উত্তর বাড্ডার হাছেন উদ্দিন রোড। এই রোডের আধুনিক একটি বাড়ি ‘এ আর গার্ডেন’। সাততলা এ ভবনটিতে ২৮টি ফ্ল্যাট রয়েছে। ভাড়াটিয়াদের জন্য লিফট, জেনারেটর, নিরাপত্তাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে ভবনটিতে। করোনাকালে ভবনটির ৬টি ফ্ল্যাট খালি হলেও এখন পর্যন্ত একটিরও ভাড়া হয়নি। এ অবস্থায় ফ্ল্যাটগুলোর ভাড়া আগের থেকে তিন হাজার টাকা কমিয়ে দিয়েছে মালিক। তারপরও মিলছে না ভাড়াটিয়া।
বাড়িটির তত্ত্বাবধায়ক সেলিম মিয়া জানান, এই বাড়িতে এতগুলো ফ্ল্যাট কখনও খালি থাকেনি। এক ভাড়াটিয়া চলে যাওয়া মাত্রই আরেক ভাড়াটিয়া এসে উঠে পড়েছে। এবার করোনার কারণে অনেক ফ্ল্যাট খালি হয়েছে। দুই মাস ধরে ভাড়া হচ্ছে না। মালিক ফ্ল্যাট প্রতি তিন হাজার টাকা কমিয়ে দিয়েছেন। আগে ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া ছিল ২০ হাজার টাকা করে। এখন মালিক ১৭ হাজার টাকা করেছেন। কিন্তু তারপরও ভাড়া হচ্ছে না।
এরকম চিত্র ঢাকাজুড়েই দিন দিন প্রকট হচ্ছে। করোনার প্রভাবে অর্থনৈতিক মন্দায় শহর ছাড়ছে মানুষ। তল্পিতল্পা গুছিয়ে গ্রামের পথে ছুটছে তারা। ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের যোগান ঠিক না থাকায় এরই মধ্যে ঢাকা ছেড়েছে হাজার হাজার মানুষ। ফাঁকা হয়ে পড়ছে রাজধানী। খালি হচ্ছে শত শত বাসা। এ অবস্থায় বাসা ভাড়া কমিয়েও ভাড়াটিয়া পাচ্ছে না বাড়িওয়ালারা। ফ্লাট প্রতি পাঁচশ’ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া কমিয়েও মিলছে না ভাড়াটিয়া। তাই মাস শেষে হিসাব মিলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাড়ির মালিকদের।
সম্প্রতি রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে প্রতিটি বাড়িতেই ঝুলছে বাসা ভাড়ার বিজ্ঞপ্তি ‘টু লেট’। অনেক বাড়িতে তিন মাস ধরে ফ্ল্যাট খালি পড়ে আছে কিন্তু ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ির মালিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাসা খালি রাখার চেয়ে ভাড়া কম হলেও ভাড়াটিয়া দরকার। বাসা খালি পড়ে থাকলেও ভাড়া বাদে মেনটেইনেন্স খরচ তো মালিকদেরই মিটাতে হয়। এ কারণে বাসা খালি থাকার চেয়ে কিছুটা কম ভাড়ায় ভাড়াটিয়া থাকলে অন্তত সেই খরচটা তাদের দিতে হয় না। রাজধানী বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বাড়ির মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে মনে হচ্ছে, বাড়ি ভাড়া দিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে খাওয়ার দিন শেষ হয়ে আসছে। আজকাল বাড়িওয়ালারা বাড়িভাড়াকে ব্যবসা হিসাবে নিয়েছে। বাড়িভাড়া থেকে আয় করছেন, কিন্তু সরকারকে কোন প্রকার আয়কর দিচ্ছেন না। আয়কর দিতে হবে বলে ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়িভাড়া নেন না কিংবা বাড়িভাড়ার কোন রশিদ দেন না। পূর্বপুরুষেরা বাড়ি তৈরি করে দিয়ে গেছেন, কোন কাজ না করে এখন গায়ে তারা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ান, আড্ডায় বসে রাজা উজির মারেন আর মাস শেষে ভাড়া তুলে খান। ভাড়াটিয়াদের আয় বাড়ুক আর না বাড়ুক বছর বছর বাড়িভাড়া বাড়ান। কখনও কখনও এই ভাড়া বৃদ্ধি সীমা ছাড়িয়ে যায়। অনেক ভাড়াটিয়া কষ্ট হলেও মেনে নেন, আবার অনেকে আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি না হওয়ায় বাসা ছেড়ে দিয়ে কম ভাড়ার বাসায় উঠেন। এই দিন এখন শেষ হয়ে আসছে। প্রকৃতির একটি বিচার আছে। সেই বিচার করে যাচ্ছে করোনা ভাইরাস নামক মহামারী। এটা থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত বাড়িওয়ালাদের। গায়ে হাওয়া না লাগিয়ে কাজ করে খাওয়া উচিত।
শাহজাদপুর এলাকার বাড়ির মালিক সোহেল বলেন, ‘করোনার শুরু হওয়ার পর আমার বাড়ির এক ভাড়াটিয়া বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। এরপর থেকে আজও পর্যন্ত ওই ফ্ল্যাটে ভাড়াটিয়া তুলতে পারিনি। অনেকের কাছে দু-তিন মাসের ভাড়া বকেয়া পড়ে আছে। এর মধ্যে সামনে মাস থেকে আরেকটি ফ্ল্যাটও ছেড়ে দিয়েছে আরেক ভাড়াটিয়া। ভাড়া কমানো হবে জানিয়েও তাদের রাখা যায়নি। এভাবে বাসা খালি হলে আমরা তো চরম বিপাকে পড়ে যাব। কেননা খালি ফ্ল্যাটে গত মাসে বিদ্যুত বিল এসেছে ১ হাজার আটশ’ টাকা। এসব বিল তো এখন আমাদের পরিশোধ করতে হচ্ছে। এভাবে ফ্ল্যাট খালি থাকলে তো রাস্তায় নামতে হবে।’
ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নতুন দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন পারুল আক্তার। ডেভেলপার কোম্পানি গত মাসে ফ্ল্যাট দুটি হস্তান্তর করেছে। ফ্ল্যাট বুঝে পেলেও ভাড়াটিয়া তুলতে পারেননি তিনি। তার নির্ধারিত ভাড়ায় মিলছে না ভাড়াটিয়া। এ অবস্থায় চরম চিন্তায় পড়ে গেছেন তিনি। কেননা এই ফ্ল্যাট দুটির ভাড়া তুলে তার সঙ্গে কিছু যোগ করে ব্যাংক ঋণ শোধ করার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু দুই মাসেও কোন ভাড়াটিয়া না পাওয়ায় নতুন করে হিসাব কষতে হচ্ছে পারুল আক্তারকে।
পারুল আক্তারের মতো অনেকেই ঋণ করে বাড়ি তুলেছেন। ভাড়া দিয়ে ঋণ শোধ করে দিলেই বাড়িটি তার হয়ে যাবে। কিন্তু করোনার কারণে শহর ছাড়ছে মানুষ। খালি হয়ে পড়ছে শত শত বাসা। প্রতিদিন যে হারে মানুষ শহর ছাড়ছে। খুব তাড়াতাড়ি যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয় চরম বিপাকে পড়তে হবে এসব বাড়িওয়ালাদের। বিশেষ করে যাদের আয় শুধু বাসা ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল। প্রতি মাসের বিদ্যুত বিল, পানি বিল, গ্যাস বিলসহ ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করতে ধার দেনা করতে হবে তাদের। আর তাতে টিকে থাকাই দায় হবে অনেক বাড়িওয়ালার।
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর


























