করোনা ভাইরাসের সংকটের শুরু, শুরু হয় মানুষের উদ্বেগ, উৎকন্ঠা আর ভাবাবেগের। ঘরেই দিন কাটাতে থাকে মানুষ। কোন সেবা পর্যাপ্ত নেই। সে সময়ে শুরু হয় অক্সিজেনের সঙ্কট। দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণেরও বেশী দাম দিয়ে সাধারণ মানুষকে কিনতে হয়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডার। এমন পরিস্থিতিতে অক্সিজেন সেবা যাতে সাধারণ মানুষের নাগালে থাকে তার জন্য উদ্যোগ নেন তিন যুবক। ছাত্রলীগের এ তিন যুবক খোলেন জয় বাংলা অক্সিজেন সেবা। কল পেয়েই সাধারণ মানুষের ঘরে পৌছে দেন বিনামূল্যের অক্সিজেন সেবা। আর মানবসেবার সেই যাত্রা চলমান এখনো।
উদ্যোক্তারা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী, এই মানবিক কার্যক্রমে সাদ’-এর সঙ্গী ছাত্রলীগের উপ-বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক সবুর খান কলিন্স এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম সবুজ।
সেবা দিতে গিয়ে নিজেরাও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। বৃদ্ধ বাবা-মাসহ সাদ’-এর পরিবারের সবাই হয়েছিলেন করোনা আক্রান্ত। কিন্তু থেমে থাকেননি তারা। মানবিক কার্যক্রমে নিজেদের যুক্ত রেখেছেন এখনো পর্যন্ত। সে সময় সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার জন্য ভয়ের একটি সময় গিয়েছিলো তখন। বিশেষ করে আমার আম্মু-আব্বুর জন্য। তাদের বয়স হয়েছে। কোন ধরনের ঘটনাই তখন আমার জন্য সুখকর ছিলো না। হয়তো মানুষের দোয়ায় সে পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠি।
উদ্যোক্তারা জানান, মাত্র ৬টি সিলিন্ডার দিয়ে শুরু করেন এই মানবিক কার্যক্রম। আর এর নাম দেয়া হয় ‘জয় বাংলা অক্সিজেন সার্ভিস’। ‘একটি নতুন ভোরের প্রতীক্ষা’ স্লোগানে কার্যক্রম শুরু হয় ২৫শে জুন। বিগত ৬ মাসে তাদের থেকে সেবা নিয়েছেন তিন হাজার ৪শত চল্লিশ জন। শুরুতে শুধু করোনা রোগীর জন্য সেবা চালু থাকলেও বর্তমানে যেকোনো রোগী চিকিৎসকের পরামর্শপত্র দেখিয়ে এই সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।
তারা জানান, ২৫ জুন ঢাকায় এ সেবা শুরু করলেও পরের ২৫ জুলাই চট্টগ্রামে, ২৯ জুলাই ময়মনসিংহে, ও ৬ আগস্ট কুরিয়ার যোগে সারাদেশে এ সেবা চালু করা হয়। পরবর্তীতে ফেনী, লক্ষীপুর ও বগুড়া জেলায় এ সেবা চালু হয়। এছাড়াও কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ ও খুলনায় অক্সিজেন সেবা চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আর এ কাজে সারাদেশে সহায়তা করে ১২০ জন।
সাদ বিন কাদের চৌধুরী বলেন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই কার্যক্রমে এগিয়ে এসেছে। আমরা প্রতি মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আর্থিক বিবরণীর সম্পূর্ণ হিসাব দিয়ে থাকি। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা সাদ আরো বলেন, আমাদের জন্য কাজটি সহজ ছিল না। আমরা যখন শুরু করি তখনকার পরিস্থিতি বর্তমানের মতো ছিল না। মানুষের মাঝে বিরাজ করছিল করোনার মারাত্মক ভীতি। কোনো বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে গেলে আশেপাশের মানুষের হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতো। এমনও হয়েছে অক্সিজেন নিয়ে গেলে ছেলে সামনে আসেনি। তার বাবাকে আমরাই অক্সিজেন সেট করে দিয়ে এসেছি।
এই কার্যক্রম কতদিন চলমান থাকবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যতদিন এই অন্ধকার কেটে না যাবে ততদিন আপনাদের পাশে থাকার দৃপ্ত শপথ নিয়েই আমরা এই কার্যক্রম শুরু করি এবং সেটি অব্যাহত থাকবে ইনশাল্লাহ।
সেবা সম্পর্কে রফিকুল ইসলাম সবুজ বলেন, আমরা যখন অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের পৌঁছে দিই তখন তাদের মুখের হাসি আমাদের কে অভিভূত করে। তবে সবসময়ই যে ভালো আচরণ করে এমন না; কিছু মানুষ এমন অপ্রত্যাশিত আচরণ করে যেন মনে হয় আমরা তাদের কর্মচারী।
এদিকে সেবা গ্রহীতারাও খুশি ‘জয় বাংলা অক্সিজেন সার্ভিস’-এর সেবা নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক আক্তারুজ্জামান সিনবাদ বলেন, নভেম্বরে আমার চিকিৎসক ভায়রা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। এ সময় তিনি বাসায় আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। একদিন রাতে হঠাৎ তার শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হওয়ায় তাৎক্ষণিক অক্সিজেন সাপোর্টের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু আমরা কয়েক জায়গায় যোগাযোগ করেও অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করতে পারিনি। এক পর্যায়ে রাত দেড়টার দিকে জয় বাংলা অক্সিজেন সার্ভিসের সাদ’কে ফোন দিই। দুর্ভাগ্যবশত সেদিন তাদের কাছে রিফিল করা কোনো সিলিন্ডার ছিল না। কিন্তু তারা আমাকে হতাশ হতে দেয়নি। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিরপুরে গিয়ে সিলিন্ডার রিফিল করে রাত সাড়ে ৩টার দিকে আমার ভায়রার ইস্টার্ন মল্লিকার বাসায় পৌঁছে দেয়।
সিনবাদ জানান, পরের দিন ভায়রার ভাইয়েরও (করোনা রোগী) অক্সিজেন সাপোর্ট প্রয়োজন পড়ে। সেদিনও তারা আরেকটি সিলিন্ডার পৌঁছে দেয়। এই শিক্ষক বলেন, এই দুর্যোগে আমরা অনেকে নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে রাখি। কিন্তু তারা যে কাজটি করছে সেটি অনেক বড়। মানবসেবায় তাদের এগিয়ে আসা নিঃসন্দেহে ভালো লাগার। তারা অনেক রোগীর কষ্ট কমিয়ে দেয়ার মাধ্যম হয়েছে। আমি চাই এমনভাবে সকলের নিজ নিজ জায়গা থেকে ভালো কাজে এগিয়ে আসুক।
ফেনী সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র শরীফুল আলমও জয় বাংলা অক্সিজেন সার্ভিস থেকে সেবা নিয়েছেন। শরীফুল বলেন, আমার মায়ের কিডনি ডায়ালাইসিস করতে হয় প্রতি সপ্তাহে। তাই তার অক্সিজেন সাপোর্ট লাগে। যেটি ব্যয়বহুলও বটে। আমি জয় বাংলা অক্সিজেন সার্ভিসের বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবার কথা জানতে পেরে তাদের ফোন দিই। এরপর তারা অক্সিজেন দিয়ে যায়। আমার মায়ের জন্য এখন আমি নিয়মিত তাদের বিনামূল্যের এই সেবা গ্রহণ করছি।
শরীফুলও বলেন, এটা অনেক মহৎ কাজ। যেটি তার ভালো লেগেছে। গত ৩রা নভেম্বর রাত পৌনে ৪টার দিকে আবিদ হাসান অমি নামে এক সেবা গ্রহীতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বিগত ২ মাস ধরে আমার আম্মা ফুসফুসে রোগাক্রান্ত হয়ে ভুগছেন। হঠাৎ আজ রাত ২টায় আম্মার অক্সিজেন লেভেল ৬৭-এ চলে আসে। এমন অবস্থায় কোথাও অক্সিজেন সিলিন্ডার পাচ্ছিলাম না। ঠিক তখনই আমার পাশে এসে দাঁড়ায় সাদ বিন কাদের চৌধুরী। তিনি বিনামূল্যে অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে সাহায্য করেছেন। আধা ঘণ্টার মধ্যে আমি সিলিন্ডার পেয়ে যাই আমার আম্মার জন্য। আমি এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবো না। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুক।’
সেবার বিষয়ে ছাত্রলীগের উপ-বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক সবুর খান কলিন্স বলেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সব রোগীর ক্ষেত্রে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় না। করোনা আক্রান্ত রোগীর এক পর্যায়ে শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যাপক সমস্যা হয়ে পড়ে আর এসময় কৃত্রিম উপায়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য অক্সিজেন গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। শুধু করোনা আক্রান্ত রোগী নয়, অন্যান্য রোগীর জন্যও অক্সিজেনের প্রয়োজন হতে পারে। এমতাবস্থায় অক্সিজেন মজুত করা ও এর মূল্য বেশী হওয়ায় অনেকে তাৎক্ষণিকভাবে অক্সিজেন গ্রহণ নিশ্চিত করতে পারছে না। তখন মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজন কি হতে পারে সেটিকে প্রাধান্য দিয়ে এই অবস্থা হতে উত্তরণের জন্য আমরা বিনামূল্যে জয় বাংলা অক্সিজেন সেবার উদ্যোগ হাতে নিয়েছিলাম।
সাদ বিন কাদের বলেন, স্বেচ্ছাসেবকদের আন্তরিকতায় এই কাজটি পরিচালনায় অনেক সহজ হয়েছে। জীবন এবং পরিবারকে ঝুঁকির মধ্যে তারা এই মানবিক কাজে আমাদের সঙ্গী হয়েছেন। তিনি বলেন, আক্রান্ত রোগী ও তার পরিবারের দোয়া ও ভালোবাসা আমাদের কাজ করতে অনুপ্রাণিত করছে। আসলে মানুষের জন্য কাজ করার সময় ও সুযোগ সবসময় আসে না। যতদিন এই পরিস্থিতি চলবে ততদিন আমরা এই কার্যক্রম চলমান রাখবো।
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর


























