০১:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

কলাপাড়ায় ভিক্ষা করেই চলছে মুক্তিযোদ্ধার জীবন-সংসার

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও ন্যুনতম মর্যাদা বা স্বীকৃতি পায়নি দেশের বহু মুক্তিযোদ্ধা তাদেরই একজন কলাপাড়ার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের হলদিবাড়িয়া গ্রামের বয়োবৃদ্ধ মোস্তফা ভ‚ইয়া (৭১)। কখনো ভিক্ষা করে কিংবা কখনো গ্রামের খালে-বিলে মাছ ধরে প্রায় ২০ বছর যাবৎ অন্যের বাড়িতে আশ্রয়ে চলছে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রনকারী বৃদ্ধ মোস্তফা ভ‚ইয়ার জীবন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ভারতের বগাপার ট্রেনিং সেন্টারে বন্দুক ও বোমার উপর বিশেষ প্রশিক্ষন শেষে নোয়াখালীতে দুই মাস যুদ্ধ করেন। সেখান থেকে চট্রগামের পাহাড়ী এলাকায় পাকবাহিনীর সাথে সম্মূক্ষযুদ্ধে পাহাড় থেকে পরে তিনি আহত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চলে আসেন তখনকার নিজ এলাকা চট্রগ্রামের সন্দীপ উপজেলার কাঠগড় ইউনিয়নে। নদী ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে ২০ বছর আগে চলে আসেন কলাপাড়ায়। পরে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের হলদিবাড়িয়া গ্রামের নুরুন নেহার নামের এক প্রতিবন্ধী নারীর সঙ্গে ঘর বাঁধেন। বর্তমানে পাখিমারা বাজার সংলগ্ন মোসলেম সিকদারের আশ্রিত বাড়িতে পার করছেন মানবেতর জীবন। শরীর সুস্থ বোধ করলে করেন জেলে কাজ। আবার যখন অসুস্থ থাকেন তখন বেচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাড়ায় ভিক্ষাবৃত্তি। আবার ভিক্ষাবৃত্তিতে না নামতে পারলে অর্ধাহারে অনাহারে কাটে তার জীবন। তার এ অসহায়ত্বের কথা বেশ কয়েকবার জনপ্রতিনিধিদের জানালেও আজও ভাগ্যে জোটেনি মক্তিযোদ্ধা সনদ কিংবা সরকারী কোন সহয়তা কিংবা আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর । বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সকল সদস্যরা।

মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা ভ‚ইয়া এ প্রতিনিধিকে জানায়, বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১০ম শ্রেনীতে পড়াকালীন সময়ে ভারতে ট্রেনিং দিতে যান। সেখানে ভারতীয় সেনা বাহিনীর মেজর নাসীমারাওর নেতৃত্বে তিনি থ্রী নট থ্রী রাইফেল, মার একফোর রাইফেল, লাইট মেশিন গান, এসএস এলার, হ্যান্ড গ্রেনেড এসএস থার্টি সিক্স, এনটি ট্যাং মাইন ও গাছকাটা বারুদসহ প্রায় ১৫ টি অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষন নেন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে এসে চট্রগ্রামের ৪ নম্বর সেক্টরের মেজর শামিমের নেতৃত্বে দুই পাহারের মাধখান দিয়ে বয়ে চলা কুমিরা রেলপথে মাইন পুতে রাখার দায়িত্ব পালন করেন। তাদের নেতৃত্বদানকারী মেজর শামিম পাকিস্তানিদের গুলিতে মৃত্যুবরন করেন। ওই দিনই পাহাড় বেয়ে উপরে উঠতে গিয়ে নীচে আছড়ে পরে পায়ে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। সেদিনের কথা মনে উঠলে এখনও আতকে উঠেন এ যোদ্ধা। কোন টাকা-পয়সা নয় শুধু একবার মরার আগে মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি চান, একথা বলে ডুকরে কেঁদে উঠেন তিনি।

কলাপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার ও প্রবীন সাংবাদিক হাবিবুল্লাহ রানা এ প্রতিবেদককে বলেন, ২০১৪ সালে যাছাই বাছাই শেষে মোস্তফা ভ‚ইয়াকে তালিকাভুক্ত করার জন্য আমরা কলাপাড়া মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড থেকে সুপারিশ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারনে আজও সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের গাফেলতিতেই এখন মোস্তফা ভ‚ইয়ার এমন দশা।

পটুয়াখালী জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক মুক্তিযোদ্ধা মধু মিয়া এ প্রতিনিধিকে জানায়, একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষা করছে, এ লজ্জা আমাদের সবার। দেশ স্বাধীনের পিছনে তার অনেক অবদান রয়েছে। আমরা তাকে নিয়ে বারবার প্রশাসনের কাছে গিয়েছি কিন্তু কোন ফল পাইনি। আমাদের লজ্জা হয়। স্বাধীনতা উত্তর দেশ তাকে কিছুই দিতে পারেনি।

কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম রাকিবুল আহসান গনমাধ্যমকে বলেন, মোস্তফা ভ‚ইয়ার সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি তিনি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। এছাড়া তিনি যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন তাদের সাথেও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সদস্যরা কথা বলেছেন। এখনো যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের সকল কাহিনী তার মনে আছে। আমার উপজেলা প্রশাসন থেকে তাকে একটি দোকান এবং থেকে একটি বাড়ি নির্মান করে দেয়ার উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। এছাড়া তাকে গেজেটভুক্ত করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। আশা করছি খুব শীঘ্রই তার সকল দু:খ-দুর্দশা ঘুচে যাবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

চাঁদপুরে বাবার স্মৃতি বিজড়িত খোদ্দ খাল খননের উদ্বোধন করলেন তারেক রহমান

কলাপাড়ায় ভিক্ষা করেই চলছে মুক্তিযোদ্ধার জীবন-সংসার

প্রকাশিত : ০৬:০০:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২২

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও ন্যুনতম মর্যাদা বা স্বীকৃতি পায়নি দেশের বহু মুক্তিযোদ্ধা তাদেরই একজন কলাপাড়ার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের হলদিবাড়িয়া গ্রামের বয়োবৃদ্ধ মোস্তফা ভ‚ইয়া (৭১)। কখনো ভিক্ষা করে কিংবা কখনো গ্রামের খালে-বিলে মাছ ধরে প্রায় ২০ বছর যাবৎ অন্যের বাড়িতে আশ্রয়ে চলছে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রনকারী বৃদ্ধ মোস্তফা ভ‚ইয়ার জীবন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ভারতের বগাপার ট্রেনিং সেন্টারে বন্দুক ও বোমার উপর বিশেষ প্রশিক্ষন শেষে নোয়াখালীতে দুই মাস যুদ্ধ করেন। সেখান থেকে চট্রগামের পাহাড়ী এলাকায় পাকবাহিনীর সাথে সম্মূক্ষযুদ্ধে পাহাড় থেকে পরে তিনি আহত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চলে আসেন তখনকার নিজ এলাকা চট্রগ্রামের সন্দীপ উপজেলার কাঠগড় ইউনিয়নে। নদী ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে ২০ বছর আগে চলে আসেন কলাপাড়ায়। পরে নীলগঞ্জ ইউনিয়নের হলদিবাড়িয়া গ্রামের নুরুন নেহার নামের এক প্রতিবন্ধী নারীর সঙ্গে ঘর বাঁধেন। বর্তমানে পাখিমারা বাজার সংলগ্ন মোসলেম সিকদারের আশ্রিত বাড়িতে পার করছেন মানবেতর জীবন। শরীর সুস্থ বোধ করলে করেন জেলে কাজ। আবার যখন অসুস্থ থাকেন তখন বেচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাড়ায় ভিক্ষাবৃত্তি। আবার ভিক্ষাবৃত্তিতে না নামতে পারলে অর্ধাহারে অনাহারে কাটে তার জীবন। তার এ অসহায়ত্বের কথা বেশ কয়েকবার জনপ্রতিনিধিদের জানালেও আজও ভাগ্যে জোটেনি মক্তিযোদ্ধা সনদ কিংবা সরকারী কোন সহয়তা কিংবা আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর । বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সকল সদস্যরা।

মুক্তিযোদ্ধা মোস্তফা ভ‚ইয়া এ প্রতিনিধিকে জানায়, বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১০ম শ্রেনীতে পড়াকালীন সময়ে ভারতে ট্রেনিং দিতে যান। সেখানে ভারতীয় সেনা বাহিনীর মেজর নাসীমারাওর নেতৃত্বে তিনি থ্রী নট থ্রী রাইফেল, মার একফোর রাইফেল, লাইট মেশিন গান, এসএস এলার, হ্যান্ড গ্রেনেড এসএস থার্টি সিক্স, এনটি ট্যাং মাইন ও গাছকাটা বারুদসহ প্রায় ১৫ টি অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষন নেন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে এসে চট্রগ্রামের ৪ নম্বর সেক্টরের মেজর শামিমের নেতৃত্বে দুই পাহারের মাধখান দিয়ে বয়ে চলা কুমিরা রেলপথে মাইন পুতে রাখার দায়িত্ব পালন করেন। তাদের নেতৃত্বদানকারী মেজর শামিম পাকিস্তানিদের গুলিতে মৃত্যুবরন করেন। ওই দিনই পাহাড় বেয়ে উপরে উঠতে গিয়ে নীচে আছড়ে পরে পায়ে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। সেদিনের কথা মনে উঠলে এখনও আতকে উঠেন এ যোদ্ধা। কোন টাকা-পয়সা নয় শুধু একবার মরার আগে মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি চান, একথা বলে ডুকরে কেঁদে উঠেন তিনি।

কলাপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার ও প্রবীন সাংবাদিক হাবিবুল্লাহ রানা এ প্রতিবেদককে বলেন, ২০১৪ সালে যাছাই বাছাই শেষে মোস্তফা ভ‚ইয়াকে তালিকাভুক্ত করার জন্য আমরা কলাপাড়া মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড থেকে সুপারিশ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারনে আজও সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের গাফেলতিতেই এখন মোস্তফা ভ‚ইয়ার এমন দশা।

পটুয়াখালী জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক মুক্তিযোদ্ধা মধু মিয়া এ প্রতিনিধিকে জানায়, একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষা করছে, এ লজ্জা আমাদের সবার। দেশ স্বাধীনের পিছনে তার অনেক অবদান রয়েছে। আমরা তাকে নিয়ে বারবার প্রশাসনের কাছে গিয়েছি কিন্তু কোন ফল পাইনি। আমাদের লজ্জা হয়। স্বাধীনতা উত্তর দেশ তাকে কিছুই দিতে পারেনি।

কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম রাকিবুল আহসান গনমাধ্যমকে বলেন, মোস্তফা ভ‚ইয়ার সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি তিনি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। এছাড়া তিনি যাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন তাদের সাথেও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সদস্যরা কথা বলেছেন। এখনো যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের সকল কাহিনী তার মনে আছে। আমার উপজেলা প্রশাসন থেকে তাকে একটি দোকান এবং থেকে একটি বাড়ি নির্মান করে দেয়ার উদ্যোগ হাতে নিয়েছি। এছাড়া তাকে গেজেটভুক্ত করতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। আশা করছি খুব শীঘ্রই তার সকল দু:খ-দুর্দশা ঘুচে যাবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর