গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ইনজামুল হককে (১৪) অপহরণের পর হত্যা করা হয়। ২০০৭ সালের ১৭ অক্টোবর এ হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পর ২০১৪ সালে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
এ মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত (ডেথ রেফারেন্স) করতে রায়ের সব নথিপত্র একই বছর হাইকোর্টে আসে।
পাশাপাশি আসামিরা আপিল করেন। কিন্তু পাঁচ বছরেও এ ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি হয়নি। ঘটনার পর থেকে কারাগারের কনডেম সেলে আছেন আসামিরা।
শুধু ইনজামুল নয়, এমন বহু চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হাইকোর্টে বছরের পর বছর পড়ে আছে। এ ধরনের মামলার সংখ্যা বাড়তে থাকলেও সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে নতুন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
সুপ্রিমকোর্টের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন মামলার জট লেগেছে। বর্তমানে ৭৩৭টি ডেথ রেফারেন্স মামলা হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন, যা ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এসব ডেথ রেফারেন্সের বিপরীতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়মিত জেল আপিলও রয়েছে। অন্যদিকে আপিল বিভাগে ৩২টি মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন সংক্রান্ত মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
জানা গেছে, প্রতিবছর যত সংখ্যক ডেথ রেফারেন্স মামলা হাইকোর্টে আসে, তার অর্ধেকও নিষ্পত্তি হয় না। ফলে দিন দিন মামলার সংখ্যা বাড়ছে। এদিকে এসব মামলায় সারা দেশে কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন ১৭১৫ জন কয়েদি।
আইনজ্ঞরা বলছেন, এত বিপুল সংখ্যক ডেথ রেফারেন্স মামলা আটকে থাকাটা উদ্বেগজনক। বিচারক ও বেঞ্চ বাড়িয়ে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ডেথ রেফারেন্স মামলাজট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। এসব মামলা নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত পেপারবুক তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বর্তমানে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে চাঞ্চল্যকর বেশকিছু মামলা শুনানির অপেক্ষায় আছে।
এসব মামলা শুনানি হওয়া জরুরি। তিনি বলেন, ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তি করতে হলে কোনো রকম মুলতবি না দিয়ে শুনানি অব্যাহত রাখতে হবে। বেঞ্চ বাড়ানোর পাশাপাশি বিচারক নিয়োগেরও প্রয়োজন রয়েছে।
বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেটিকে কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) লাগে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিয়ত ডেথ রেফারেন্স মামলা আসছে হাইকোর্টে।
দুই বছরে কয়েকটি চাঞ্চল্যকর মামলার ডেথ রেফারেন্সের নিষ্পত্তি হলেও সাধারণ মামলার ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তির হার ছিল খুব কম।
সূত্র বলছে, তিন বছর ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা ছিল খুবই কম। এর আগের তিন বছরে নিষ্পত্তির হার ছিল দ্বিগুণেরও বেশি।
সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে হাইকোর্টের তিনটি বেঞ্চে ২০১৪ সালে আসা ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি চলছে। এসব বেঞ্চে মাসে গড়ে নিষ্পত্তি হচ্ছে চার থেকে পাঁচটি মামলা।
আদালতে বার্ষিক ছুটি এবং বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ ভাঙার কারণে এসব ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি করা হচ্ছে না। দিন দিন এরকম মামলার সংখ্যা বাড়ছে।
বর্তমানে হাইকোর্টে রমনা-বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মামলা, আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনে গুলি ও বোমা হামলা এবং শিশু জিহাদের মৃত্যুসহ বেশকিছু আলোচিত মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় আছে।
এছাড়া আপিল বিভাগে চাঞ্চল্যকর নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রিভিউ আবেদন, পুলিশ কর্মকর্তা হত্যায় মেয়ে ঐশীর (মৃত্যুদণ্ড), রাজন ও রাকিব হত্যা, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল, যুদ্ধাপরাধীদের সাজা, মিশুক-মুনীর হত্যা, বিশ্বজিৎ হত্যা ও আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার আপিলসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক মামলা সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
আর আলোচিত পিলখানা হত্যা মামলা হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় ঘোষণার পর এখন পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা চলছে।
চাঞ্চল্যকর পিলখানা হত্যা ও নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সারোয়ার কাজল। তিনি বলেন, এ দুটি মামলার হাইকোর্টে শুনানি শেষে রায় ঘোষণা হয়েছে।
পিলখানা হত্যা মামলার হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনও প্রকাশিত হয়নি। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার হাইকোর্টের রায় প্রকাশিত হলে আসামিরা আপিলে যায়। বর্তমানে আপিল বিভাগে সেটি শুনানির অপেক্ষায় আছে।
মামলার পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১০ সালে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স মামলা ছিল ৫৮৫টি, এর মধ্যে মাত্র ৪৩টি নিষ্পত্তি হয়। ২০১১ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৯টি, ৭৪টি নিষ্পত্তি হয়।
২০১২ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে ৫৯৫টি হয়। ১৪৫টি নিষ্পত্তি হয়। ২০১৩ সালে ছিল ৫১৩টি, ১১১টি নিষ্পত্তি হয়। ২০১৪ সালে ছিল ৪৯৮টি, ১৩৫টি নিষ্পত্তি হয়। ২০১৫ সালে ছিল ৪৭৭টি, মাত্র ৫৮টি নিষ্পত্তি হয়। ২০১৬ সালে ছিল ৫৮০টি, মাত্র ৪৫টি নিষ্পত্তি হয়। ২০১৭ সালে ছিল ৭০৬টি, মাত্র ৬৬টি নিষ্পত্তি হয়।
গত বছর ২০১৮ সালে মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১১টিতে, মাত্র ৮৩টি নিষ্পত্তি হয়। চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৩৭টিতে। সাত মাসে ৮৫টি দায়ের করা হয়েছে। আর ৫৯টি নিষ্পত্তি হয়েছে।
ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, রমনা বটমূলে বোমা হামলা ঘটনার ডেথ রেফারেন্স মামলাটি শুনানির জন্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া দশ ট্রাক অস্ত্র মামলাটির মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন এবং শিশু জিহাদের মৃত্যুর মামলায় আসামিদের করা আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে।
অবকাশকালীন ছুটির পর হয়তো শুনানি শুরু হতে পারে।
তিনি বলেন, হাইকোর্টে বর্তমানে তিনটি বেঞ্চে ২০১৪ সালে আসা ডেথ রেফারেন্স মামলাগুলোর শুনানি চললেও প্রধান বিচারপতি ইচ্ছে করলে যে কোনো সময়ে ডেথ রেফারেন্স শুনানির অনুমতি দিতে পারেন।
জানতে চাইলে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ডেথ রেফারেন্স মামলাজটের অন্যতম কারণ হল বিচারিক আদালতে ঢালাওভাবে ফাঁসির আদেশ। হাইকোর্টে ফৌজদারি বিশেষজ্ঞ বিচারকের সংকট রয়েছে। অনেক বিচারক আছেন ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনতে চান না।
তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় অনেক নির্দোষ ব্যক্তিকে বছরের পর বছর কনডেম সেলে থাকতে হচ্ছে। অনেক সময় নির্দোষ ব্যক্তির বিচারিক আদালতে সাজা হয়। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে।
বিজনেস বাংলাদেশ/এম মিজান


























