ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থল বন্দর দিয়ে ট্রানজিট পণ্য নিতে শুরু করেছে ভারত। প্রথম বারের মতো ট্রানশিপমেন্ট প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট এন্ড অ্যান্ড ট্রেড’ (পিআইডবিøউটিটি) আওতায় চট্রগ্রাম নৌবন্দর ও সড়ক পথ ব্যবহার করে আখাউড়া স্থল বন্দর দিয়ে রড ও ডাল ভারতে গেছে । বৃহস্পতিবার সকাল ৯ টায় আগরতলা স্থল বন্দরের সুপারিটেডেন্ট জয়দীপ মুখার্জিসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা আখাউড়া স্থল বন্দরের সুপারেন্টেডেন্ট মো. মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকে পণ্যগুলোর কাগজপত্র বুঝে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করায়।
এরপর সেখানে ত্রিপুরার মূখ্যমন্ত্রী বিল্পব কুমার দেব এর উপস্থিতিতে সড়ক পথে চট্রগ্রাম থেকে ৪টি কন্টেইনারে করে আসা ৫৩.২৫ মেট্রিক টন রড ও ৪৯.৮৩ মেট্রিক টন ডাল আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রহন করে ভারত। এ জন্য নির্ধারিত মাশুল ও ফি পরিশোধ করেছে ভারত।
চট্রগ্রাম নৌবন্দর ও সড়ক পথ ব্যবহার করে ভারতের কোলকাতা থেকে এইপণ্য যাবে ত্রিপুরা ও আসাম রাজ্যে।
এর আগে বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টায় সড়ক পথে ৪টি কন্টেইনারে ওইসব রডও ডাল আখাউড়া স্থল বন্দর এসে পৌঁছে।
দুইদেশের চুক্তি অনুযায়ী ট্রানজিটের প্রথম চালানের এসব পণ্য বুধবার যাওয়ার কথা থাকলে ও আনুষ্ঠানিকতায় আখাউড়া ও আগরতলা স্থলবন্দরের শুণ্য রেখায় ত্রিপুরার মূখ্যমন্ত্রী বিল্পব কুমার দেবের জন্য একদিন পেছানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে ১৪ জুলাই ভারতের কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর থেকে সেজুতি নামের একটি জাহাজ বাংলাদেশের চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। জাহাজটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বিলম্বে ২১ জুলাই চট্রগ্রাম বন্দরে নোঙর করে । এরপর আনুষ্ঠানিকতা শেষে জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের কাজ করে কে জে শিপিং।
পরে চট্রগ্রাম নদী বন্দর থেকে বুধবার ভোরে রড ও ডাল বোঝাই চারটি ট্রেইলর আখাউড়া স্থল বন্দরে বিকাল সাড়ে ৪ টায় এসে পৌঁছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ৯ টায় স্থল বন্দর দিয়ে রড ও ডাল বোঝাই চারটি ট্রেইলর ভারতের আগরতলা যায়।
ভারতীয় পণ্য পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান আদনান ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো. আক্তার হোসেন বলেন আজকে আমাদের একটি ঐতিহাসিক দিন। দুইদেশের চুক্তি অনুযায়ী ট্রানজিটের প্রথম চালান সকালে ভারতে যায়। এর আগে আগরতলায় পাঠানেরা জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করা হয়। তিনি আরো বলেন এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো ভালো হবে। উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে।
বাংলাদেশের ম্যাংগু লাইন নামে প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ম্যানেজার সোহেন খান বলেন, ম্যাংগু লাইনের মাধ্যমে কাজটা করতে পেরে খুবই আনন্দিত। এই প্রথম ট্রানজিটের মাধ্য পণ্য যাওয়া শুরু হয়েছে। এরমাধ্যমে দেশের রেমিটেন্স বৃদ্ধি পাবে।
আগরতলা স্থল বন্দরের সুপারিটেডেন্ট জয়দীপ মুখার্র্জি বলেন, কোলকাতা থেকে বাংলাদেশের আখাউড়া স্থল বন্দর হয়ে মালগুলো সকালে আগরতলায় এসে পৌঁছে। ত্রিপুরার মূখ্যমন্ত্রী বিল্পব কুমার দেব তা গ্রহনের পর আজকের মধ্যেই আগরতলা থেকে পণ্যগুলো পাঠানো হবে জানায়। তিনি আরো বলেন একটি ভালো উদ্যোগ। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পণ্য আসায় উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে।
এদিকে বাংলাদেশ ভূখন্ড ব্যবহার করে ভারতের পরীক্ষামূলক এই ট্রানজিট চালানের জন্য ফি নির্ধারিত করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এরমধ্যে ডকুমেন্ট প্রসেসিং ফি প্রতি চালান ৩০ টাকা, ট্রান্সশিপমেন্ট ফি প্রতি মেট্রিকটন ২০ টাকা, সিকিউরিটি চার্জ প্রতি মেট্রিক টন ১০০ টাকা, অ্যাসকর্ট চার্জ প্রতি মেট্রিক টন ৫০ টাকা, বিবিধ প্রশাসনিক চার্জ প্রতি মেট্রিক টন ১০০ টাকা, কন্টেননার স্ক্যানিং ফি প্রতি কন্টেননার ২৫৪ টাকা। এছাড়া ইলেকট্রিক লক এন্ড সিল ফি হিসেবে বিধিমালা দ্বারা নির্ধারিত পরিমাণ দিতে হয়।
এহিসাবে ভারতীয় পণ্য পরিবহনে করে আনা চালানটিতে প্রতি কন্টেইনারে ২৫ টন পণ্যরয়েছে। এ হিসাবে কন্টেইনার প্রতি সরকারি ফি ও মাসুল বাবদ প্রায় ১০০ ডলার পাচ্ছে বাংলাদেশ। এর বাইরে সড়কপথে চট্রগ্রাম থেকে আসা আগরতলা পযর্ন্ত পণ্য পরিবহন বাবদ কন্টেইনার প্রতি ৩৫-৪০ হাজার টাকা ভাড়া পাবে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো।
২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন দ্যা ইউজ অফ চট্টগ্রাম এন্ড মংলা পোর্ট ফর মুভমেন্ট অব গুডস টু এন্ড ফ্রম ইন্ডিয়া চুক্তির আওতায় আর্টিক্যাল টু (অনুচ্ছেদ দুই) অনুযায়ী ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর উভয় দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ি এসব পণ্য বাংলাদেশের উপর দিয়ে নিয়ে যায় ভারত। পরীক্ষামূলক প্রথম চালান হিসাবে দুইটি কন্টেইনারে রড আছে ৫৩.২৫ মেট্রিক টন ও পৃথক দুইটি কন্টেইনারে ডাল আছে ৪৯.৮৩ মেট্রিক টন। পণ্য পরিবহনে সাত ধরণের ফি বেধে দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, যা পণ্য পরিবহনকারি সংস্থা পরিশোধ করবে।
বাংলাদেশের ম্যাংগু লাইন নামে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভারত থেকে পণ্যটি পাঠাচ্ছে ডার্সেল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস করে কেজি শিংপিং ইন্টারন্যাশনাল।
আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহনের দায়িত্বে রয়েছে সিএন্ডএফ এজেন্ট আদনান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। ডাল গ্রহন করবে ভারতের গৌহাটির প্রতিষ্ঠান ইটিসি অ্যাগ্রো প্রসেসিং ও রড গ্রহন করবে আগরতলার এস এম কর্পোরেশন লিমিটেড।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পণ্য পরিবহনে সহজ পথের বিবেচনায় আশুগঞ্জের পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করে ভারত। এর আগে আশুগঞ্জ নৌ বন্দর ব্যবহার করে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের যন্ত্রের পাশাপাশি অন্যান্য পণ্য নিয়ে যায় ভারত। এখন থেকে তাঁরা নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও নিতে চায়। বিশেষ করে সেভেন সিস্টার হিসেবে পরিচিত ভারতের ত্রিপুরাসহ সাতটি রাজ্যের নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য নিতে আগ্রহী হয়ে উঠে সে দেশের সরকার ও ব্যবসায়িরা। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সঙ্গে পণ্য পরিবহনের চুক্তি হয়।
চুক্তির আলোকে প্রথম পরীক্ষামূলক চালান হিসেবে রড ও ডাল নিয়েছে ভারত। পণ্যবাহী কন্টেইনার আগরতলা স্থল বন্দরে রাখার পর ইস্পাতপণ্যের চালান নেওয়া হবে পশ্চিম ত্রিপুরার জিরানিয়ায়। চালানটি ভারতের এমএস কর্পোরেশনের। অন্য দিকে ডালের চালান আগরতলা খালাসের পর আসাম রাজ্যের করিমগঞ্জের জেইন ট্রেডার্সের কাছে নেওয়া হবে।
আখাউড়া স্থল বন্দর শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. হারুনুর রশীদ জানান বাংলাদেশ ও ভারতের চুক্তির আওতায় প্রথম চারটি কন্টেইনার আগরতলায় গেছে। এরজন্য মাশুল ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট চট্রগ্রাম কাস্টমস হাউজ প্রসেসিং হয়েছে।
বিজনেস বাংলাদেশ / বিএইচ



















