শীতের দিন। গ্রামের বাড়ি গুলোতে কর্ম ব্যস্ততা। যে যার মত কাজ করছেন। বেলা ১২টার দিকে খোঁজ পরে দেড় বছরের শিশু ফাতিমার। আধা ঘন্টা খোঁজাখুজির পরে শিশুর নিস্তেজ দেহ ভাসতে দেখা যায় পুকুরে। গত ৩জানুয়ারি এমন ঘটনা ঘটে বাউফল উপজেলার নওমালা ইউনিয়নের নওমালা গ্রামে। নিহত শিশু ফাতিমার বাবা মো. জাফর মৃধা (৩০)। পেশায় রিকশা চালক। মা মোসা. জেসমিন বেগম (২৬)। মানুষের বাড়িতে গ্রহস্থলীর কাজ করেন। চার ভাই বোনের মধ্যে তৃতীয় ফাতিমা।
ছোট বোনের লাশ পুকুর থেকে তুলেন বড় বোন:
প্রতিদিনের মত বাড়ির উঠানে খেলতে ছিলেন নিহত ফাতিমা। শিশু কণ্যার মা ছিলেন বাড়ির বাহিরে। বাড়িতে রান্না করছেন দাদি। বাড়ির সামনে পিছনে দুইটা পুকুর। শিশু ফাতিমা নতুন হাটতে শিখছে। হাটতে হাটতে চলে গেছেন বাড়ির পিছনের পুকুরে। পুকুর পাড় থেকে পরে যান পানিতে। পানিতে ডুবে ছিলেন আধা ঘন্টার বেশি সময়। সাড়ে ১২টার দিকে ভেসে উঠেন ফাতিমা। সবাই যখন এদিক সেদিক খুঁজতে ছিলেন তখন পুকুরে ফাতিমাকে ভাসতে দেখেন বড় বোন মোসা. হাফসা (১০)। ছোট বোনকে ভাসতে দেখে চিৎকার দিয়ে পানিতে লাফিয়ে পড়েন হাফসা। চিৎকার শুনে ছুটে আসেন বাবা জাফর মৃধা। পানি থেকে তুলে বাড়ির উঠানে নিয়ে আসা হয় শীতল দেহ। ততক্ষণে পরপারে পাড়ি জমায় শিশু ফাতিমা।
নাতনিকে বাঁচাতে নানার প্রাণপণ চেষ্টা:
নাতনি ফাতিমার পানিতে পড়ার খবর শুনে ছুটে এসেছেন নানা মো. সেফেস সিকদার(৭০)। পানিতে থেকে তোলা ফাতেমাকে কোলে তুলে নেন নানা। নাতনিকে বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন নানা। হাতের তালুতে নিয়ে শুরু করেন প্রচলিত চিকিৎসা। নিজের মুখে সেফেস সিকদার বলেন,‘ ফাতিমাকে আমার হাতের তালুতে নিয়ে উপুড় করে রাখি। মুখে শ্বাস দিতে থাকি। ’ একই ভাবে স্থানীয় আরও কয়েকজন বাপ দাদার মুখ থেকে শুনে আসা পদ্ধতিতে ফাতেমাকে চিকিৎসা দিতে থাকেন। এ পর্যায় শিশু ফাতেমাকে নিয়ে যাওয়া হওয়ায় স্থানীয় ইউনিয়ন কমিউনিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
মৃত্যু ফাতেমাকে নেওয়া হয় চিকিৎসালয়:
পানিতে ডুবে যাওয়ার আধা ঘন্টার উদ্ধার করা হয় শিশু ফাতিমাকে। পানিতে ডুবে যাওয়ার পরে এক সময় ভেসে উঠে ফাতেমা। প্রথমে বড় বোন হাফসা (১০) দেখতে পায় ফাতেমাকে। চিকিৎসার দিয়ে পানি থেকে কোলে তুলে নেন। পরে বাবা জাফর মৃধা এসে উদ্ধার করে। বাড়িতে বসেই প্রায় ৩০ মিনিট যাবৎ হাতুড়ে চিকিৎসা চলে ফাতেমার। একপর্যায় ফাতিমাকে নিয়ে যাওয়া হয় নওমালা ইউনিয়ন কমিউনিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কতব্যরত চিকিৎসক মো. সিরাজ উদ্দিন শিশু ফাতিমাকে দেখে মৃত্যু ঘোষণা করেন। পরে বাড়িতে নিয়ে আসা হয় ফাতিমার মৃতদেহ।
এ মৃত্যুর দায় কার?
সবেমাত্র হাটতে শিখে ছিল ফাতিমা। ছোট ছোট পা দিয়ে এদিক সেদিক ছুটে চলে। পানি নিয়ে খেলা তার পছন্দ। প্রায়ই চলে যেতে পুকুর ঘাটে। এ কারনে নজরে নজরে রাখা হত ফাতেমাকে। কিন্তু যেদিন না ফেরার দেশে চলে যাবেন সেদিন আর কেউ নজরে নজরে রাখেনি ফাতিমাকে। সবাই যার যার মত কাজে ব্যস্ত ছিলেন। মা, বাবা বাড়িতে ছিলেন না। দাদি ব্যস্ত ছিলেন রান্নায় আর দুই বোন ব্যস্ত ছিল খেলা ধুলায়। মুক্ত ফাতেমা খেলতে খেলতে পুকুর ঘাটে চলে গেলেন। ফিরলেন লাশ হয়। ফাতিমার মৃত্যুর দায় স্বীকার করে দাদি বিলাপ করে বলেন,‘ কেনো আমার জাদুরে কোলে কোলে রাখলাম না!
জন্মিলে মরিতে হবে:
মাইকেল মধুসুদন দত্ত তার বঙ্গভূমি কবিতায় বলেছিলেন,‘ জন্মিলে মরিতে হবে। একথা চিরসত্য। চিরন্তন। আল্লাহ পাক ফাতেমা পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তিনিই আবার তাকে নিয়ে গেলেন। আল্লাহর উপরে তো কারো হাত নেই। তিনি যা করেন তা বান্দার ভালোর জন্যই করেন। মলিন মুখে এমন কথা বলছিলেন প্রতিবেশী মো. জালাল হাওলাদার।

সন্তান হারিয়ে শোকে কাতর হয়ে পড়েন মা-বাবা:
নাড়ি ছেড়া ধন আদরের সন্তান হারিয়ে শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন মা মো. জেসমিন বেগম ও বাবা মো. জাফর মৃধা। শুধু মা-বাবা নয়। আদরের নাতনিকে হারিয়ে অঝরে চোখের পানি ফেলছেন দাদা আ. হক মৃধা (৭০) ও দাদি চেনু বিবি (৫০)। এখনও কান্নায় ভেঙে পড়ছেন নানা-নানি।
জাফর মৃধা- জেসমিন দম্পতির তৃতীয় সন্তার মোসা. ফাতেমা। তাদের আরও তিন সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে মোসা. হাফসা আক্তার স্থানীয় নুরানী মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী। মেঝ মেয়ে মোসা. হাবিবা আক্তার (৮) একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। ছোট ছেলে ইয়াসিনের বয়স মাত্র বছর।
নিহত শিশুর মা মোসা. জেসমিন বেগম বলেন,‘ আমি মানুষের বাড়িতে কাজ করি। ওর বাবা রিকশা চালায়। চার সন্তান আমাদের। তিন মেয়ে এক ছেলে। আমাদের অভাবের সংসারেও সন্তানদের ভালো রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করি। মেয়ে বলে কখনো কষ্ট পাই না বা খারাপও লাগে না। দুই মেয়েকে মাদ্রাসায় পড়াই। ছোট মেয়েকে এভাবে হারিয়ে ফেলবো কখনো বুজতে পারিনি। শোকে পাথর বাবা জাফর মৃধা কান্না ভেঙে পড়েন। কথার বলার মত অবস্থায় ছিল না।
এদিকে ঘটনাস্থল দেখাতে গিয়ে বিলাপ করতে করতে দাদি চেনু বেগম জানান,‘ ফাতিমার জন্য পানি গরম করছিলেন। হাতের কাজ শেষ করেই তাকে গোসল করাবেন। সেদিন ঠিকই গোসল করানো হয়েছে ফাতিমাকে তবে সেটা ছিল শেষ গোসল। দাদির বিলাপ যেনো থামছেই না। তখন দাদা আ. হক মৃধা ছিলেন নির্বাক।
ভয় কটেনি মা বাবার:
পানিতে ডুবে মারা গেলেন চার সন্তারের মধ্যে সেঝো সন্তান দেড় বছর বয়সি মোসা. ফাতেমা। কড় মেয়ে হাফসা (১০) ও মেঝ মেয়ে হাবিবা (৭) সাঁতার জানলেও ছোট ছেলে ইয়াসিন (৩) কে নিয়ে মা-বাবার ভয়। বাবা রিকশা চালাতে বাহিরে যেতে হয়। দাদা-দাদি পেশায় ভিক্ষুক। তারাও নিদিষ্ট সময় বাড়িতে থাকেন না। দুই মেয়ের সাথেই বাড়িতে অধিকাংশ সময় কাটের ইয়াসিনের। এজন্য এক মাত্র পূত্র সন্তানকে নিয়ে ভয়ে দিন কাটছে মা-বাবার।
আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু:
উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার পশ্চিম-দক্ষিণ, দক্ষিণ ও পূর্ব দিক নদী বেষ্ঠিত। তেঁতুলিয়া নদীতে বেষ্ঠিত এ উপজেলায় রয়েছে অসংখ্য ছোট নদী, খাল ও পুকুর ডোবা। উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ, ধুলিয়া, কেশবপুর, বগা, নাজিরপুর ইউনিয়ন নদীর তীরে অবস্থিত। এসব এলাকায় প্রায়ই ঘটে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা। গত বছরের ২নভেম্বর বগা ইউনিয়নে পানিতে ডুবে মারা শিশু শিথিল। ওই গ্রামের লিটন হাওলাদারের দুই বছর বয়সী ছেলে ইয়াছিন পুকুরে পরে মারা যায়। এছাড়াও চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি নাজরিপুর ইউনিয়নের তাঁতেরকাঠি গ্রামের ইয়ামিন (২), ২২জুলাই দাশপাড়া গ্রামে শিশু তানসিম (১ দেড় বছর), দাশপাড়া ইউনিয়নের খেজুর বাড়িয়া গ্রামের শিশু হুমায়রা (৪) পানিতে ডুবে মৃত্যু বরণ করেন।
পরিসংখ্যান বলছে……
বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দেওয়া তথ্য মতে,‘ গত ২০২১ সালে পানিতে ডুবে মারা গেছেন ১৮জন। তার সবাই শিশু। যেসব শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে পরে ভেসে উঠে অবথা অস্থানীয় ভাবে চিকিৎসার পরে মারা যায় তার কোন তথ্য নেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। বিভিন্ন সূত্রের দেওয়া তথ্য মতে, গত এক বছর পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ২৫জনের।
অসাধানতা আর কুসংস্কার:
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ১ থেকে দেড় বছর বয়সে শিশু হাটতে শুরু করে। এসময় তারা দিকবেদিক হাটতে থাকে। তারা খেলতেও শুরু করে এই সময়। আর পানি শিশুদের বেশি পছন্দ। তারা পানি নিয়ে খেলতে পছন্দ করে। যার কারনে মা-বাবাকে শিশুর এ বয়সে অধিক সচেতন হতে হবে। অপরদিকে পানিতে ডুবে যাওয়া শিশুদের চিকিৎসা নিয়েও নানান কুসংস্কার রয়েছে। কেউ কেউ পানিতে ডুবে যাওয়া শিশু উদ্ধার করে পানি বের করার চেষ্টা না করে গরম কাপড়, তুস কুড়া দিয়ে ঢেকে রাখেন। স্পর্শ করতে দেওয়া হয় না মাকে।
গ্রামের মানুষজন এখনো সেকালের পদ্ধতিতে চিকিৎসা করেন। এ ভুল চিকিৎসায় শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
পানিতে ডোবা শিশুর উদ্ধারের পরে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান
পানিতে ডোবা শিশুর চিকিৎসা নিয়ে আলাপ কালে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ও মা ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা: এ.এস.এম সায়েম বলেন,‘ পানিতে ডোবা শিশু উদ্ধারের পরে প্রতি সেকেন্ড মূল্যবান। সঠিক সময় সঠিক চিকিৎসা না পেলে মৃত্যু নিশ্চিত। এজন্য উদ্ধারের পরে যতদ্রæত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে।
আমাদের সচেতন হতে হবে
শিশু মৃত্যু এখন মহামারি আকার ধারন করছে। প্রতিনিয়ত ঘটছে শিশু মৃত্যুর ঘটনা। যার মধ্যে ২থেকে ৫বছর বয়সী শিশু বেশি। পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারন পারিবারের অসচেতনতা। শিশুদের প্রতি মা-বাবার আরও যতœবান হতে হবে। দেড় থেকে ৫বছর পর্যন্ত শিশুদের পানি থেকে সাবধান রাখতে হবে।
সিনিয়র সাংবাদিক ও বাউফল সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি অতুল চন্দ্র পাল বলেন, শিশু মৃত্যুর মধ্যে অন্যতম কারন এখন পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু। এজন্য পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে শিশুর মা। শিশুকে পুকুর ডোবা থেকে নিরাপদ রাখতে বাড়ির পাশের পুকুর/ ডোবার চার পাশে বেড়া দিয়ে রাখতে হবে। শিশুদের সাঁতার শিখার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে হবে।
অতুল পাল আরও বলেন,‘ শিশু মৃত্যুর হার কমাতে সরকারেরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া নিতে হবে। এছাড়াও পানিতে ডুবে যাওয়া শিশুর উদ্ধারের পরে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যাপক প্রচার করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে যদি এখনই কার্যকারি পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তাহলে লাগামহীন এ মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে না।
বিজনেস বাংলাদেশ/ এ আর




















