০৮:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬

একজন মুনা ও প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ

হিমু, শুভ্র, বাকের ভাই, মুনা, মির্জা সাহেব, কুসুম- এমন অনেক চরিত্র বইয়ের পাতা, টেলিভিশনের পর্দা কিংবা সেলুলয়েড থেকে এসে বাংলাদেশের মানুষের আপনজন হয়ে উঠেছে। এদের মাঝেই নিজের অস্তিত্বের ছাপ রেখে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই ৬৩ বছর বয়সে চলে গেছেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে। নন্দিত এই কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতার গল্প, উপন্যাস, নাটক ও চলচ্চিত্রের অসংখ্য চরিত্র মানুষের মনে আঁচড় কেটেছে।

দশকের পর দশক সে চরিত্রগুলোর আবেদন স্থান হয়নি। হুমায়ূন আহমেদ গল্পের প্রাণ ছিল পাত্র-পাত্রীদের মিথস্ট্ক্রিয়া। তাদের ছোট ছোট সংলাপকে প্রাধান্য দিয়ে গল্প লিখতেন হুমায়ূন আহমেদ। অতি সাধারণ কথাকে অসাধারণভাবে প্রকাশের এক অন্যরকম মত নিয়ে জন্মেছিলেন এই লেখক।

তিনি দেখিয়েছিলেন যে, ইউরোপীয় আদলের বাইরে গিয়েও সফল এবং গুণগত মানসম্পন্ন উপন্যাস সৃষ্টি সম্ভব। অতিবাস্তব ঘটনাবলিকে অতি বিশ্বাসী করে উপস্থাপনের অতিরিক্ত রকমের এক মত ছিল তার। তার লেখনীর এই ধরনকে ম্যাজিকাল রিয়ালিজম বা জাদু বাস্তবতা ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়ে থাকে।

আর সে কারণে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্য অঙ্গনের এক কালজয়ী নক্ষত্রের নাম! এক কালজয়ী মানুষের নাম! যখন গল্প লিখেছেন মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, যখন তার কলম থেকে উপন্যাস ঝরেছে তখনও তিনি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। নাটক নির্মাণ করেছেন মানুষ সেখানেও ভালোবেসে রাস্তায় নেমে গেছে, চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন সেখানেও মানুষ ভালবেসে সিনেমা হল কানায় কানায় ভরিয়ে তুলেছে।

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক আগে। দিন তারিখ মনে নেই। বলছি কোথাও কেউ নেই নাটকের মুনা চরিত্রে অভিনয়ের কথা। মনে আছে, সেদিন বিটিভিতে একটা নাটকের শুটিং ছিল। শুটিংয়ের মধ্যেই একজন এসে জানিয়েছিলেন, আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য হুমায়ূন আহমেদ মেকআপ রুমে অপেক্ষা করছেন। মেকআপ রুমে ঢুকতেই তার প্রথম প্রশ্ন? আপনি কি ‘কোথাও কেউ নেই’ পড়েছেন? বইটি আমি পড়েছি বলতেই, তিনি জানতে চাইলেন আমি মুনা চরিত্রে অভিনয় করব কিনা। এও বলেছিলেন, আমি যদি এই চরিত্রে অভিনয় করি, তাহলেই তিনি প্রযোজক বরকত উল্লাহকে নাটকের চিত্রানাট্য দেবেন। আর আমি যদি মুনা চরিত্রে অভিনয় না করি, তাহলে প্রযোজককে ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বদলে একটা ভূতের গল্প লিখে দেবেন।

অবশ্য হুমায়ূন আহমেদকে শেষ পর্যন্ত ভূতের গল্প লিখে দিতে হয়নি। কারণ, আমি মুনা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। স্বীকার করতেই হবে, হুমায়ূন আহমেদের লেখা যে চরিত্রগুলোয় আমি অভিনয় করেছি, তার মধ্যে ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের মুনা চরিত্রটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অভিনয়ের জন্য মুনা অসাধারণ এক চরিত্র। মনে আছে, এ নাটকের ‘বাকের ভাই’ নিয়ে চারদিকে যখন তুমুল আলোচনা, তখন হুমায়ূন আহমেদের প্রশ্ন ছিল, ‘বাকেরকে নিয়ে এত হৈচৈ কেন? ট্র্যাজেডি তো মুনার।

আমি তো মুনা যখন একলা কাঁদে, আমিও তখন মুনার সঙ্গে কাঁদি!’ মুনা সত্যিকার অর্থেই মাল্টিডাইমেনশনাল একটি চরিত্র। অনেক শিল্পী এ ধরনের একটি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রতীক্ষায় থাকেন। আমি ভাগ্যবান, আমাকে মুনা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রতীক্ষায় থাকতে হয়নি।

হুমায়ূন আহমেদের ‘শঙ্খনীল কারাগার’ টিভিতে যখন নাটক হয়েছিল, তখন অভিনয় করেছি। এরপর যখন চলচ্চিত্র হলো, সেখানেও অভিনয় করেছি। সেই ছবির একটা গল্প আছে। মুস্তাফিজুর রহমান সাহেব আমাকে প্রথমে যে চিত্রনাট্য দিয়েছিলেন, ওটা পড়ে আমি বলেছিলাম করব না। তখন আমি ধানমন্ডিতে থাকি। এক সন্ধ্যায় দরজায় কড়া নাড়ছে কেউ। ফরীদি দরজা খুলে আমাকে বলল- ‘হুমায়ূন আহমেদ এসেছে তোমার সঙ্গে কথা বলতে।’

আমি গিয়ে বললাম, ‘জি হুমায়ূন ভাই বসেন’। বসেই বললেন, ‘আরে আমার গল্প নিয়ে ছবি হবে আর আপনি করবেন না, এটা হয় নাকি? কী হলে করবেন?’ আমি বললাম, ‘অরিজিনাল গল্পটা হলে করব। আর রুনু চরিত্রটাই করব। যেটা টিভিতে করেছিলাম।’ পরে তিনি আবার চিত্রনাট্য করেন। এরপর তৈরি হলো ‘শঙ্খনীল কারাগার’। এমনিতে আমি হুমায়ূন আহমেদের লেখা প্রচুর এক খণ্ডের নাটকে অভিনয় করেছি। ‘কুসুম’ সম্ভবত বিটিভির প্রথম খণ্ড নাটক, আতিকুল হক চৌধুরীর প্রোডাকশন।

শংকর সাঁওজালের প্রথম কাজ। ডলি জহুর, আমি, মেঘনা, আবুল হায়াত, শর্মিলী চাচি, নাতাশা- সবাই অভিনয় করেছিলেন। নাটকটি এখন ইউটিউবে পাওয়া যায়। ‘এসো নীপবনে’, ‘বিবাহ’, ‘একা একা’, ‘অচিন বৃক্ষ’- এগুলো সব হুমায়ূন আহমেদের ক্ল্যাসিক নাটক। ‘আজ রবিবার’, ‘অয়োময়’ নাটকগুলোও ভেরি ইন্টারেস্টিং, সবগুলোতেই কাজ করেছি।

তখনকার নাটকের কথা বলতে গেলেই মনে হয় যে, হুমায়ূন আহমেদের এত ভালো লেখায় কাজ করেছি, পরের দিকে আর করা হয়নি। শেষ নাটক ছিল ‘দুই ভুবন’ সিরিজের ‘তৃতীয় জন’। অতিপ্রাকৃত ঘটনা নিয়ে। আমি আর ফরীদি ছিলাম শুধু। আর প্রথমটি ছিল ‘এসো নীপবনে’। ফরীদি, তারিক আনাম খান আর আমি অভিনয় করেছিলাম।

তবে হুমায়ূন আহমেদের ডিরেকশনে আমার কখনোই কাজ করা হয়নি। আজ আমাদের মাঝে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে নেই। কিন্তু তার কথা, তার চিন্তা, তার গল্প, তার জাদু এখনও আমাদের সঙ্গে আছে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ প্রান্ত

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

দুই মাস পর তেহরান থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট ফের চালু

একজন মুনা ও প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ

প্রকাশিত : ০৮:১২:৪৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২০

হিমু, শুভ্র, বাকের ভাই, মুনা, মির্জা সাহেব, কুসুম- এমন অনেক চরিত্র বইয়ের পাতা, টেলিভিশনের পর্দা কিংবা সেলুলয়েড থেকে এসে বাংলাদেশের মানুষের আপনজন হয়ে উঠেছে। এদের মাঝেই নিজের অস্তিত্বের ছাপ রেখে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই ৬৩ বছর বয়সে চলে গেছেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে। নন্দিত এই কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতার গল্প, উপন্যাস, নাটক ও চলচ্চিত্রের অসংখ্য চরিত্র মানুষের মনে আঁচড় কেটেছে।

দশকের পর দশক সে চরিত্রগুলোর আবেদন স্থান হয়নি। হুমায়ূন আহমেদ গল্পের প্রাণ ছিল পাত্র-পাত্রীদের মিথস্ট্ক্রিয়া। তাদের ছোট ছোট সংলাপকে প্রাধান্য দিয়ে গল্প লিখতেন হুমায়ূন আহমেদ। অতি সাধারণ কথাকে অসাধারণভাবে প্রকাশের এক অন্যরকম মত নিয়ে জন্মেছিলেন এই লেখক।

তিনি দেখিয়েছিলেন যে, ইউরোপীয় আদলের বাইরে গিয়েও সফল এবং গুণগত মানসম্পন্ন উপন্যাস সৃষ্টি সম্ভব। অতিবাস্তব ঘটনাবলিকে অতি বিশ্বাসী করে উপস্থাপনের অতিরিক্ত রকমের এক মত ছিল তার। তার লেখনীর এই ধরনকে ম্যাজিকাল রিয়ালিজম বা জাদু বাস্তবতা ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়ে থাকে।

আর সে কারণে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্য অঙ্গনের এক কালজয়ী নক্ষত্রের নাম! এক কালজয়ী মানুষের নাম! যখন গল্প লিখেছেন মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন, যখন তার কলম থেকে উপন্যাস ঝরেছে তখনও তিনি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন। নাটক নির্মাণ করেছেন মানুষ সেখানেও ভালোবেসে রাস্তায় নেমে গেছে, চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন সেখানেও মানুষ ভালবেসে সিনেমা হল কানায় কানায় ভরিয়ে তুলেছে।

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক আগে। দিন তারিখ মনে নেই। বলছি কোথাও কেউ নেই নাটকের মুনা চরিত্রে অভিনয়ের কথা। মনে আছে, সেদিন বিটিভিতে একটা নাটকের শুটিং ছিল। শুটিংয়ের মধ্যেই একজন এসে জানিয়েছিলেন, আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য হুমায়ূন আহমেদ মেকআপ রুমে অপেক্ষা করছেন। মেকআপ রুমে ঢুকতেই তার প্রথম প্রশ্ন? আপনি কি ‘কোথাও কেউ নেই’ পড়েছেন? বইটি আমি পড়েছি বলতেই, তিনি জানতে চাইলেন আমি মুনা চরিত্রে অভিনয় করব কিনা। এও বলেছিলেন, আমি যদি এই চরিত্রে অভিনয় করি, তাহলেই তিনি প্রযোজক বরকত উল্লাহকে নাটকের চিত্রানাট্য দেবেন। আর আমি যদি মুনা চরিত্রে অভিনয় না করি, তাহলে প্রযোজককে ‘কোথাও কেউ নেই’-এর বদলে একটা ভূতের গল্প লিখে দেবেন।

অবশ্য হুমায়ূন আহমেদকে শেষ পর্যন্ত ভূতের গল্প লিখে দিতে হয়নি। কারণ, আমি মুনা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। স্বীকার করতেই হবে, হুমায়ূন আহমেদের লেখা যে চরিত্রগুলোয় আমি অভিনয় করেছি, তার মধ্যে ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের মুনা চরিত্রটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অভিনয়ের জন্য মুনা অসাধারণ এক চরিত্র। মনে আছে, এ নাটকের ‘বাকের ভাই’ নিয়ে চারদিকে যখন তুমুল আলোচনা, তখন হুমায়ূন আহমেদের প্রশ্ন ছিল, ‘বাকেরকে নিয়ে এত হৈচৈ কেন? ট্র্যাজেডি তো মুনার।

আমি তো মুনা যখন একলা কাঁদে, আমিও তখন মুনার সঙ্গে কাঁদি!’ মুনা সত্যিকার অর্থেই মাল্টিডাইমেনশনাল একটি চরিত্র। অনেক শিল্পী এ ধরনের একটি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রতীক্ষায় থাকেন। আমি ভাগ্যবান, আমাকে মুনা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য প্রতীক্ষায় থাকতে হয়নি।

হুমায়ূন আহমেদের ‘শঙ্খনীল কারাগার’ টিভিতে যখন নাটক হয়েছিল, তখন অভিনয় করেছি। এরপর যখন চলচ্চিত্র হলো, সেখানেও অভিনয় করেছি। সেই ছবির একটা গল্প আছে। মুস্তাফিজুর রহমান সাহেব আমাকে প্রথমে যে চিত্রনাট্য দিয়েছিলেন, ওটা পড়ে আমি বলেছিলাম করব না। তখন আমি ধানমন্ডিতে থাকি। এক সন্ধ্যায় দরজায় কড়া নাড়ছে কেউ। ফরীদি দরজা খুলে আমাকে বলল- ‘হুমায়ূন আহমেদ এসেছে তোমার সঙ্গে কথা বলতে।’

আমি গিয়ে বললাম, ‘জি হুমায়ূন ভাই বসেন’। বসেই বললেন, ‘আরে আমার গল্প নিয়ে ছবি হবে আর আপনি করবেন না, এটা হয় নাকি? কী হলে করবেন?’ আমি বললাম, ‘অরিজিনাল গল্পটা হলে করব। আর রুনু চরিত্রটাই করব। যেটা টিভিতে করেছিলাম।’ পরে তিনি আবার চিত্রনাট্য করেন। এরপর তৈরি হলো ‘শঙ্খনীল কারাগার’। এমনিতে আমি হুমায়ূন আহমেদের লেখা প্রচুর এক খণ্ডের নাটকে অভিনয় করেছি। ‘কুসুম’ সম্ভবত বিটিভির প্রথম খণ্ড নাটক, আতিকুল হক চৌধুরীর প্রোডাকশন।

শংকর সাঁওজালের প্রথম কাজ। ডলি জহুর, আমি, মেঘনা, আবুল হায়াত, শর্মিলী চাচি, নাতাশা- সবাই অভিনয় করেছিলেন। নাটকটি এখন ইউটিউবে পাওয়া যায়। ‘এসো নীপবনে’, ‘বিবাহ’, ‘একা একা’, ‘অচিন বৃক্ষ’- এগুলো সব হুমায়ূন আহমেদের ক্ল্যাসিক নাটক। ‘আজ রবিবার’, ‘অয়োময়’ নাটকগুলোও ভেরি ইন্টারেস্টিং, সবগুলোতেই কাজ করেছি।

তখনকার নাটকের কথা বলতে গেলেই মনে হয় যে, হুমায়ূন আহমেদের এত ভালো লেখায় কাজ করেছি, পরের দিকে আর করা হয়নি। শেষ নাটক ছিল ‘দুই ভুবন’ সিরিজের ‘তৃতীয় জন’। অতিপ্রাকৃত ঘটনা নিয়ে। আমি আর ফরীদি ছিলাম শুধু। আর প্রথমটি ছিল ‘এসো নীপবনে’। ফরীদি, তারিক আনাম খান আর আমি অভিনয় করেছিলাম।

তবে হুমায়ূন আহমেদের ডিরেকশনে আমার কখনোই কাজ করা হয়নি। আজ আমাদের মাঝে হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে নেই। কিন্তু তার কথা, তার চিন্তা, তার গল্প, তার জাদু এখনও আমাদের সঙ্গে আছে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ প্রান্ত