অগাস্টে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব সেনা প্রত্যাহারের আগে দেশটিতে আড়াই হাজার সেনা রেখে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন দুই শীর্ষ মার্কিন জেনারেল। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে জেনারেল মার্ক মিলি ও জেনারেল ফ্রাঙ্ক ম্যাককেনজি যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ভাষ্যের অমিল পাওয়া যাচ্ছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি। বাইডেন এর আগে বলেছিলেন, আফগানিস্তানে সৈন্য রেখে দেওয়ার কোনো পরামর্শের কথা তিনি মনে করতে পারছেন না।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ঝড়ের বেগে একের পর এক প্রদেশ দখলে নিয়ে অগাস্টে তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। যে গতিতে আফগান সরকারের পতন হয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র বিস্মিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেনারেল মিলি। তার পাশাপাশি জেনারেল ম্যাককেনজি ও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন মঙ্গলবার সেনেটের আর্মড সার্ভিস কমিটির জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন। আশরাফ গানি সরকারের পতনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলোর আফগানিস্তান থেকে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে আনা এবং লাখ লাখ মরিয়া আফগানের দেশটি ছেড়ে পালাতে চাওয়া নিয়ে কাবুল বিমানবন্দরে ভয়াবহ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর মার্কিন সেনেটে পেন্টাগনের কর্তারা এ শুনানির মুখোমুখি হলেন।
বিদেশি নাগরিকদের আফগানিস্তান ছাড়ার সময় এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১৮২ জনের প্রাণও গেছে। ২৬ অগাস্ট কাবুল বিমানবন্দরের ফটকে হওয়া ওই আত্মঘাতী হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ সেনা ও অন্তত ১৬৯ আফগান নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান হিসেবে আফগানিস্তান থেকে সেনা ও নাগরিক প্রত্যাহার কার্যক্রম তদারক করা জেনারেল ম্যাককেনজি রিপাবলিকান সেনেটরদের প্রশ্নের জবাবে জানান, তিনি আফগানিস্তানে ২ হাজার ৫০০ সেনার ছোট একটি দল রেখে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
তার এ কথার সঙ্গে বাইডেনের ভাষ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। ১৯ অগাস্ট এবিসির এক সাংবাদিককে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, আফগানিস্তানে সৈন্য রাখার কোনো পরামর্শের কথা তিনি স্মরণ করতে পারছেন না। জেনারেল মিলি বলেছেন, ম্যাককেনজির ওই পরামর্শর সঙ্গে তিনিও একমত ছিলেন। “তাহলে, প্রেসিডেন্ট কি মিথ্যা বলেছেন?”, আলাস্কার রিপাবলিকান সেনেটর ড্যান সুলিভানের এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি ম্যাককেনজি।
পরে এই বিষয়ে ব্যখ্যা দেন হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জেন সাকি। “প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনী ও জয়েন্ট চিফসের এ ধরনের খোলামেলা পরামর্শকে মূল্য দেন। তার মানে এই নয় যে, তিনি সবসময় সেসব পরামর্শের সঙ্গে একমত হন,” বলেন তিনি। সাকি বলেন, অগাস্টের সময়সীমার পরও যদি মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে থাকতো, তাহলে এখন তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলতো। মঙ্গলবারের শুনানি শুরু হয় অস্টিননের সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে, এরপর নেওয়া হয় জেনারেল মিলির।
যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের এ চেয়ারম্যান জানান, আফগানিস্তান থেকে হওয়া সন্ত্রাসী হামলা থেকে মার্কিনিদের রক্ষা করা এখন আরও কঠিন হয়ে পড়বে। “তালেবানরা এখনও আগের মতোই সন্ত্রাসী সংগঠন, তারা এখনও আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি।যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে আকাঙ্ক্ষী নতুনভাবে গঠিত আল-কায়েদা বা আইএসআইএস (ইসলামিক স্টেট) এখন খুবই বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা,” বলেন মিলি। এ ধরনের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো আগামী ১২-৩৬ মাসের মধ্যে হাজির হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।
জেনারেল মিলি বলেন, দ্রুত সেনা প্রত্যাহার আফগানিস্তানে পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে বলে ২০২০ সালের শেষের দিকে তিনি মূল্যায়ন করেছিলেন। কিন্তু তিনি ও অস্টিন দুজনই জানান, যে গতিতে সরকারের পতন হয়েছে তা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে ‘হতভম্ভ’ করে দিয়েছিল। “আমরা রাষ্ট্র নির্মাণে সহায়তা করেছিলাম, কিন্তু জাতি গঠন করতে পারিনি। আমরা এবং আমাদের অংশীদাররা আফগান সেনাবাহিনীকে যে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম, তা হাওয়া হয়ে গিয়েছিল, কোথাও কোথাও একটিও বুলেটু না ছুড়ে- পুরোটাই আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল,” বলেছেন অস্টিন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে আল-কায়েদার হামলার পর ওই বছরের শেষপ্রান্তে মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে ঢুকেছিল; ২০ বছর পর সৈন্য প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত দেশটিতে তারা লাখো সৈন্য মোতায়েন করেছে, খরচ করেছে প্রায় ৯৮৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১১ সালের এক পর্যায়ে আফগানিস্তানে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল এক লাখ ১০ হাজার, সেটাই ছিল সর্বোচ্চ। কাবুলের পতন ও ৩১ অগাস্ট সৈন্য প্রত্যাহারের সময়সীমার মাঝে কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শেষ ৪ হাজার সেনা প্রত্যাহার করে নেয়।
তারা একইসঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার আফগান শরণার্থীকেও বিমানে করে কাবুল থেকে অন্য দেশে সরিয়ে নেয়। তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর বিমানবন্দরে জড়ো হওয়া হাজার হাজার আফগানের ভিড়ের চাপেই অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। শুনানিতে ক্যাপিটলে হামলার পর সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে জেনারেল মিলি চীনের সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার প্রসঙ্গও ওঠে। ওই ফোনালাপের বিষয়টি সাংবাদিক বব উডওয়ার্ডের এক বইতে প্রকাশিত হয়েছে। বইতে বলা হয়েছে, জেনারেল মিলি তার অধস্তন কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, ট্রাম্প যদি পারমাণবিক হামলার আদেশ দেন, তাহলেও তিনি (মিলি) না বলা পর্যন্ত যেন ওই আদেশ কার্যকর না হয়।
রিপাবলিকান সেনেটর মার্কো রুবিও জেনারেল মিলির এ ধরনের কথাবার্তাকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন। জেনারেল মিলি শুনানিতে বলেছেন, তখনকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার ও তারপর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব নেওয়া ক্রিস্টোফার মিলারের সঙ্গে সমন্বয় করেই সেসব ফোন কল করা হয়েছিল। “আমি জানি, আমি নিশ্চিত ছিলাম যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীনে হামলা চালানোর উদ্দেশ্য ছিল না। আমার উপর মন্ত্রী নির্দেশিত দায়িত্ব ছিল, আমি যেন এই বার্তা চীনকে দিই। “ওই সময় আমার কাজ ছিল উত্তেজনা প্রশমিত করা। আমার বার্তা ছিল- শান্ত থাকুন, অবিচল থাকুন ও উত্তেজনা প্রশমিত করুন। আমরা আপনাদের (চীন) ওপর হামলা চালাতে যাচ্ছি না,” বলেছেন মিলি।




















