মুসলিমবিদ্বেষী নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদের মুখেই ২০২০ সালে দেশজুড়ে জনসংখ্যা তালিকা তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন তালিকা প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয় ভারতের মন্ত্রিসভা।
পরে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে অমিত শাহ জানান, নতুন বছরেই এ তালিকার কাজ সম্পন্ন করা হবে। এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে বিক্ষোভের মধ্যেই ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (এনপিআর) তৈরির ঘোষণা দিয়েছে ভারত সরকার। মঙ্গলবার দেওয়া ওই ঘোষণায় বলা হয়েছে, এনপিআর বা জনসংখ্যা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে নাগরিকদের মা ও বাবা উভয়ের জন্মস্থান ও জন্ম তারিখ জানাতে হবে। অবশ্য ২০১০ সালে সর্বশেষ এনপিআর তৈরির সময় নাগরিকদের ওই তথ্য দেওয়ার দরকার পড়েনি।
গত ১২ ডিসেম্বর নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ভারত। নতুন আইনে ১৯৮৭ সালের পরে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব পেতে হলে মা-বাবার অন্তত একজনকে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। ফলে এবার এনপিআরে মা-বাবার জন্মের স্থান ও তারিখ জানতে চাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। ২০১০ সালে এনপিআর করবার সময়ে ১৫ ধরণের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এবার ২১টি পয়েন্টের তথ্য নেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে সর্বশেষ বসবাসের স্থান, পাসপোর্ট নম্বর, আধার আইডি, ভোটার আইডি কার্ড নাম্বার, ড্রাইভিং লাইসেন্স নাম্বার ও মোবাইল ফোন নাম্বার। টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে এনপিআর-এ নতুন তথ্য চাওয়ার সমালোচনা করেছেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা সীতারাম ইয়েচুরি। তিনি বলেন, সরকার সাড়ে আট হাজার কোটি রুপি (১০ হাজার কোটি টাকা) বরাদ্দ করে এনপিআর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এতে নাগরিকদের বাবা-মায়ের জন্মস্থান ও তারিখ ঘোষণা এবং ২১টি পয়েন্টে তথ্য দিতে হবে। এর বেশিরভাগ তথ্যই ২০১০ সালে সর্বশেষ এনপিআর-এ নেওয়া হয়নি। সমালোচনার প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেন, এনপিআর-এ নেওয়া তথ্য এনআরসি-তে ব্যবহার করা হবে না। আর এনআরসি নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরে এখনও কোনও আলোচনা হয়নি। আমি পরিষ্কারভাবে বলছি, এনপিআর ও এনআরসি-র মধ্যে কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই। এনপিআর-এ জনগণের তালিকা তৈরির মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
আর এনআরসি-র মাধ্যমে জানতে চাওয়া হয়, তারা কিসের ভিত্তিতে দেশের নাগরিক। দুই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংযোগ নেই। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এবারের এনপিআর-এ নতুন নতুন বিষয় যোগ করা আসলে মুসলিমবিদ্বেষী নাগরিকত্ব আইনের মতোই একটি ফাঁদ; যা আদতে পরবর্তী নাগরিকপঞ্জিতে ব্যবহার করা হবে। মুসলিমবিদ্বেষী নাগরিকত্ব আইন পাসের পর এ নিয়ে বিতর্কের জেরে ইতোমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে এনপিআর-এর কাজ করা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেরালা রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও অনুরূপ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, রাজ্য সরকার জাতীয় জনসংখ্যা নিবন্ধীকরণ সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রাজ্য সরকারের ছাড়পত্র ছাড়া এ সংক্রান্ত কোনও কাজ চালানো যাবে না। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন বলেছেন, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের জেরে যেভাবে বিতর্ক ছড়িয়েছে তার প্রেক্ষিতেই রাজ্য সরকার জনসংখ্যা নিবন্ধীকরণ হালনাগাদের কাজে সহযোগিতা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালার মতো একই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাঞ্জাব। তবে মঙ্গলবারের বৈঠকে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এভাবে জনসংখ্যা নিবন্ধীকরণের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার এখতিয়ার রাজ্য সরকারগুলোর নেই।
এ তালিকা হালনাগাদ করা বাধ্যতামূলক।
























