রোহিঙ্গা মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আরেকটি নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়েছে জাতিসংঘে। প্রস্তাবে জরুরি ভিত্তিতে রোহিঙ্গাসহ সব ধরনের সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
শনিবার জাতিসংঘ স্থায়ী মিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শুক্রবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এ প্রস্তাব পাস করা হয়।
জাতিসংঘ ১৯৩ সদস্যের মধ্যে ১৩৪ ভোটে পাস হয় প্রস্তাবটি। প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট পড়ে ৯টি। এছাড়া ২৮ সদস্য ভোট প্রদানে বিরত থাকে।
২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গা সঙ্কট শুরুর পর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এ নিয়ে তিনটি প্রস্তাব পাস হলো জাতিসংঘে।
এর আগে মিয়ানমারে বর্বরতা বন্ধ এবং দেশ ত্যাগে বাধ্য হওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদে নিজ বসতভিটায় ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তার জন্যে যৌথভাবে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল ওআইসি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
রাখাইন, কাচিন ও শান রাজ্যে রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দেয়ার লড়াইয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে প্রস্তাবে।
সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব কোনো দেশ মেনে চলতে আইনগত বাধ্য না হলেও এতে বৈশ্বিক মতামতের প্রতিফলন ঘটে। গত ১৪ নভেম্বর জাতিসংঘের থার্ড কমিটিতে অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থনে এই প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছিল।
একই অধিবেশনে মিয়ানমার পরিস্থিতির বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়া পরিচালনা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে অর্থ মঞ্জুরির বিষয়ে সর্বসম্মত একটি সিদ্ধান্তও হয়েছে।
জাতিসংঘে এই প্রস্তাব পাসের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থনের বিষয়টি পুনরায় পরিস্ফুট হলো বলে কূটনীতিকরা মনে করছেন।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে বিচার চলছে তার মধ্যে জাতিসংঘে দেশটির বিরুদ্ধে নতুন প্রস্তাব পাস হওয়াকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতেও বিচার চলছে। এ বিষয়ে শুনানি শেষে এখন রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বাঙালি হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। যদিও কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা দেশটিতে বসবাস করছেন। ১৯৮২ সালে তাদের নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করেছে বৌদ্ধসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি। এরপর থেকে রোহিঙ্গারা মূলত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন।
জাতিসংঘে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত হাউ ডু সুয়ান বলেন, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অবাঞ্ছিত রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে বৈষম্যমূলকভাবে একটি পক্ষকে নিশানা করে মানবাধিকার নীতিমালা প্রয়োগের একটি উৎকৃষ্ট উদহারণ এই প্রস্তাব।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে সেনাবাহিনীর অভিযানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে থাকে রোহিঙ্গারা। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দেয়। ফলে সে সময় থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
ওই বছরের আগস্টে রাখাইনের বেশ কয়েকটি পুলিশ ও সেনা চেকপোস্টে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলোতে ব্যাপক অভিযান চালায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। অভিযানের নামে নির্বিচারে গুলি করে রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ এবং রোহিঙ্গাদের বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এই অভিযানকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা অনেক দেশ। তবে মিয়ানমার সেসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
বিজনেস বাংলাদেশ/এম মিজান
























