বুড়িগঙ্গা নদীর নাম শুনলেই সবার মনে হয় কালো পানি, নদীর ধার দখল করে যত্রতত্র দোকান, হকারদের উৎপাত আর মানুষের ঠেলাঠেলি। নদী দখল করে তীরে গড়ে তোলা কলকারখানা ও স্থাপনা বুড়িগঙ্গার টুঁটি চেপে ধরেছিল। আবর্জনা, কলকারখানার বর্জ্য আঁকড়ে ধরেছিল বুড়িগঙ্গার যৌবন। কিন্তু বর্তমান সময়ের সদরঘাট আর আগের মতো নেই। সবুজ রুপ ধারন করেছে বুড়িগঙ্গা। সারি সারি কৃষ্ণচূড়া, ঝাউ, মাধবীলতা ও শিউলি ফুলের ঢেউ বুড়িগঙ্গার পাড় জুড়ে। চারদিকে দৃষ্টিনন্দন ফুলের সৌরভ আর পাতাবাহারের সৌন্দর্য। ‘বাইরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট’ সেই পুরনো প্রবাদ থেকে বেরিয়ে এক অন্য রকম চেহারায় ফিরছে সদরঘাট।
পৃথিবীর অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ নৌবন্দর ঢাকার সদরঘাট। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় দক্ষিণাঞ্চলের ২২ জেলার মানুষের চলাচলের অন্যতম প্রধান মাধ্যম নৌপথ।
সরেজমিনে দেখা যায়, সদরঘাটের ভিতর ও বাহিরে দোকান ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। আর নদী বন্দর, ভবন, ছাদসহ নদীর পাড় জুড়ে লাগানো হয়েছে নানান প্রজাতির সৌন্দার্যবর্ধনকারী গাছ। ফুলের বাগান ছাড়াও দখলমুক্ত নানা জায়গায় করা হচ্ছে সবজির চাষ। লালকুঠি ঘাটের পাশে বসার জায়গা বাগান পার্কিং, নদীর পাড়ে ঝাউগাছ বাগান করা হয়েছে। এছাড়া নদীর দুই ধার দখলমুক্ত করে সেখান যেন আর সহজে কেউ দখল করতে না পারে তাই নদীর ধারে নানান প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো লঞ্চ,জাহাজ, নদীরপাড় দখল করে সেখান ভাসমান হোটেল করা হয়েছিল। এসব ভাসমান হোটেল অসামাজিক কাজ সহ বর্জ নদীত পরতো। এসব ভাসমান হোটল উচ্ছেদ করে আহসান মঞ্জিলের সামনের জায়গায় কৃষ্ণচূড়ার বাগান করা হয়েছে। লঞ্চের টিকিট পেতে সরাসরি লঞ্চে না গিয়ে নির্দিষ্টস্থানে টিকিট কাউটার ও অনলাইনের মাধ্যমে টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুন্দরবন, মানামী, এডভেঞ্চার, গ্রীনলাইন ও বরগুনার লঞ্চসমুহের টিকিট এখন অনলাইনে পাওয়া যায়। এছাড়া নদীবন্দরের ছাদে ‘বুড়িগঙ্গা ভিউ রুফ টপ গার্ডেন’ রেস্টুরেন্ট করা হয়েছে।
বুড়িগঙ্গাকে আন্তর্জাতিক মানের নৌবন্দর করতে এখন শ্যামবাজার থেকে আহসান মঞ্জিল পর্যন্ত নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সবুজ বাগান করা হয়েছে। ফুটপাত বা পন্টুন থেকে ভাসমান হকার ও কুলিদের দৌরাত্ম্য করা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ। সদরঘাটসহ নদীর দুই পাশে পন্টুনের সংখ্যা ১৩ থেকে বাড়িয়ে ৩০টি করা হয়েছে। নৌকাডুবির মতো দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিরাপদ দূরত্বে তৈরি করা হয়েছে প্রতিটি ঘাট। সবমিলিয়ে এক ছিমছাম নদীবন্দর।
লঞ্চের জন্য পন্টুনে এখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না যাত্রীদের। বন্দরে বসেই কাচের ঘরের ভেতর থেকে দেখা যায় লঞ্চ আসা-যাওয়ার মুহূর্ত। নারী-পুরুষের জন্য করা হয়েছে আলাদা অপেক্ষমাণ কক্ষ। আছে ভিআইপি অপেক্ষমাণ কক্ষ ও শিশুকে মায়ের দুধ পান করানোর ব্যবস্থা। বন্দরের দ্বিতীয় তলায় যাত্রীদের জন্য সুবৃহৎ বসার জায়গা করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও রাখা হয়েছে বসার স্থান ও টয়লেটের ব্যবস্থা। বন্দরের নিরাপত্তার জন্য ৩২টি পয়েন্টে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারকি করা হয়। যেকোনো সমস্যার সমাধানে দেশের যাত্রীদের জন্য দুটি হটলাইন নম্বর ও বিদেশিদের জন্য একটি হটলাইন নম্বরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বন্দরের ভেতরে করা হয়েছে ওয়াকওয়ে। নৌকাডুবির ঘটনা কমাতে মূল নদীবন্দর থেকে নিরাপদ দূরত্বে শ্যামবাজার ও বিনাস্মৃতি ঘাটে জেটি, পন্টুনসহ নৌকার ঘাট করা হয়েছে। প্রত্যেক নৌকায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে প্রশিক্ষিত লোক। সদরঘাট এবং ওপারে কেরাণীগঞ্জে যাতায়াতের জন্য চালু হয়েছে ছয়টি ওয়াটারবাস।
বিআইডাব্লিউটিআইয়ের যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, আধুনিক আন্তর্জাতিক মানের নৌবন্দর করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এই আদলে ঢাকা নদীবন্দরকে সাজানো হচ্ছে। ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে চলমান নদী উচ্ছেদ কার্যক্রমে প্রায় ৮০ শতাংশ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। সদরঘাটকে গ্রীন সদরঘাট এবং ক্লীন সদরঘাট করা হবে।
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর

























