ সেরা।
চ্যাম্পিয়ন হয়ে জিতে নিয়েছেন এক কোটি টাকা। নিজের সঙ্গে আলোকিত করেছেন নরসিংদীকে।
নিজ কলেজের ছাত্র বিজয়ী হওয়ায় উচ্ছ্বসিত নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম।
তিনি বলেন, চরম দারিদ্রতার মধ্যেও ইচ্ছাশক্তি, মনের জোর, চেষ্টা ও কঠোর অধ্যবসায় থাকলে যে সাফল্য অর্জন করা যায় তার অনন্য উদাহরণ শামীম আহমেদ।
তিনি বলেন, সংঘাত, চরাঞ্চলের টেঁটাযুদ্ধ ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে প্রায় নেতিবাচক সংবাদের শিরোনাম হয় নরসিংদী। এরই মধ্যে শামীমের সাফল্য কলেজ তথা নরসিংদীবাসীর মুখ উজ্জ্বল করেছে।
৪৭ বছরে বাংলাদেশের অর্জন, সাফল্য, ব্যর্থতা- সব মিলিয়ে আমরা কোথায়-কীভাবে আছি সেই প্রশ্ন আর উত্তর নিয়ে একটি টিভিতে অনুষ্ঠিত হয় কুইজ শো ‘বাংলাদেশ জিজ্ঞাসা’।
শামীম আহমেদের সেই গল্পের কথা শুনতে গত মঙ্গলবার যাই সাটিরপাড়ায় তার বাড়িতে। বাবা আবদুল মোমেন ইউএমসি জুট মিলের অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক। মেজো ভাই সাইফুল ইসলাম সজিব ট্রেন দুর্ঘটনায় এক পা হারিয়েছেন।
আর ছোট ভাই সফিকুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে স্মাতকের ২য় বর্ষের ছাত্র।
শত অভাব-অনটনে শামীমের মা সামসুন নাহার দিনরাত সেলাই কাজের মাধ্যমে নিরলস পরিশ্রম করে সংসারের হাল ধরেন।
শামীম নরসিংদী সরকারি কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেছে। এরই মধ্যে বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাবা অবসরে যান। তাই এসএসসি পরীক্ষার পর থেকেই শামীম প্রাইভেট পড়ানো শুরু করে।
তবে জীবনযুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়ে করে যাওয়া শামীম বই পড়ার নেশায় মগ্ন। পত্রিকা আর বিভিন্ন লেখকের বই পড়া তার দৈনন্দিন রুটিন।
চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার প্রতীক্ষার অবসান ঘটল মহান বিজয় দিবসের রাতে। কোটি টাকা উঠল বিজয়ী শামীম আহমেদের হাতে। বিজয় নিশ্চিত হলে মঞ্চে ছুটে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আবেগ কেঁদে ফেলেন শামীমের মা। বিজয়ীর হাতে কোটি টাকার চেক তুলে দেন পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল।
অনুষ্ঠান প্রচারিত হওয়ার পর শামীমের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোক বাড়িতে গিয়ে শামীমকে অভিনন্দন জানান। স্থানীয় শিক্ষক শাহরুখ ইশতিয়াক খাঁন বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই অর্জন তার জীবনে অনাগত অসংখ্য সাফল্যের সূচনা মাত্র।’
জানতে চাইলে শামীমের মা সামসুন নাহার বলেন, ‘২০ বছর সেলাই কাজ করার সেই কষ্ট আজ সার্থক হয়েছে। এখন স্বপ্ন দেখি আমার ছেলে ভালো একটি চাকরি করবে।
শামীমের বাবা আবদুল মোমেন বলেন, ‘শামীম এই বয়সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সে দেশের সেরা হয়েছে। আমরা তাকে আরও ভালো জায়গায় দেখতে চাই।’
জানতে চাইলে শামীম আহমেদ বলেন, আমি ছিলাম মধ্যমমানের ছাত্র। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণি পাওয়ার পর লক্ষ্য ছিল বিসিএস পরীক্ষায় পাস করা। সে কারণে প্রাইভেট পড়ানোর পর বাকি সময়টুকু আমি লাইব্রেরিতে কাটিয়েছি এবং ইন্টারনেটে বই পড়েছি। আর সেই কঠোর পরিশ্রমের কারণেই আজ আমি বাংলাদেশ জিজ্ঞাসা প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়েছি। আমি আশাবাদী সবার দোয়া ও ভালোবাসা নিয়ে অনেক দূর যেতে পারব।
বিবি/ ইএম





















