০২:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি নিজেদের জায়গা ও ঘর হবে

  • বরিশাল অফিস
  • প্রকাশিত : ০৩:৪০:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২২
  • 75

শীতের সকালে নিজ ঘরের বারান্দায় বসে রোদ পোহাচ্ছেন ৭০ বছরের বৃদ্ধা সোনাবান। সংসারে অনেক টানপোড়েনের মধ্যেও চোখে মুখে প্রশান্তির ছাপ। কেমন আছেন জানতে চাইলে মৃদু হাসি দিয়ে উচ্চ স্বরে বললেন ভাল আছি, ভাল আছি বাবা। আল্লাহ অনেক ভাল রাখছে। সোনাবানের মত ভালো আছেন সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নের চরআবদানীর গ্রামের আশ্রয়ন প্রকল্পের ১৮৪ টি পরিবার।

কয়েক মাস আগেও যাদের কারোরই থাকার নিজস্ব জায়গা বা ঘরবাড়ি ছিলো না। এখন এরা সবাই স্থায়ী ঠিকানার বাসিন্দা। থাকার ঘরটাও নিজের, কারো আশ্রিত নয়। এটা যেন এখনো তাদের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। সরকারের কাছে এখন ছোট্ট একটি দাবী তুলেছেন তারা। বলেছেন আশ্রয়নে প্রতি ঘরে ২ থেকে ৪ জন শিশু আছে। আশ-পাশে স্কুল নেই। তাই বেশীর ভাগ শিশুদের পড়ালেখা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই আশ্রয়নের মধ্যেই একটি স্থায়ী বা অস্থায়ী স্কুল খোলার দাবী তাদের।

বছর খানেক আগেও নগরীতে ভিক্ষা করতেন রাজিয়া। স্বামী কবির তালুকদার ভ্রাম্যমান ভাবে শ্রমিকের কাজ করতেন। ৩ সন্তানকে নিয়ে রসুলপুর বস্তিতে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। এখন তার স্থায়ী ঠিকানা প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া আশ্রয়ন।

রাজিয়া বলেন, মাসে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা ঘর ভাড়া দিতে হতো। খাই বা নাই খাই মাস শেষ হবার আগে ঘর ভাড়ার টাকা যেভাবেই হোক গুছিয়ে রাখতে হতো। টানাটানির সংসারে খুব কষ্ট হতো ভাড়া দিতে। কিছু করার ছিলো না।

বাচ্চাদের নিয়ে থাকার জন্য একটা ঘর তো দরকার। আল্লাহর রহমতে সরকার ঘরের ব্যবস্থা করেছে। এখন আর আমাদের থাকতে কোন ভাড়া দিতে হয় না। নিজের ঘর হয়েছে। তাই ভাড়ার টাকাটা বেঁচে যাওয়ায় তা সংসারের কাজে খরচ করতে পারি। রাজিয়ার স্বামী কবির তালুকদার বলেন, এখন একটাই সমস্যা টাকার অভাবে ঘরে মিটার আনতে পারিনি। মিটার পেতে ঘর প্রতি ৪’শ টাকা দিতে হচ্ছে বিদ্যুত অফিসকে। কিন্তু এখানকার অনেকেই সে টাকা দিতে না পারায় বিদ্যুত পায়নি।

আশ্রয়নের আরেক বাসিন্দা মাহমুদা। নদীতে বাড়ি ঘর ভেঙে যাবার পর ৪ ছেলে ২ মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে ভাসমান ভাবে থাকতেন পাশ^বর্তী নতুন চরে। যেখানে বসবাসে দূর্ভোগের শেষ ছিলো না। মাহমুদা বলেন, সরকার ও বরিশালের ডিসি স্যার খুজে এনে এখানে ঘর ও জমি দিয়েছে। এই ঘর আমাদের একটি স্থায়ী ঠিকানা দিয়েছে। খোলা আকাশের নিচে বছরের পর বছর থেকেছি। এখনো হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে উপরের দিকে চেয়ে দেখি খোলা আকাশ নয়, মাথার উপরে আশ্রয়নের টিনের ছাদ আছে।

মাহমুদা বলেন, স্বপ্নেও ভাবিনি নিজেদের জায়গায় নিজেদের বাড়ি হবে। আমরা এখন বলতে পারি আমাদের নিজস্ব ঘর আছে। আমরা সরকারকে এবং বরিশালের জেলা প্রশাসককে ধন্যবাদ জানাই। এখন আমাদের ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য একটা স্কুলের ব্যবস্থা করলেই হয়। সরকারের কাছে আর আমাদের কোন চাওয়া পাওয়া নেই।

বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারের গন শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় গিলাতলীর আশ্রয়নে শিশুদের জন্য একটি অস্থায়ী স্কুলের ব্যবস্থা করেছি। আগামী শনিবার এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে। ঘরে বিদ্যুতের সংযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি প্রায় প্রতিদিনই আশ্রয়নে যাই। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ার কথা কেউ বলেনি। আমি খোজ খবর নিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করব।

বরিশাল জেলা প্রশাসক মোঃ জসীম উদ্দিন হায়দার বলেন, ওই মানুষগুলোর কিছু দিন আগেও কোন স্থায়ী ঠিকানা ছিলো না। এখন তাদের নিজেদের জমি ও ঘর হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্দেশনা রয়েছে দেশে কোন ভূমিহীন ও গৃহহীন থাকতে পারবে না। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি। তিনি বলেন নতুন করে আরো অনেক আবেদন জমা পড়েছে। আমরা সেগুলো যাচাই বাছাই করছি। বর্তমানে তৃতীয় ধাপে দেড় হাজারের বেশী ঘরের নির্মান কাজ চলমান ও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। যা চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে হস্তান্তর করা হবে।

প্রসঙ্গত মুজিববর্ষ উপলক্ষে বরিশাল জেলায় প্রথম দফায় ১৫৫৬টি দ্বিতীয় দফায় ৫৪৯ টি গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারের মাঝে ঘর বিতরণ করা হয়েছে। জেলায় মোট ৩ হাজার ৯৬১ টি ঘরের বরাদ্ধ প্রদান করা হয়েছে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি নিজেদের জায়গা ও ঘর হবে

প্রকাশিত : ০৩:৪০:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২২

শীতের সকালে নিজ ঘরের বারান্দায় বসে রোদ পোহাচ্ছেন ৭০ বছরের বৃদ্ধা সোনাবান। সংসারে অনেক টানপোড়েনের মধ্যেও চোখে মুখে প্রশান্তির ছাপ। কেমন আছেন জানতে চাইলে মৃদু হাসি দিয়ে উচ্চ স্বরে বললেন ভাল আছি, ভাল আছি বাবা। আল্লাহ অনেক ভাল রাখছে। সোনাবানের মত ভালো আছেন সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নের চরআবদানীর গ্রামের আশ্রয়ন প্রকল্পের ১৮৪ টি পরিবার।

কয়েক মাস আগেও যাদের কারোরই থাকার নিজস্ব জায়গা বা ঘরবাড়ি ছিলো না। এখন এরা সবাই স্থায়ী ঠিকানার বাসিন্দা। থাকার ঘরটাও নিজের, কারো আশ্রিত নয়। এটা যেন এখনো তাদের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। সরকারের কাছে এখন ছোট্ট একটি দাবী তুলেছেন তারা। বলেছেন আশ্রয়নে প্রতি ঘরে ২ থেকে ৪ জন শিশু আছে। আশ-পাশে স্কুল নেই। তাই বেশীর ভাগ শিশুদের পড়ালেখা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই আশ্রয়নের মধ্যেই একটি স্থায়ী বা অস্থায়ী স্কুল খোলার দাবী তাদের।

বছর খানেক আগেও নগরীতে ভিক্ষা করতেন রাজিয়া। স্বামী কবির তালুকদার ভ্রাম্যমান ভাবে শ্রমিকের কাজ করতেন। ৩ সন্তানকে নিয়ে রসুলপুর বস্তিতে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। এখন তার স্থায়ী ঠিকানা প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া আশ্রয়ন।

রাজিয়া বলেন, মাসে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা ঘর ভাড়া দিতে হতো। খাই বা নাই খাই মাস শেষ হবার আগে ঘর ভাড়ার টাকা যেভাবেই হোক গুছিয়ে রাখতে হতো। টানাটানির সংসারে খুব কষ্ট হতো ভাড়া দিতে। কিছু করার ছিলো না।

বাচ্চাদের নিয়ে থাকার জন্য একটা ঘর তো দরকার। আল্লাহর রহমতে সরকার ঘরের ব্যবস্থা করেছে। এখন আর আমাদের থাকতে কোন ভাড়া দিতে হয় না। নিজের ঘর হয়েছে। তাই ভাড়ার টাকাটা বেঁচে যাওয়ায় তা সংসারের কাজে খরচ করতে পারি। রাজিয়ার স্বামী কবির তালুকদার বলেন, এখন একটাই সমস্যা টাকার অভাবে ঘরে মিটার আনতে পারিনি। মিটার পেতে ঘর প্রতি ৪’শ টাকা দিতে হচ্ছে বিদ্যুত অফিসকে। কিন্তু এখানকার অনেকেই সে টাকা দিতে না পারায় বিদ্যুত পায়নি।

আশ্রয়নের আরেক বাসিন্দা মাহমুদা। নদীতে বাড়ি ঘর ভেঙে যাবার পর ৪ ছেলে ২ মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে ভাসমান ভাবে থাকতেন পাশ^বর্তী নতুন চরে। যেখানে বসবাসে দূর্ভোগের শেষ ছিলো না। মাহমুদা বলেন, সরকার ও বরিশালের ডিসি স্যার খুজে এনে এখানে ঘর ও জমি দিয়েছে। এই ঘর আমাদের একটি স্থায়ী ঠিকানা দিয়েছে। খোলা আকাশের নিচে বছরের পর বছর থেকেছি। এখনো হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে উপরের দিকে চেয়ে দেখি খোলা আকাশ নয়, মাথার উপরে আশ্রয়নের টিনের ছাদ আছে।

মাহমুদা বলেন, স্বপ্নেও ভাবিনি নিজেদের জায়গায় নিজেদের বাড়ি হবে। আমরা এখন বলতে পারি আমাদের নিজস্ব ঘর আছে। আমরা সরকারকে এবং বরিশালের জেলা প্রশাসককে ধন্যবাদ জানাই। এখন আমাদের ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য একটা স্কুলের ব্যবস্থা করলেই হয়। সরকারের কাছে আর আমাদের কোন চাওয়া পাওয়া নেই।

বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, সরকারের গন শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় গিলাতলীর আশ্রয়নে শিশুদের জন্য একটি অস্থায়ী স্কুলের ব্যবস্থা করেছি। আগামী শনিবার এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে। ঘরে বিদ্যুতের সংযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি প্রায় প্রতিদিনই আশ্রয়নে যাই। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ার কথা কেউ বলেনি। আমি খোজ খবর নিয়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করব।

বরিশাল জেলা প্রশাসক মোঃ জসীম উদ্দিন হায়দার বলেন, ওই মানুষগুলোর কিছু দিন আগেও কোন স্থায়ী ঠিকানা ছিলো না। এখন তাদের নিজেদের জমি ও ঘর হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের নির্দেশনা রয়েছে দেশে কোন ভূমিহীন ও গৃহহীন থাকতে পারবে না। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি। তিনি বলেন নতুন করে আরো অনেক আবেদন জমা পড়েছে। আমরা সেগুলো যাচাই বাছাই করছি। বর্তমানে তৃতীয় ধাপে দেড় হাজারের বেশী ঘরের নির্মান কাজ চলমান ও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। যা চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে হস্তান্তর করা হবে।

প্রসঙ্গত মুজিববর্ষ উপলক্ষে বরিশাল জেলায় প্রথম দফায় ১৫৫৬টি দ্বিতীয় দফায় ৫৪৯ টি গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারের মাঝে ঘর বিতরণ করা হয়েছে। জেলায় মোট ৩ হাজার ৯৬১ টি ঘরের বরাদ্ধ প্রদান করা হয়েছে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর