১২:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৬

নেপথ্যের দুই নায়ক রুহুল ও কাউন্সিলর মাকসুদ

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলা মাদরাসাছাত্রী নুসরাতকে হত্যার নির্দেশদাতা হলেও ওই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অন্যতম নায়ক, পরিকল্পনাকারী ও অর্থ লগ্নীকারী ছিলেন পৌর আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলর মাকসুদ আলম।

এছাড়া হত্যার পূর্ব পরিকল্পনার বিষয়টি আরেক আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন জানলেও ওই ঘৃণ্য কাজ করা থেকে আসামিদের নিবৃত্ত না করে তাদের রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। আসামি রুহুলের এই নেতিবাচক ভূমিকা নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় সরাসরি অংশগ্রহণের শামিল মর্মে রায় দিয়েছে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।

রায়ে বলা হয়, এটা নিশ্চিত যে সোনাগাজী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন ভিকটিম নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া হবে এবং কারা দেবে সেটা ঘটনা সংঘটনের আগ থেকেই তিনি অবহিত ছিলেন।

কিন্তু অবহিত থাকার পরেও অগ্নিসংযোগ প্রতিহত না করে অগ্নিসংযোগকারীদের গা ঢাকা দিতে পরামর্শ দেন। এই আসামি ইচ্ছা করলে অবশ্যই অপরাপর আসামিদের নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানো হতে নিবৃত্ত করতে পারতেন।

কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং তার সহযোগিতায় পরিচালিত সিরাজুদ্দৌলা মুক্তি আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে যারা আগুন সন্ত্রাসে জড়িত ছিলেন তাদেরকে তিনি বদনামীর হাত থেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন। এছাড়া অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলা তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন যে মাকসুদ কাউন্সিলরকে অবহিত করেই তিনি শাহাদাত হোসেন শামীম ও নূরুদ্দিনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নুসরাতকে হত্যা করতে।

তারা আমার এই কথার সঙ্গে একমত প্রকাশ করে। এছাড়া মাকসুদ কাউন্সিলরের পরামর্শ মোতাবেক গত ৪ এপ্রিল গভীর রাতে হত্যা পরিকল্পনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়-যা আসামি নূরুদ্দিনের জবানবন্দিতে উঠে আসে। দোষ স্বীকারের জবানবন্দিতে সে বলে, শামীম ও আমি মাকসুদ কাউন্সিলরের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি হত্যার পরিকল্পনায় সায় দেন। শামীমকে দশ হাজার টাকাও দেন কাউন্সিলর।

গত ২৪ অক্টোবর চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় সিরাজ, রুহুল, মাকসুদ, শামীম, নূরুদ্দিনসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। ২১১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ ওই রায়ে আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে, আসামি সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি ও কাউন্সিলর মাকসুদের নির্দেশনা মোতাবেক গত ৪ এপ্রিল মাদরাসার পশ্চিম হোস্টেলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিরাজুদ্দৌলাহর মুক্তি পরিষদ গঠিত ও হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।

ওই মুক্তি আন্দোলনে জড়িত ছিলেন সিরাজুদ্দৗলার একান্ত আস্থাভাজন, মাদ্রাসার ছাত্র, শিক্ষক ও মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও আসামিদের জবানবন্দি পর্যালোচনায় এটা পরিস্ফুটিত যে, সিরাজুদ্দৌলা মুক্তি আন্দোলনের সংগঠক ও প্রধান শক্তি ছিলেন রুহুল আমিন।

যিনি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি। এর আগে রুহুল আমিন ও মাকসুদ আলমের পৃষ্ঠপোষকতায় অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তির দাবিতে জোরপূর্বক মাদরাসার শিক্ষার্থীদের গত ২৮ ও ৩০ মার্চ মানববন্ধনে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হয়। প্রশাসন ও পুলিশ তখন নীরব ছিলো। ওই দুইজনের সদিচ্ছা ও শক্তি প্রদর্শন ব্যতীত মানববন্ধন কর্মসূচী অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নয়।

এ প্রসঙ্গে রায়ে বিচারক বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নূরুদ্দিন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, শাহাদাত হোসেন শামীম, আমাকে (নূরুদ্দিন) এবং আব্দুল কাদের তারা (মাকসুদ কাউন্সিলর ও রুহুল আমিন) জানায় যে, মানববন্ধনে যদি কেউ ঝামেলা করে বা বাধা দেয় তাদেরকে যেন মারধর করি।

কাজেই এটা দৃশ্যমান যে, সিরাজুদ্দৌলাকে মুক্ত করতে আসামি রুহুল আমিন যে কোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত ছিলেন। এছাড়া এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী নাসরিন সুলতানা ফুর্তি অধ্যক্ষ সিরাজ কর্তৃক যৌন হয়রানির শিকার হলে তা ধামাচাপা দেন এই রুহুল আমিন।

‘স্বার্থে বাধা দেওয়ায় হত্যার সিদ্ধান্ত’

রায়ে বিচারক বলেন, সিরাজুদ্দৌলা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, নুসরাতকে হত্যা করতে আমি শাহাদাত হোসেন শামীম ও নুরুদ্দিনকে নির্দেশ দেই। বিশেষ কায়দায় প্রয়োজনে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে তা যেন আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয় সেটাও তাদেরকে বলি। এ বিষয়ে রুহুল আমিন ও মাকসুদ কাউন্সিলর তাদেরকে যে কোনো সহযোগিতা করবে এটাও বলি।

টাকা পয়সার প্রয়োজন হলে তাদের মাধ্যমে পাওয়া যাবে। এছাড়া থানা ও প্রশাসন তারা ম্যানেজ করবে। নুসরাত আমাদের সম্মিলিত স্বার্থের সামনে এসে যাওয়ায় হত্যার বিষয়ে তাদের জানাই এবং তারা এতে রাজি হয়।

রায়ে বলা হয়, সিরাজুদ্দৌলার স্বীকারোক্তিমূলক এই জবানবন্দি হতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, সিরাজুদ্দৌলা রুহুল আমিন ও মাকসুদ কাউন্সিলরের সঙ্গে আলোচনা করেই শামীম ও নূরুদ্দিনকে নির্দেশ দেন নুসরাতকে হত্যা করতে। কারণ নুসরাত আসামি সিরাজ, রুহুল, মাকসুদসহ অপরাপর আসামিদের স্বার্থে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় তাকে সম্মিলিতভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিজনেস বাংলাদেশ/এম মিজান

 

 

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

সন্ধ্যায় পডকাস্টে আগামীর বাংলাদেশের রোডম্যাপ শোনাবেন তারেক রহমান

নেপথ্যের দুই নায়ক রুহুল ও কাউন্সিলর মাকসুদ

প্রকাশিত : ০১:০৫:৫১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলা মাদরাসাছাত্রী নুসরাতকে হত্যার নির্দেশদাতা হলেও ওই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অন্যতম নায়ক, পরিকল্পনাকারী ও অর্থ লগ্নীকারী ছিলেন পৌর আওয়ামী লীগ নেতা ও কাউন্সিলর মাকসুদ আলম।

এছাড়া হত্যার পূর্ব পরিকল্পনার বিষয়টি আরেক আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন জানলেও ওই ঘৃণ্য কাজ করা থেকে আসামিদের নিবৃত্ত না করে তাদের রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। আসামি রুহুলের এই নেতিবাচক ভূমিকা নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় সরাসরি অংশগ্রহণের শামিল মর্মে রায় দিয়েছে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল।

রায়ে বলা হয়, এটা নিশ্চিত যে সোনাগাজী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন ভিকটিম নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়া হবে এবং কারা দেবে সেটা ঘটনা সংঘটনের আগ থেকেই তিনি অবহিত ছিলেন।

কিন্তু অবহিত থাকার পরেও অগ্নিসংযোগ প্রতিহত না করে অগ্নিসংযোগকারীদের গা ঢাকা দিতে পরামর্শ দেন। এই আসামি ইচ্ছা করলে অবশ্যই অপরাপর আসামিদের নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানো হতে নিবৃত্ত করতে পারতেন।

কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং তার সহযোগিতায় পরিচালিত সিরাজুদ্দৌলা মুক্তি আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে যারা আগুন সন্ত্রাসে জড়িত ছিলেন তাদেরকে তিনি বদনামীর হাত থেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন। এছাড়া অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলা তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন যে মাকসুদ কাউন্সিলরকে অবহিত করেই তিনি শাহাদাত হোসেন শামীম ও নূরুদ্দিনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নুসরাতকে হত্যা করতে।

তারা আমার এই কথার সঙ্গে একমত প্রকাশ করে। এছাড়া মাকসুদ কাউন্সিলরের পরামর্শ মোতাবেক গত ৪ এপ্রিল গভীর রাতে হত্যা পরিকল্পনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়-যা আসামি নূরুদ্দিনের জবানবন্দিতে উঠে আসে। দোষ স্বীকারের জবানবন্দিতে সে বলে, শামীম ও আমি মাকসুদ কাউন্সিলরের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি হত্যার পরিকল্পনায় সায় দেন। শামীমকে দশ হাজার টাকাও দেন কাউন্সিলর।

গত ২৪ অক্টোবর চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় সিরাজ, রুহুল, মাকসুদ, শামীম, নূরুদ্দিনসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। ২১১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ ওই রায়ে আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনা করে বলা হয়েছে, আসামি সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি ও কাউন্সিলর মাকসুদের নির্দেশনা মোতাবেক গত ৪ এপ্রিল মাদরাসার পশ্চিম হোস্টেলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিরাজুদ্দৌলাহর মুক্তি পরিষদ গঠিত ও হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।

ওই মুক্তি আন্দোলনে জড়িত ছিলেন সিরাজুদ্দৗলার একান্ত আস্থাভাজন, মাদ্রাসার ছাত্র, শিক্ষক ও মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও আসামিদের জবানবন্দি পর্যালোচনায় এটা পরিস্ফুটিত যে, সিরাজুদ্দৌলা মুক্তি আন্দোলনের সংগঠক ও প্রধান শক্তি ছিলেন রুহুল আমিন।

যিনি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি। এর আগে রুহুল আমিন ও মাকসুদ আলমের পৃষ্ঠপোষকতায় অধ্যক্ষ সিরাজের মুক্তির দাবিতে জোরপূর্বক মাদরাসার শিক্ষার্থীদের গত ২৮ ও ৩০ মার্চ মানববন্ধনে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হয়। প্রশাসন ও পুলিশ তখন নীরব ছিলো। ওই দুইজনের সদিচ্ছা ও শক্তি প্রদর্শন ব্যতীত মানববন্ধন কর্মসূচী অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নয়।

এ প্রসঙ্গে রায়ে বিচারক বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নূরুদ্দিন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, শাহাদাত হোসেন শামীম, আমাকে (নূরুদ্দিন) এবং আব্দুল কাদের তারা (মাকসুদ কাউন্সিলর ও রুহুল আমিন) জানায় যে, মানববন্ধনে যদি কেউ ঝামেলা করে বা বাধা দেয় তাদেরকে যেন মারধর করি।

কাজেই এটা দৃশ্যমান যে, সিরাজুদ্দৌলাকে মুক্ত করতে আসামি রুহুল আমিন যে কোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত ছিলেন। এছাড়া এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী নাসরিন সুলতানা ফুর্তি অধ্যক্ষ সিরাজ কর্তৃক যৌন হয়রানির শিকার হলে তা ধামাচাপা দেন এই রুহুল আমিন।

‘স্বার্থে বাধা দেওয়ায় হত্যার সিদ্ধান্ত’

রায়ে বিচারক বলেন, সিরাজুদ্দৌলা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন, নুসরাতকে হত্যা করতে আমি শাহাদাত হোসেন শামীম ও নুরুদ্দিনকে নির্দেশ দেই। বিশেষ কায়দায় প্রয়োজনে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে তা যেন আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয় সেটাও তাদেরকে বলি। এ বিষয়ে রুহুল আমিন ও মাকসুদ কাউন্সিলর তাদেরকে যে কোনো সহযোগিতা করবে এটাও বলি।

টাকা পয়সার প্রয়োজন হলে তাদের মাধ্যমে পাওয়া যাবে। এছাড়া থানা ও প্রশাসন তারা ম্যানেজ করবে। নুসরাত আমাদের সম্মিলিত স্বার্থের সামনে এসে যাওয়ায় হত্যার বিষয়ে তাদের জানাই এবং তারা এতে রাজি হয়।

রায়ে বলা হয়, সিরাজুদ্দৌলার স্বীকারোক্তিমূলক এই জবানবন্দি হতে এটা প্রতীয়মান হয় যে, সিরাজুদ্দৌলা রুহুল আমিন ও মাকসুদ কাউন্সিলরের সঙ্গে আলোচনা করেই শামীম ও নূরুদ্দিনকে নির্দেশ দেন নুসরাতকে হত্যা করতে। কারণ নুসরাত আসামি সিরাজ, রুহুল, মাকসুদসহ অপরাপর আসামিদের স্বার্থে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় তাকে সম্মিলিতভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিজনেস বাংলাদেশ/এম মিজান