০৪:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দাবানলের বছর ২০১৯

ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভরা ছিলো ২০১৯ সালটি। তবে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তৈরি করেছে দাবানলের ঘটনগুলো। ব্রাজিলের আমাজন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলে পুড়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য, ঘটেছে প্রাণহানি। এ বছরের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে আমাদের এই আয়োজন।

এ বছর সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা ঘটেছে বিশ্বের বৃহত্তম রেইনফরেস্ট আমাজনে। গত আগস্ট থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর শিরোনাম হতে শুরু করেছিলো এই দাবানল। তখন এর নিয়ন্ত্রণে ব্রাজিল সরকারের গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা। এ নিয়ে ফ্রান্সের নেতা ইমানুয়েল ম্যাক্রোর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো। ফ্রান্স ও জার্মানি আমাজনের দাবানল মোকাবেলায় সহায়তার নাম করে লাতিন আমেরিকার দেশটির সার্বভৌমত্ব কিনে নিতে চায় বলেও অভিযোগ করেছিলেন তিনি।

পৃথিবীর ফসফুস নামে পরিচিত আমাজন জঙ্গলটি। কেননা পৃথিবীর গ্রহের ২০ শতাংশ অক্সিজেন একাই উৎপাদন করে এ বন। ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, চলতি বছর ব্রাজিল জুড়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার বেশিরভাগই ঘটেছে আমাজন অঞ্চলে। ব্রাজিলে এ বছর শুধু আমাজনেই আগুন লাগেনি। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কেরাডো তৃণভূমিতে আগুন লাগার ঘটনা আরো বেশি। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ অঞ্চলটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকাতেও রয়েছে। আগুনে তৃণভূমির অর্ধেকের বেশি সবুজ এলাকা এরই মধ্যে ধ্বংস হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা ও বোর্নিওতে ৪০ হাজার হেক্টরেরও বেশি এলাকাজুড়ে মাসখানেক ধরে আগুন জ্বলেছে। এসব দাবানলে প্রাণ হারিয়েছে অস্ত্বিত্বের সঙ্কটে থাকা অনেক ওরাংওটাং। যারা প্রাণে বেঁচেছে, তারাও হারিয়েছে পর্যাপ্ত বাসস্থান। এসব এলাকায় মাটির নিচে গাছের শক্ত শেকড় থাকায় আগুন নেভানোও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষকরা বলছেন, এই আগুনে ৭০ কোটি টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড মুক্ত হয়েছে পরিবেশে। বিশ্বের বৃহত্তম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলাভূমি, প্যান্টানালও এ বছর দাবানলের শিকার হয়েছে। প্যান্টানাল জলাভূমির বেশিরভাগ অংশই ব্রাজিলে অবস্থিত। তবে এর কিছু অংশ রয়েছে বলিভিয়া এবং প্যারাগুয়েতেও। এই বছরের আগুনের ঘটনার সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে।

আট হাজার দাবানলের খবর মিলেছে এই এলাকায়। বলিভিয়াতেই ধ্বংস হয়েছে প্রায় ১২ লাখ হেক্টর বন। এ ঘটনাকে দেশটির ইতিহাসের বৃহত্তম জীববিপর্যয় বলে অভিহিত করেন বিজ্ঞানীরা? এ বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য জুড়ে ফের ছড়িয়ে পড়ে দাবানল। প্রচণ্ড গরমে শুষ্ক আবহাওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আগুন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়, ধ্বংস হয় ঘরবাড়ি। আগুনে মারা যান তিনজন। এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন কয়েক হাজার মানুষ। বরফে আচ্ছাদিত অ্যান্টার্কটিকা সার্কেলেও এ বছর আগুন লেগেছে।

সাইবেরিয়াতে তিন মাস ধরে শত শত দাবানলে ৪০ লাখ হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে? আগুন নিয়ন্ত্রণে রাশিয়াকে সেনা মোতায়েন পর্যন্ত করতে হয়? আলাস্কাতে ৪০০-রও বেশি আগুনের ঘটনা ঘটেছে? দাবানল ছড়িয়েছে ক্যানাডা এবং গ্রিনল্যান্ডেও? অস্ট্রেলিয়ায় এ বছর নজিরবিহীন বুশফায়ারের ঘটনা ঘটে। খরা, শুকনো তাপমাত্রা এবং শুকনো বাতাসে ১০ লাখ হেক্টরের বেশি আলাকা জুড়ে আগুন জ্বলতে থাকে। এতে চারজন মানুষের পাশাপাশি প্রাণহানি ঘটে অন্তত এক হাজার কোয়ালার। কোয়ালাকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা একটি প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

এ বছর দাবানলের ঘটনায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রাণীগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

বিজনেস বাংলাদেশ/শ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

দাবানলের বছর ২০১৯

প্রকাশিত : ১০:০৪:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯

ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভরা ছিলো ২০১৯ সালটি। তবে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তৈরি করেছে দাবানলের ঘটনগুলো। ব্রাজিলের আমাজন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলে পুড়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য, ঘটেছে প্রাণহানি। এ বছরের উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে আমাদের এই আয়োজন।

এ বছর সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা ঘটেছে বিশ্বের বৃহত্তম রেইনফরেস্ট আমাজনে। গত আগস্ট থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর শিরোনাম হতে শুরু করেছিলো এই দাবানল। তখন এর নিয়ন্ত্রণে ব্রাজিল সরকারের গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা। এ নিয়ে ফ্রান্সের নেতা ইমানুয়েল ম্যাক্রোর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো। ফ্রান্স ও জার্মানি আমাজনের দাবানল মোকাবেলায় সহায়তার নাম করে লাতিন আমেরিকার দেশটির সার্বভৌমত্ব কিনে নিতে চায় বলেও অভিযোগ করেছিলেন তিনি।

পৃথিবীর ফসফুস নামে পরিচিত আমাজন জঙ্গলটি। কেননা পৃথিবীর গ্রহের ২০ শতাংশ অক্সিজেন একাই উৎপাদন করে এ বন। ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে জানায়, চলতি বছর ব্রাজিল জুড়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার বেশিরভাগই ঘটেছে আমাজন অঞ্চলে। ব্রাজিলে এ বছর শুধু আমাজনেই আগুন লাগেনি। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কেরাডো তৃণভূমিতে আগুন লাগার ঘটনা আরো বেশি। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ অঞ্চলটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকাতেও রয়েছে। আগুনে তৃণভূমির অর্ধেকের বেশি সবুজ এলাকা এরই মধ্যে ধ্বংস হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা ও বোর্নিওতে ৪০ হাজার হেক্টরেরও বেশি এলাকাজুড়ে মাসখানেক ধরে আগুন জ্বলেছে। এসব দাবানলে প্রাণ হারিয়েছে অস্ত্বিত্বের সঙ্কটে থাকা অনেক ওরাংওটাং। যারা প্রাণে বেঁচেছে, তারাও হারিয়েছে পর্যাপ্ত বাসস্থান। এসব এলাকায় মাটির নিচে গাছের শক্ত শেকড় থাকায় আগুন নেভানোও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষকরা বলছেন, এই আগুনে ৭০ কোটি টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড মুক্ত হয়েছে পরিবেশে। বিশ্বের বৃহত্তম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলাভূমি, প্যান্টানালও এ বছর দাবানলের শিকার হয়েছে। প্যান্টানাল জলাভূমির বেশিরভাগ অংশই ব্রাজিলে অবস্থিত। তবে এর কিছু অংশ রয়েছে বলিভিয়া এবং প্যারাগুয়েতেও। এই বছরের আগুনের ঘটনার সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে।

আট হাজার দাবানলের খবর মিলেছে এই এলাকায়। বলিভিয়াতেই ধ্বংস হয়েছে প্রায় ১২ লাখ হেক্টর বন। এ ঘটনাকে দেশটির ইতিহাসের বৃহত্তম জীববিপর্যয় বলে অভিহিত করেন বিজ্ঞানীরা? এ বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য জুড়ে ফের ছড়িয়ে পড়ে দাবানল। প্রচণ্ড গরমে শুষ্ক আবহাওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আগুন। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়, ধ্বংস হয় ঘরবাড়ি। আগুনে মারা যান তিনজন। এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন কয়েক হাজার মানুষ। বরফে আচ্ছাদিত অ্যান্টার্কটিকা সার্কেলেও এ বছর আগুন লেগেছে।

সাইবেরিয়াতে তিন মাস ধরে শত শত দাবানলে ৪০ লাখ হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে? আগুন নিয়ন্ত্রণে রাশিয়াকে সেনা মোতায়েন পর্যন্ত করতে হয়? আলাস্কাতে ৪০০-রও বেশি আগুনের ঘটনা ঘটেছে? দাবানল ছড়িয়েছে ক্যানাডা এবং গ্রিনল্যান্ডেও? অস্ট্রেলিয়ায় এ বছর নজিরবিহীন বুশফায়ারের ঘটনা ঘটে। খরা, শুকনো তাপমাত্রা এবং শুকনো বাতাসে ১০ লাখ হেক্টরের বেশি আলাকা জুড়ে আগুন জ্বলতে থাকে। এতে চারজন মানুষের পাশাপাশি প্রাণহানি ঘটে অন্তত এক হাজার কোয়ালার। কোয়ালাকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা একটি প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

এ বছর দাবানলের ঘটনায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রাণীগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

বিজনেস বাংলাদেশ/শ