০৮:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬

সরকারি কর্মকর্তার মানবিক উদ্যোগে পেল বাঁচার অবলম্বন

স্বাভাবিকভাবেই ধর্ষণের মতো দুঃস্বপ্ন কোনো মেয়েই দেখতে চান না। তবে ষোড়শী ছবি রহমানের (ছদ্মনাম) জীবনে যা ঘটেছে তা কেবল দুঃস্বপ্ন নয়, অবিশ্বাস্য এবং অকল্পনীয়। সে এমন এক নরপশু দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছিল, যে ছিল তার নিজ পিতা। একদিন-দুদিন নয়, টানা দুই মাস শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় সে। এরপর তার জীবনে নেমে আসে আরেক অমানিশা। পাষন্ড পিতার রাহু থেকে মুক্ত হলেও হয়ে পড়ে আশ্রয়হীন। আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে গিয়ে পড়েছে নতুন বিপাকে। ঘটনার পরম্পরায় মানসিক বৈকল্যের শিকার হওয়ায় মেয়েটির জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কিছু মানবিক ব্যক্তির হাত ঘুরে তার ঠাঁই হয় সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে। সেখান থেকে একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় এবার সে পেয়েছে স্বাবলম্বী হয়ে বাঁচার শক্তি।

ছবি রহমানের বয়ান অনুযায়ী তাদের বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার বটতলী গ্রামে। তার বাবার নাম তাজুল ইসলাম এবং মায়ের নাম পারভীন আক্তার। তার মা ছিল বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী। মায়ের গর্ভে তাদের দুই ভাই-বোনের জন্ম। ভাই বড়- নাম রুবেল। ছবি রহমানের বয়স যখন পাঁচ, তখন বাবা তার মাকে তালাক দেয়। এরপরই মা দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন স্বামীর হাত ধরে চলে যায় কুমিল্লা। ছোট্ট মেয়েটিকে রাখা হয় নানা বাড়িতে। সেখান থেকে তাকে ছোট ফুফু সালেহা বেগমের বাসায় পাঠানো হয়। পরগাছার ন্যায় ওই বাসায় বড় হতে থাকে মেয়েটি। ধীরে ধীরে তার ভেতর গাঢ় হতে থাকে আপনজনকে কাছে পাবার ব্যাকুলতা। ২০২০ সালের দিকে কাউকে না জনিয়ে ফুফুর বাসা পালিয়ে মা’র খোঁজে চলে যায় কুমিল্লায়। কিন্তু বিধিবাম। মা’র খোঁজ মিলেনি। তার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হলে অবস্থান জানাজানি হয়। তখন চাচাতো ভাই হৃদয়ের অনুরোধে তার বাবা তাকে কুমিল্লা থেকে নরসিংদী নিয়ে আসে। এরপরই তার জীবনে ঘটে চরম ট্র্যাজেডি। জন্মদাতা পিতার মুখোশ খসে বেরিয়ে আসে এক নরপশু। যে দিনের পর দিন তার ওপর চালায় যৌন নির্যাতন। প্রায় দুই মাস এভাবে চলার পর বিষয়টি টের পায় তার সৎ মা। ফলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ফের আশ্রয় নেয় নানা বাড়ি। কিন্তু ভাগ্য তার প্রসন্ন ছিল না। নানার মৃত্যুর পর আবারো হয়ে পড়ে আশ্রয়হীন। একটু আশ্রয়ের আশায় নানার বড় ভাইয়ের বাড়ি চট্টগ্রামে যাবার উদ্দেশে ট্রেনে চড়ে। তবে ওঠে পড়ে সিলেটগামী ভুল ট্রেনে। এরপরই শুরু হয় ভাগ্যের চাকা ঘোরা। ভুল ট্রেনে ওঠে পড়ায় মেয়েটির আহাজারিতে তাকে সহায়তায় এগিয়ে আসেন অনেকে। পরে একজন সাংবাদিকের সহযোগিতায় পুলিশের মাধ্যমে তাকে প্রথমে নেয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। আদালতের নির্দেশনায় তার আশ্রয় মিলে গাজীপুরের কাশিমপুর সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে। আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানকালেই ছয়মাস ব্যাপী পোশাক শিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়।

গত ২৭ জানুয়ারি ওই আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী। তখনই মেয়েটি তার জীবনে ঘটে যাওয়া মর্মস্পর্শী কাহিনী তুলে ধরে তাকে সহায়তার অনুরোধ জানায়। পরে পরিচালকের আশ্বাসে মেয়েটি চাকুরির মাধ্যমে পুনর্বাসনের জন্য আবেদন করে। সরকারি কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টায় আদালতের মাধ্যমে আবেদনের বিষয়ে দ্রæত অনুমতিও মিলে। পরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মেয়েটিকে রাজধানীর একটি এতিমখানায় ‘সেলাই প্রশিক্ষক’ হিসেবে নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে।

চাকুরির মাধ্যমে পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়ে মেয়েটি যেমন সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, তেমনি নতুন উদ্যমে বাঁচার স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত আসামীর মৃত্যু

সরকারি কর্মকর্তার মানবিক উদ্যোগে পেল বাঁচার অবলম্বন

প্রকাশিত : ০৯:০১:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ মার্চ ২০২২

স্বাভাবিকভাবেই ধর্ষণের মতো দুঃস্বপ্ন কোনো মেয়েই দেখতে চান না। তবে ষোড়শী ছবি রহমানের (ছদ্মনাম) জীবনে যা ঘটেছে তা কেবল দুঃস্বপ্ন নয়, অবিশ্বাস্য এবং অকল্পনীয়। সে এমন এক নরপশু দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছিল, যে ছিল তার নিজ পিতা। একদিন-দুদিন নয়, টানা দুই মাস শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় সে। এরপর তার জীবনে নেমে আসে আরেক অমানিশা। পাষন্ড পিতার রাহু থেকে মুক্ত হলেও হয়ে পড়ে আশ্রয়হীন। আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে গিয়ে পড়েছে নতুন বিপাকে। ঘটনার পরম্পরায় মানসিক বৈকল্যের শিকার হওয়ায় মেয়েটির জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কিছু মানবিক ব্যক্তির হাত ঘুরে তার ঠাঁই হয় সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে। সেখান থেকে একজন সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় এবার সে পেয়েছে স্বাবলম্বী হয়ে বাঁচার শক্তি।

ছবি রহমানের বয়ান অনুযায়ী তাদের বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার বটতলী গ্রামে। তার বাবার নাম তাজুল ইসলাম এবং মায়ের নাম পারভীন আক্তার। তার মা ছিল বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী। মায়ের গর্ভে তাদের দুই ভাই-বোনের জন্ম। ভাই বড়- নাম রুবেল। ছবি রহমানের বয়স যখন পাঁচ, তখন বাবা তার মাকে তালাক দেয়। এরপরই মা দ্বিতীয় বিয়ে করে নতুন স্বামীর হাত ধরে চলে যায় কুমিল্লা। ছোট্ট মেয়েটিকে রাখা হয় নানা বাড়িতে। সেখান থেকে তাকে ছোট ফুফু সালেহা বেগমের বাসায় পাঠানো হয়। পরগাছার ন্যায় ওই বাসায় বড় হতে থাকে মেয়েটি। ধীরে ধীরে তার ভেতর গাঢ় হতে থাকে আপনজনকে কাছে পাবার ব্যাকুলতা। ২০২০ সালের দিকে কাউকে না জনিয়ে ফুফুর বাসা পালিয়ে মা’র খোঁজে চলে যায় কুমিল্লায়। কিন্তু বিধিবাম। মা’র খোঁজ মিলেনি। তার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হলে অবস্থান জানাজানি হয়। তখন চাচাতো ভাই হৃদয়ের অনুরোধে তার বাবা তাকে কুমিল্লা থেকে নরসিংদী নিয়ে আসে। এরপরই তার জীবনে ঘটে চরম ট্র্যাজেডি। জন্মদাতা পিতার মুখোশ খসে বেরিয়ে আসে এক নরপশু। যে দিনের পর দিন তার ওপর চালায় যৌন নির্যাতন। প্রায় দুই মাস এভাবে চলার পর বিষয়টি টের পায় তার সৎ মা। ফলে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ফের আশ্রয় নেয় নানা বাড়ি। কিন্তু ভাগ্য তার প্রসন্ন ছিল না। নানার মৃত্যুর পর আবারো হয়ে পড়ে আশ্রয়হীন। একটু আশ্রয়ের আশায় নানার বড় ভাইয়ের বাড়ি চট্টগ্রামে যাবার উদ্দেশে ট্রেনে চড়ে। তবে ওঠে পড়ে সিলেটগামী ভুল ট্রেনে। এরপরই শুরু হয় ভাগ্যের চাকা ঘোরা। ভুল ট্রেনে ওঠে পড়ায় মেয়েটির আহাজারিতে তাকে সহায়তায় এগিয়ে আসেন অনেকে। পরে একজন সাংবাদিকের সহযোগিতায় পুলিশের মাধ্যমে তাকে প্রথমে নেয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। আদালতের নির্দেশনায় তার আশ্রয় মিলে গাজীপুরের কাশিমপুর সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে। আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানকালেই ছয়মাস ব্যাপী পোশাক শিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়।

গত ২৭ জানুয়ারি ওই আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শনে আসেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী। তখনই মেয়েটি তার জীবনে ঘটে যাওয়া মর্মস্পর্শী কাহিনী তুলে ধরে তাকে সহায়তার অনুরোধ জানায়। পরে পরিচালকের আশ্বাসে মেয়েটি চাকুরির মাধ্যমে পুনর্বাসনের জন্য আবেদন করে। সরকারি কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টায় আদালতের মাধ্যমে আবেদনের বিষয়ে দ্রæত অনুমতিও মিলে। পরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মেয়েটিকে রাজধানীর একটি এতিমখানায় ‘সেলাই প্রশিক্ষক’ হিসেবে নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে।

চাকুরির মাধ্যমে পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়ে মেয়েটি যেমন সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, তেমনি নতুন উদ্যমে বাঁচার স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেছে।

বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর