সংকটে পড়া ফারমার্স ব্যাংকে ২০১৭ সালে ৫৩ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। বছর শেষে ব্যাংকটির আমানত কমে হয়েছে ৪ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। অথচ ব্যাংকটির ঋণ ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা।
আমানতের চেয়ে ঋণ বেশি হওয়ায় ফারমার্স ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ব্যাংকটির শাখাগুলোতে প্রতিদিন ভিড় করেও টাকা ফেরত পাচ্ছেন না আমানতকারীরা। অন্যদিকে নানা অনিয়ম করে দেওয়া ঋণও আদায় করতে পারছে না তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া ফারমার্স ব্যাংকের অনিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে নতুন করে ব্যাংকটির আরও যেসব আর্থিক অনিয়ম বেরিয়ে আসছে, তা হিসাব নিকাশ করলে লোকসান বাড়বে আরও কয়েক গুণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মতিঝিল ও গুলশান শাখার মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা বের করা হয়েছে। এর মধ্যে মতিঝিল শাখার ঋণ প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ও গুলশান শাখার ঋণ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
এসব অনিয়ম হয়েছে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও নিরীক্ষা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিশতীর সময়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ফারমার্স ব্যাংকের গ্রাহকদের দেওয়া ঋণের ভাগ নিয়েছেন তাঁরা।
এর মাধ্যমে দুজনের নৈতিক স্খলন ঘটেছে এবং তাঁরা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। মহীউদ্দীন খান আলমগীর সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বর্তমানে সংসদের সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি।
এদিকে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পারার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে পুরো ব্যাংক খাতে। আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অন্য ব্যাংক থেকে আমানত তোলার প্রবণতা বাড়ার কারনে ব্যাংক খাতে তারল্যসংকট দেখা দিয়েছে। বেড়ে গেছে সুদের হার। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঋণ কার্যক্রমেও একধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ফারমার্স ব্যাংকের প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতে পড়েছে। এত বড় দুরবস্থার জন্য যারা দায়ী, তাদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে ভালো প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে। এ থেকে যে টাকা আসবে, তা গ্রাহকদের ফেরত দেওয়া যেতে পারে। তা না হলে ব্যাংকটি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
ফারমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এহসান খসরু বলেন, ঋণের মান খারাপ হওয়ায় লোকসান হয়েছে। ব্যাংকটি যেন ঘুরে দাঁড়াতে পারে, এ জন্য কাজ চলছে। চলতি মাসের মধ্যে নতুন মূলধন জোগানের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। এরপর ব্যাংকটিতে বিভিন্ন পরিবর্তন এনে নতুন করে যাত্রা করবে।
সংকটে পড়ার পর গ্রাহকদের ২৬০ কোটি টাকা আমানত ফেরত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নতুন আমানত এসেছে ৬০ কোটি ও ঋণ আদায় হয়েছে ২১০ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, তারল্যসংকটে পড়ায় এখন নতুন করে মূলধন জোগান দিয়ে ব্যাংকটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে সরকার। এ জন্য সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) উদ্যোগে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংক থেকে মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে ব্যাংকগুলোর কেউ বাড়তি ঝুঁকি নিতে চাইছে না। এ জন্য ব্যাংকগুলো মূলধন জোগান দেওয়ার পাশাপাশি ফারমার্স ব্যাংকের পর্ষদে বসতে চাইছে। তবে ব্যাংকটির বর্তমান পর্ষদ তা মানতে কিছুটা দোটানায় রয়েছে। এ কারণে গত জানুয়ারিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি।
অগ্রণী ব্যাংকের এমডি শামস-উল-ইসলাম বলেন, আমরা সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। কী প্রক্রিয়ায় ফারমার্স ব্যাংককে সহায়তা করা হবে, তার সিদ্ধান্ত এলেই মূলধন দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া নতুন নয়টি ব্যাংকের একটি ফারমার্স ব্যাংক। অনুমোদন পাওয়ার আগেই সাইনবোর্ড লাগিয়ে দপ্তর খুলে নিয়োগ দেওয়া শুরু করেছিল ব্যাংকটি। ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরুর পর বছর না ঘুরতেই ঋণ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে, যার ভুক্তভোগী এখন সাধারণ আমানতকারীরা।


























