ঢাকা রাত ৩:৪৫, বুধবার, ২৮শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

করোনার সেকেন্ড ওয়েভ

সচেতনতাই হাতিয়ার

দেশে গত বছর জুন-জুলাইয়ে করোনার সংক্রমণের প্রথম ঢেউ ছিল তীব্র। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সংক্রমণ কমে যাওয়ায় মানুষ ফেলেছিল স্বস্তির নিশ্বাস। করোনা বিদায় নিয়েছে ভেবে বেপরোয়া হয়ে ওঠে মানুষ। স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই ছিল না, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে জনসমাগম ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় ছিল উপচে পড়া ভিড়। ফলে যা হওয়ার, মার্চ ২০২১ থেকে করোনা ব্যাপক সংক্রমণ লক্ষ করা যায়। প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে এবার সংক্রমণও হয় বেশি তীব্র। গত বছরের মার্চে সংক্রমণ শুরুর পর থেকে এতটা খারাপ পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। এর মধ্যে এই এক বছরের কিছু বেশি সময়ে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ গেছে সাড়ে ১১ হাজারেরও বেশি মানুষের। যদিও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা পাশ্চাত্য দেশগুলোর তুলনায় মৃত্যুর এ সংখ্যাটি হয়তো খুব বেশি নয়। তবুও একেকটি সংখ্যা মানে একেকটি পরিবারের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নেরও মৃত্যু। এ সত্য কথাটি কী আমরা সবাই উপলব্ধি করতে পারি?

করোনার ভয়াবহতা নিয়ে আমাদের যে সচেতনতার অভাব, উদাসীনতা; সেটি বোঝার জন্য গবেষণার প্রয়োজন নেই, জানালা দিয়ে একবার বাইরে তাকালেই সেটি স্পষ্ট বোঝা যায়। এ উদাসীনতা কোনোভাবেই মানুষের অজ্ঞতা থেকে নয়। সংবাদপত্র কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্য এখন যে কোনো খবর মুহূর্তেই শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। তাহলে সমস্যাটি কোথায়? এর একটি কারণ হতে পারে নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে বেশি আত্মবিশ্বাস। অন্য কারণটি হলোÑ ধর্মীয় ও নিজস্ব অপব্যাখ্যা। যার ফলে এই অপব্যাখ্যার ফলাফলও হয় ভয়াবহ।

সম্প্রতি বিখ্যাত মেডিকেল সাময়িকী ‘দ্য ল্যানস্যাটে’ প্রকাশিত একটি গবেষণা নিয়ে মানুষের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। সত্যিকার অর্থে এটি কোনো মৌলিক গবেষণা নয়। বরং এটি বাতাসের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশিত এক পর্যালোচনা। যেখানে করোনাভাইরাস যে বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় তার পক্ষে দশটি যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। এ নিবন্ধে বিজ্ঞানীরা নিজেদের নতুন কোনো আবিষ্কারের কথা উল্লেখ করেননি, বরং আগে আবিষ্কৃত বিষয়গুলো রেফারেন্স হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। তারপরও নিবন্ধটি সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, মাস্ক পরে বা ঘরে থেকে কোনো লাভ নেই, বরং বাইরে গিয়ে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়া অনেক ভালো। অথচ নিবন্ধটিতে এ ধরনের কোনো বক্তব্য নেই। বরং মাস্ক যে পরতেই হবে এবং নিয়ম মেনে সঠিকভাবেই পরতে হবে তার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছে।

করোনাভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমিত হয় এ ধারণাটি প্রথম সামনে এনেছিলেন অস্ট্রেলিয়া ও চীনের দুজন বিজ্ঞানী; যা ১০ এপ্রিল ২০২০ তারিখে ‘এনভায়রনমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর আরও অনেক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গত বছরের জুলাইয়ে ৩২ দেশের ২৩৯ জন বিজ্ঞানী সম্মিলিতভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অবহিত করেছিল যে, করোনাভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং সংস্থাটি যেন সে অনুযায়ী নির্দেশনা জারি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সেদিন বিষয়টি মেনে নিলেও বায়ুবাহিত রোগে সৃষ্ট মহামারি মোকাবিলায় যে ধরনের নির্দেশনা প্রদান করার কথা, সেটি ব্যাপকভাবে প্রচারে ব্যর্থ হয় এবং সামাজিক দূরত্ব, হাত ধোয়া ও মাস্ক পরাসহ কিছু স্বাস্থ্যবিধির নির্দেশনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।

অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস শুরু থেকে বদলাতে থাকে তার ধরন। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চলে সংক্রমিত ভাইরাসগুলো ধরন বদলে আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী রূপ ধারন করে। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেনের মতো দেশগুলোয় দেখা গেছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর নতুন নতুন রেকর্ড। সর্বশেষ ভারতের করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে পুরো বিশ্বে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে যুক্তরাজ্য এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় আবিষ্কৃত করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইনগুলো ৭০ শতাংশ বেশি হারে সংক্রমিত করার ক্ষমতা রাখলেও এতে মৃত্যুর ঝুঁকি কম। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উৎস থেকে আমরা যে তথ্য জানতে পারছি তাতে দেখা গেছে, এই নতুন স্ট্রেইনগুলো শুধু সংক্রমণের হার দ্রুততার সাথে বৃদ্ধিই করছে না, বরং আক্রান্ত হওয়ার পর অতি অল্প সময়ের মধ্যে রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। এমতাবস্থায় দেশের জনগণ যদি তাদের আচরণ পরিবর্তন না করে তবে আমরা খুব খারাপ সময় দিকে ধাবিত হচ্ছি।

বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দরিদ্র দেশ। এখানে নেই প্রয়োজনীয় শিক্ষা, শৃঙ্খলা কিংবা নিয়ম মানার প্রবণতা। প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই, সচেতনতা নেই, হাসপাতালের বিছানা নেই। মহামারি নিয়ন্ত্রণে যেভাবে আন্তরিকতা নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দরকার, সেরূপ আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসার মতো চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নেই। এরই মধ্যে দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ সময় কিছু ব্যক্তিগত সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ এ মহামারি থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে। কোভিড-১৯ ভাইরাসটি বেশি বেশি পরীক্ষা করে শনাক্ত করতে হবে। আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারিত করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ রোগীও যেন করোনার অজুহাতে চিকিৎসা বঞ্চিত না হয়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ থাকতে হবে। জেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউর ব্যবস্থা রাখতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালেও কোভিড রোগীর চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা রাখতে হবে, চিকিৎসা ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। হাসপাতাল ও রোগীর চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

কোভিড-১৯-এর নিয়ন্ত্রণ ত্বরান্বিত করতে হলে আমাদের সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক দূরত্ব, মুখে মাস্ক আর হাত সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে বারবার পরিষ্কার করে রোগটি প্রতিরোধ করি। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে বাংলাদেশে করোনার ভ্যাকসিন চলে এসেছে এবং প্রায় ৬০ লাখ মানুষ করোনা ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন। অনেকে দ্বিতীয় ডোজ ভ্যাকসিনও পেয়ে গেছেন। তবে শুধু ভ্যাকসিন নিলেই হবে না, স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে। যত দিন এই ভাইরাসের অস্তিত্ব বাংলাদেশে থাকবে, তত দিন সবাইকে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তাহলেই করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। ভাইরাসটি যেভাবেই মানব শরীরে এসে থাকুক, এখন একমাত্র মানুষ থেকেই রোগটি সংক্রামিত হচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা কফ থেকে অন্য মানুষের নাক, মুখ ও চোখ দিয়ে সংক্রমিত হয়। কাজেই বাইরে বেরোলেই মাস্ক, চশমা পরতে হবে। হাত না ধুয়ে মুখ, নাক বা চোখ স্পর্শ করা যাবে না। করোনাভাইরাস করোনা রোগীর হাঁচি, কাশি থেকে নির্গত হয়ে বাতাসে জলীয় কণা হিসেবে ভেসে বেড়ায়। ওই জলীয় কণা সুস্থ মানুষের নাক, মুখ দিয়ে প্রবেশ করে আক্রান্ত করতে পারে। এ জন্য মাস্ক অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে এবং হাত না ধুয়ে নাক, মুখ ও চোখ স্পর্শ করা যাবে না।

শ্বাসকষ্ট বা কাশি মারাত্মক হলে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। অক্সিজেন দিতে হবে। শ্বাস নিতে কষ্ট হলে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা থাকতে হবে। উপজেলা পর্যন্ত আইসিইউ থাকতে হবে। সহজ চিকিৎসার নিয়ম থাকতে হবে। এজিথ্রোমাইসিন, ডক্সিসাইক্লিন, ইভারমেকটিন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কার্যকরী চিকিৎসা। সঙ্গে ইকোস্প্রিন বা এনক্সাপাইরিন, কোলেস্টেরলবিরোধী ওষুধ দিতে হবে। খুব অল্প ক্ষেত্রে স্টেরয়েড, অক্সিজেন, অ্যান্টিভাইরাল প্রয়োজন হয়। যত দ্রুত করোনা রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে, তত দ্রুত করোনা রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। একসময় করোনা দুর্বল হবে, মানুষকে সংক্রমণের ক্ষমতা কমে আসবে। ভাইরাসটি হয়তো নির্মূল হবে না। কিন্তু কার্যকারিতা লোপ পেলে মানুষ এত ভীত বা আতঙ্কিত হবে না। চিকিৎসকদের আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

করোনা মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সারা পৃথিবীর মানুষ যখন একটি নির্ভরযোগ্য টিকা পাওয়ার প্রতীক্ষায় ছিল, টিকা আবিষ্কারের আগেই যেখানে উন্নত দেশগুলো তাদের নাগরিকদের জন্য টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অগ্রিম বুকিং করে রেখেছে, সেখানে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক হয়ে আমরা সময়মতো টিকা পাব সেটি ছিল কেবলই কল্পনা মাত্র। সত্য হলো, আমরা যথাসময়েই টিকা পেয়েছি, যখন পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশই টিকা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, দেশে এ টিকা গ্রহণের কার্যকারিতার প্রমাণও পাওয়া যাচ্ছে। সদ্য প্রকাশ হওয়া এক গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, করোনার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া ৯৯ শতাংশ মানুষের মধ্যেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, যা আমাদের মধ্যে আরও আশার সঞ্চার করছে। তবে, নাগরিকদেরও নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। সবাই একসঙ্গে কাজ করলেই শুধু আমরা এ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাবো। আর এটি করতে ব্যর্থ হলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমরাও এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের আক্রমণের শিকার হয়ে খুব খারাপ সময় পার করবো। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আমরা একদিন একটি করোনামুক্ত নতুন পৃথিবী পাব, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক- সম্পাদক ও প্রকাশক, আজকের বিজনেস বাংলাদেশ

এ বিভাগের আরও সংবাদ