০৯:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

জ্বলছে পৃথিবীর ফুসফুস!

জ্বলছে পৃথিবীর ফুসফুস! আমাজনের বৃষ্টিচ্ছায় অরণ্য, যা কিনা পৃথিবীতে অক্সিজেনের জোগানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেয়, সেখানে আচমকা দাবানল। গোটা জঙ্গল ঢেকে গিয়েছে কালো ধোঁয়া, কার্বন মনোক্সাইডের বিষাক্ত গ্যাসে। ব্রাজিলের সাও পাওলোয় দিনেই নেমে এসেছে রাতের আঁধার। সবুজ চাঁদোয়ার নিচে দাউদাউ জ্বলছে আগুন। বহু বড় গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা। সেইসঙ্গে বিপন্ন আমাজনের জঙ্গলের বন্যপ্রাণীরাও।

জঙ্গলে দাবানল নতুন কোনও ঘটনা নয়। ইউরোপের বহু অরণ্য গ্রীষ্মকালে দাবানলের কোপে পড়ে। তা নেভাতে হিমশিম খেতে হয় দমকল কর্মীদের। কিন্তু আমাজনের জঙ্গলে এত বড় অগ্নিকাণ্ডে কার্যত আতঙ্কিত ব্রাজিলবাসী। সাও পাওলোর চেহারা তাঁদের দিশেহারা করে দিচ্ছে। অনেকেই ব্রাজিল সরকারের অরণ্য নীতিকে দুষছেন। সেখানকার পরিবেশ গবেষক আলবার্তো সেটজারের কথায়, ‘শুষ্ক আবহাওয়া সবসময়েই আগুন ছড়াতে সাহায্য করে। সেটা প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আগুন লাগার পিছনে সবসময়েই মানুষের হাত আছে। সে দুর্ঘটনাবশতই হোক বা ইচ্ছাকৃত।’

সাও পাওলো শহরের অনেকটা জুড়ে রয়েছে আমাজন জঙ্গল। পরিবেশবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, জঙ্গলের জমি বেআইনিভাবে সাফ করে চাষযোগ্য করে তুলছেন অনেকে। যাতে ব্রাজিল সরকারও কোনও আপত্তি করছে না। এর জেরেই ভূমিক্ষয়ের আশঙ্কা বাড়ছে, আলগা হচ্ছে বড় গাছের শিকড়। যা খুব দ্রুতই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বড় কারণ হয়ে উঠবে। যদিও পরিবেশবিদদের এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো। যিনি আবার জঙ্গল কেটে কৃষিকাজের পক্ষে বলেই দেশবাসীর কাছে পরিচিত। আর এই সুযোগেই সাধারণ মানুষ আমাজনের বিপদ বাড়াচ্ছেন বলে মত পরিবেশবিজ্ঞানীদের।

এমনিতেই বিশ্ব উষ্ণায়নের অভিশাপে ভুগছে গোটা পৃথিবী। পৃথিবীর এতটা অংশজুড়ে গড়ে ওঠা আমাজনের বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল এতদিন তার কোপে ততটা না পড়লেও, এই দাবানল আর ঠেকাতে পারল না। এরপর আমাজনের প্রকৃতিও নষ্ট হতে থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকে। এতদিন যে বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহ করত গোটা পৃথিবীকে, তা এখন কার্যত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের খনিতে পরিণত হয়েছে। এনিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই। প্রেসিডেন্টের এই অরণ্যনীতির জন্য ইতিমধ্যেই বহু সমালোচিত তিনি।
রহস্যে ঘেরা আমাজন অরণ্যের কথা শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রকৃতিপ্রেমী থেকে শুরু করে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে প্রবল আগ্রহের জায়গা এই আমাজন। পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকার যে অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে, তার ২০ শতাংশ যোগান দেয় এই বন। যে কারণে এই আমাজন বনকে বলা হয় ‘পৃথিবীর ফুসফুস’। সেই অরণ্য এখন নিঃশেষ হচ্ছে দাবানলে।

ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্স (ইএনপিই) বলছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত আমাজনের ব্রাজিল অংশে ৭২ হাজার ৮৪৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের তুলনায় যা ৮০ শতাংশ বেশি এবং ২০১৩ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।

সংস্থাটির হিসাব মতে, দাবানলে প্রতি মিনিটে আমাজনের প্রায় ১০ হাজার বর্গমিটার এলাকা পুড়ে যাচ্ছে। এভাবে পুড়তে থাকলে জলবায়ু পরিবর্তনবিরোধী আন্দোলনে বিশাল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা।

এদিকে, আমাজন বনাঞ্চলে চলতি বছরের রেকর্ড সংখ্যক অগ্নিকাণ্ডকে ‘আন্তর্জাতিক সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাখোঁ।

৭০ লাখ বর্গ কিলোমিটার অববাহিকা পরিবেষ্টিত এই জঙ্গলের প্রায় ৫৫ লাখ বর্গ কিলোমিটার এলাকাটি মূলত আর্দ্র জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত। ৯টি দেশজুড়ে এই অরণ্য বিস্তৃত। আমাজন জঙ্গলের ৬০ ভাগ ব্রাজিলে, ১৩ ভাগ পেরুতে এবং বাকি অংশ রয়েছে কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, গায়ানা, সুরিনাম এবং ফরাসি গায়ানায়। এই গহীন অরণ্যে ৪৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড় আছে। এছাড়া ৪২৮ প্রজাতির উভচর, ৩৭৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৪২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে। এছাড়া আমাজন নদীতে ৩ হাজার প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী আছে। এই বন প্রতিবছর ২০০ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে।

বিজনেস বাংলাদেশ-/এমএ

ট্যাগ :

৯ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন জামায়াত আমির

জ্বলছে পৃথিবীর ফুসফুস!

প্রকাশিত : ০৩:৪৭:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অগাস্ট ২০১৯

জ্বলছে পৃথিবীর ফুসফুস! আমাজনের বৃষ্টিচ্ছায় অরণ্য, যা কিনা পৃথিবীতে অক্সিজেনের জোগানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেয়, সেখানে আচমকা দাবানল। গোটা জঙ্গল ঢেকে গিয়েছে কালো ধোঁয়া, কার্বন মনোক্সাইডের বিষাক্ত গ্যাসে। ব্রাজিলের সাও পাওলোয় দিনেই নেমে এসেছে রাতের আঁধার। সবুজ চাঁদোয়ার নিচে দাউদাউ জ্বলছে আগুন। বহু বড় গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা। সেইসঙ্গে বিপন্ন আমাজনের জঙ্গলের বন্যপ্রাণীরাও।

জঙ্গলে দাবানল নতুন কোনও ঘটনা নয়। ইউরোপের বহু অরণ্য গ্রীষ্মকালে দাবানলের কোপে পড়ে। তা নেভাতে হিমশিম খেতে হয় দমকল কর্মীদের। কিন্তু আমাজনের জঙ্গলে এত বড় অগ্নিকাণ্ডে কার্যত আতঙ্কিত ব্রাজিলবাসী। সাও পাওলোর চেহারা তাঁদের দিশেহারা করে দিচ্ছে। অনেকেই ব্রাজিল সরকারের অরণ্য নীতিকে দুষছেন। সেখানকার পরিবেশ গবেষক আলবার্তো সেটজারের কথায়, ‘শুষ্ক আবহাওয়া সবসময়েই আগুন ছড়াতে সাহায্য করে। সেটা প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আগুন লাগার পিছনে সবসময়েই মানুষের হাত আছে। সে দুর্ঘটনাবশতই হোক বা ইচ্ছাকৃত।’

সাও পাওলো শহরের অনেকটা জুড়ে রয়েছে আমাজন জঙ্গল। পরিবেশবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, জঙ্গলের জমি বেআইনিভাবে সাফ করে চাষযোগ্য করে তুলছেন অনেকে। যাতে ব্রাজিল সরকারও কোনও আপত্তি করছে না। এর জেরেই ভূমিক্ষয়ের আশঙ্কা বাড়ছে, আলগা হচ্ছে বড় গাছের শিকড়। যা খুব দ্রুতই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বড় কারণ হয়ে উঠবে। যদিও পরিবেশবিদদের এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো। যিনি আবার জঙ্গল কেটে কৃষিকাজের পক্ষে বলেই দেশবাসীর কাছে পরিচিত। আর এই সুযোগেই সাধারণ মানুষ আমাজনের বিপদ বাড়াচ্ছেন বলে মত পরিবেশবিজ্ঞানীদের।

এমনিতেই বিশ্ব উষ্ণায়নের অভিশাপে ভুগছে গোটা পৃথিবী। পৃথিবীর এতটা অংশজুড়ে গড়ে ওঠা আমাজনের বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল এতদিন তার কোপে ততটা না পড়লেও, এই দাবানল আর ঠেকাতে পারল না। এরপর আমাজনের প্রকৃতিও নষ্ট হতে থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকে। এতদিন যে বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহ করত গোটা পৃথিবীকে, তা এখন কার্যত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের খনিতে পরিণত হয়েছে। এনিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই। প্রেসিডেন্টের এই অরণ্যনীতির জন্য ইতিমধ্যেই বহু সমালোচিত তিনি।
রহস্যে ঘেরা আমাজন অরণ্যের কথা শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রকৃতিপ্রেমী থেকে শুরু করে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে প্রবল আগ্রহের জায়গা এই আমাজন। পৃথিবীতে মানুষের বেঁচে থাকার যে অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে, তার ২০ শতাংশ যোগান দেয় এই বন। যে কারণে এই আমাজন বনকে বলা হয় ‘পৃথিবীর ফুসফুস’। সেই অরণ্য এখন নিঃশেষ হচ্ছে দাবানলে।

ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্স (ইএনপিই) বলছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত আমাজনের ব্রাজিল অংশে ৭২ হাজার ৮৪৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের তুলনায় যা ৮০ শতাংশ বেশি এবং ২০১৩ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।

সংস্থাটির হিসাব মতে, দাবানলে প্রতি মিনিটে আমাজনের প্রায় ১০ হাজার বর্গমিটার এলাকা পুড়ে যাচ্ছে। এভাবে পুড়তে থাকলে জলবায়ু পরিবর্তনবিরোধী আন্দোলনে বিশাল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা।

এদিকে, আমাজন বনাঞ্চলে চলতি বছরের রেকর্ড সংখ্যক অগ্নিকাণ্ডকে ‘আন্তর্জাতিক সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমান্যুয়েল ম্যাখোঁ।

৭০ লাখ বর্গ কিলোমিটার অববাহিকা পরিবেষ্টিত এই জঙ্গলের প্রায় ৫৫ লাখ বর্গ কিলোমিটার এলাকাটি মূলত আর্দ্র জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত। ৯টি দেশজুড়ে এই অরণ্য বিস্তৃত। আমাজন জঙ্গলের ৬০ ভাগ ব্রাজিলে, ১৩ ভাগ পেরুতে এবং বাকি অংশ রয়েছে কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, গায়ানা, সুরিনাম এবং ফরাসি গায়ানায়। এই গহীন অরণ্যে ৪৫ লাখ প্রজাতির পোকামাকড় আছে। এছাড়া ৪২৮ প্রজাতির উভচর, ৩৭৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৪২৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে। এছাড়া আমাজন নদীতে ৩ হাজার প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী আছে। এই বন প্রতিবছর ২০০ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে।

বিজনেস বাংলাদেশ-/এমএ