দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার দিনটি স্মরণ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের হেফাজতে হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনা ‘জেল হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর ৩ নভেম্বর তার ঘনিষ্ঠ চার সহকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে কারাগারে হত্যা করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার সকাল ৭টায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
তিনি প্রথমে সরকারপ্রধান হিসেবে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে ফুল দেন। এ সময় তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হিসেবে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
পরে চৌদ্দ দলীয় জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে জোটের নেতারা জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান। এরপর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, সবচেয়ে কলঙ্কজনক রক্তাক্ত দুটি ঘটনা, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর। ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর একই সূত্রে গাথা, একই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতা।
তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করে দেয়ার জন্য কারা অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সারির চার জন সংগঠককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
কাদের বলেন, খুনিদের অনেকেরই দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। যাদের দণ্ড কার্যকর হয়নি; যারা বিদেশে পলাতক তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য জোর প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।
৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের ‘সুবিধাভোগীদের’ বিষয়ে কমিশন গঠনের অগ্রগতি জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, সেটি এখনো সরকারের আলাপ আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে, কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, শহীদদের স্বপ্ন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, জাতীয় চার নেতার স্বপ্ন ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণ। আজকে আমাদের অঙ্গীকার হলো- তাদের সেই স্বপ্ন প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পূরণ করা।
দিনের কর্মসূচির শুরুতে সকাল ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হয়। উত্তোলন করা হয় কালো পতাকা।
সকাল ৮টায় বনানী কবরস্থানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও এম মনসুর আলী এবং একই সময়ে রাজশাহীতে কামরুজ্জামানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন আওয়ামী লীগে নেতারা।
বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে এম মনসুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা হাজার বছরেও কাটিয়ে ওঠার মতো নয়। এ রাজনৈতিক শূন্যতা অপূরণীয় ক্ষতি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে, জাতীয় চার নেতা হত্যারও বিচার হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশবিরোধী শক্তি এখনো রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই এসব চক্রান্ত মোকাবিলা করে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তার ঘনিষ্ঠ চার নেতাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তী অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্যু-পাল্টা ক্যু’র ধূম্রজালের মধ্যে ৩ নভেম্বর সংঘটিত হয় জেল হত্যাকাণ্ড।
জেলহত্যার পর ২১ বছর এ হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জেলহত্যা মামলা পুনরুজ্জীবিত করে।
১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর এ মামলায় আসামি সৈয়দ ফারুক রহমানসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। তারপর বিচারিক আদালতে রায় হয়।
তবে শুধু সেনাসদস্য মোসলেউদ্দিনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট হাইকোর্ট আপিলের রায় দেয়। ওই রায়ে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য দুই আসামি মারফত আলী এবং আবুল হোসেন মৃধাকে খালাস দেয়া হয়।
নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহাম্মদকেও খালাস দেয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের ২৯ বছর পর এর বিচারের রায় হলেও জাতীয় চার নেতার পরিবারের সদস্যরা এ রায়কে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রহসনের রায়’ আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের অভিযোগ, জেলহত্যার ষড়যন্ত্রের দায়ে কাউকে শাস্তি দেয়া হয়নি।
আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের আবেদন করা হয়।
২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল আবেদন মঞ্জুর করেন।
কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে বাদ পড়লেও ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল আপিল বিভাগ দফাদার মারফত আলী শাহ ও এল ডি দফাদার আবুল হাসেম মৃধার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন।
কাকতালীয়ভাবে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসে এ চার নেতা হত্যা মামলার চূড়ান্ত আইনি লড়াইয়ের শুনানি শেষ হয়। ১৯৭১ সালের ওই দিনে এ চার নেতার নেতৃত্বে কুষ্টিয়ার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে শপথ নিয়েছিল স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকার।
বিজনেস বাংলাদেশ/এম মিজান

























