০৪:২০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

বৃষ্টি না হওয়ায় খালবিলে পানি নেই! পাট নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছেই না চাষিদের

এক সময় সোনালী আঁশ নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠতো পাটের ঝলমলে ছবি। কিন্তু সেই সোনালী দিনে যেন ভাটা পড়েছে বেশ খানিকটা।

মাদারীপুর শিবচরে পাটের ভালো ফলন হলেও তীব্র তাপদাহ ও পানির অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। প্রখর রোদে জমিতেই শুকিয়ে যাচ্ছে পাটের আঁশ। কিছু দিন আগে জমিতে পানি প্রবেশ করলেও এখন নেমে গেছে এতে বিপাকে পরেছে চাষিরা। এ সময়ে চাহিদামতো বৃষ্টি না হলে পাটের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণ মাসের শুরুতেও শিবচর উপজেলায় কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি না হওয়ায় চাষিদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে উপজেলার অধিকাংশ খাল-বিলে পানিতে ভরপুর থাকার কথা থাকলেও এখন শুকনো। কোনো কোনো জলাশয়ে সামান্য পানি থাকলেও পাট পচানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়।

শিবচরের চাষিদের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট। এবার পাট নিয়ে চাষিদের ভোগান্তির শেষ নেই। পানি সংকটের কারণে একদিকে যেমন পাট জাগ দিতে পারছেন না, পাশাপাশি দিনমজুরের দাম চড়া। সবমিলিয়ে বিপাকে পাটচাষিরা।

মঙ্গলবার (২৬ জুলাই) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চাষিদের অনেকেই বৃষ্টির আশায় পাট কেটে জমির পাশে, কেউবা রাস্তার পাশে, খাল-বিল বা ডোবার পাশে স্তূপ করে রেখেছেন। কেউ কেউ পানির অভাবে জমিতে খড় ও আবর্জনা দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। এদের মধ্যে অনেকে আবার খাল-বিল ও জলাশয়ের সামান্য পানিতেই পাটের উপর মাটি ও ভারী কিছু দিয়ে পচানোর চেষ্টা করছেন। আবার কেউ গাড়িতে দূরে কোনো জলাশয়ে নিয়ে জাগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় ভালো ফলন হলেও লোকসান গুনতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা।

শিবচর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে পাট আবাদ ও ৫০০ হেক্টর জমিতে মেস্তা/ কেনাফ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ ও ৫১০ হেক্টর জমিতে মেস্তা/ কেনাফ আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগ আশা করছে শিবচরে এ বছর ২৬ হাজার ৫৪৬ হাজার মে. টন পাট ও ৯৬৯ মে. টন মেস্তা/ কেনাফ উৎপাদিত হবে। গত বছর দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকরা এবার পাট চাষের দিকে বেশি ঝুঁকেছেন।

কুতুবপুর এলাকার হানিফ মোল্লা, গিয়াস ফকির, দাদন বেপারীসহ একাধিক কৃষক জানান, প্রথমদিকে সংকটের কারণে বেশি দামে সার কিনতে হয়েছিল। এখন পানির অভাবে পাট জাগ দিতে সমস্যা হচ্ছে। মাঠ থেকে দূরে থাকা জলাশয়ে পাট নিয়ে জাগ দিতে হচ্ছে। এতে শ্রমিক ও পরিবহনের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে পাটচাষে খরচ প্রায় ১৬ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় গড় ফলন ১০ মণ। প্রতি মণ পাটের বর্তমান বাজার দর ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। এ দামে পাট বিক্রি করলে তারা খুব বেশি লাভবান হবেন না।

বড়খস বন্দরখোলার কৃষক হালান মল্লিক বলেন, পাট বড় হওয়ার পর বৃষ্টি না হওয়া এবং জমি থেকে পানি নেমে যাওয়ায় মাঠের পর মাঠ পাট গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক গাছ শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। পাট পরিপক্ব না হওয়ায় তা কেটে নিতে পারছেন না। তাছাড়া পাট জাগ দেওয়ার মতো পানি নেই কোথাও। অনেকেই পাট কেটে মাঠে, রাস্তায় এবং বাড়িতে ফেলে রাখছেন। কেউ কেউ ভ্যান-নসিমনে করে দূরে কুমার নদে নিয়ে পাট জাগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

কাদিরপুরের বাচ্চু হাওলাদার বলেন, এ বছর আমি দুই বিঘা জমিতে পাট লাগিয়েছি। শ্রমিক আর সেচ খরচ দিয়ে এ বছর ব্যয় বেশি। এজন্য সরকারের কাছে আমাদের দাবি আমরা যেন ন্যায্যমূল্যটা পাই।

পাট চাষি আবুল কাশেম মিয়া বলেন, এ বছর শিবচরে পাটের স্বাভাবিক ফলন হয়েছে। বাজার দর ভালো আছে। কিন্তু পানি না থাকার কারণে পাট কাটা সম্ভব হচ্ছে না। জমি থেকে বিভিন্ন পুকুরে পাট জাগ দেওয়ার কারণ পুকুরের মাছ মারা যাচ্ছে।

শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অনুপম রায় যায়যায়দিনকে বলেন, এখন পাট কাটার সময় চলছে। খালে বিলে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কৃষকরা পাট জাগ দেওয়া নিয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়েছেন। এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় চাষিদের খরচ অন্যান্য বারের তুলনায় বেশি হয়ে যাচ্ছে। জমি থেকে অনেক দূরে বহন করে নিয়ে পাট জাগে ফেলতে হচ্ছে বলে কৃষকদের পাট উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। বর্তমান বাজারমূল্য যা আছে তাতে চাষিদের লোকসান হবে না। তবে দাম কমে গেলে চাষিরা সমস্যায় পড়বেন।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

হরিণের মাংসসহ একজন মাংস ব্যবসায়ীকে আটক করেছে কোস্ট গার্ড

বৃষ্টি না হওয়ায় খালবিলে পানি নেই! পাট নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছেই না চাষিদের

প্রকাশিত : ০৫:৫১:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই ২০২২

এক সময় সোনালী আঁশ নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠতো পাটের ঝলমলে ছবি। কিন্তু সেই সোনালী দিনে যেন ভাটা পড়েছে বেশ খানিকটা।

মাদারীপুর শিবচরে পাটের ভালো ফলন হলেও তীব্র তাপদাহ ও পানির অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। প্রখর রোদে জমিতেই শুকিয়ে যাচ্ছে পাটের আঁশ। কিছু দিন আগে জমিতে পানি প্রবেশ করলেও এখন নেমে গেছে এতে বিপাকে পরেছে চাষিরা। এ সময়ে চাহিদামতো বৃষ্টি না হলে পাটের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণ মাসের শুরুতেও শিবচর উপজেলায় কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি না হওয়ায় চাষিদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে উপজেলার অধিকাংশ খাল-বিলে পানিতে ভরপুর থাকার কথা থাকলেও এখন শুকনো। কোনো কোনো জলাশয়ে সামান্য পানি থাকলেও পাট পচানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়।

শিবচরের চাষিদের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট। এবার পাট নিয়ে চাষিদের ভোগান্তির শেষ নেই। পানি সংকটের কারণে একদিকে যেমন পাট জাগ দিতে পারছেন না, পাশাপাশি দিনমজুরের দাম চড়া। সবমিলিয়ে বিপাকে পাটচাষিরা।

মঙ্গলবার (২৬ জুলাই) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চাষিদের অনেকেই বৃষ্টির আশায় পাট কেটে জমির পাশে, কেউবা রাস্তার পাশে, খাল-বিল বা ডোবার পাশে স্তূপ করে রেখেছেন। কেউ কেউ পানির অভাবে জমিতে খড় ও আবর্জনা দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। এদের মধ্যে অনেকে আবার খাল-বিল ও জলাশয়ের সামান্য পানিতেই পাটের উপর মাটি ও ভারী কিছু দিয়ে পচানোর চেষ্টা করছেন। আবার কেউ গাড়িতে দূরে কোনো জলাশয়ে নিয়ে জাগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ অবস্থায় ভালো ফলন হলেও লোকসান গুনতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা।

শিবচর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে পাট আবাদ ও ৫০০ হেক্টর জমিতে মেস্তা/ কেনাফ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ ও ৫১০ হেক্টর জমিতে মেস্তা/ কেনাফ আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগ আশা করছে শিবচরে এ বছর ২৬ হাজার ৫৪৬ হাজার মে. টন পাট ও ৯৬৯ মে. টন মেস্তা/ কেনাফ উৎপাদিত হবে। গত বছর দাম ভালো পাওয়ায় কৃষকরা এবার পাট চাষের দিকে বেশি ঝুঁকেছেন।

কুতুবপুর এলাকার হানিফ মোল্লা, গিয়াস ফকির, দাদন বেপারীসহ একাধিক কৃষক জানান, প্রথমদিকে সংকটের কারণে বেশি দামে সার কিনতে হয়েছিল। এখন পানির অভাবে পাট জাগ দিতে সমস্যা হচ্ছে। মাঠ থেকে দূরে থাকা জলাশয়ে পাট নিয়ে জাগ দিতে হচ্ছে। এতে শ্রমিক ও পরিবহনের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে পাটচাষে খরচ প্রায় ১৬ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় গড় ফলন ১০ মণ। প্রতি মণ পাটের বর্তমান বাজার দর ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। এ দামে পাট বিক্রি করলে তারা খুব বেশি লাভবান হবেন না।

বড়খস বন্দরখোলার কৃষক হালান মল্লিক বলেন, পাট বড় হওয়ার পর বৃষ্টি না হওয়া এবং জমি থেকে পানি নেমে যাওয়ায় মাঠের পর মাঠ পাট গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক গাছ শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। পাট পরিপক্ব না হওয়ায় তা কেটে নিতে পারছেন না। তাছাড়া পাট জাগ দেওয়ার মতো পানি নেই কোথাও। অনেকেই পাট কেটে মাঠে, রাস্তায় এবং বাড়িতে ফেলে রাখছেন। কেউ কেউ ভ্যান-নসিমনে করে দূরে কুমার নদে নিয়ে পাট জাগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

কাদিরপুরের বাচ্চু হাওলাদার বলেন, এ বছর আমি দুই বিঘা জমিতে পাট লাগিয়েছি। শ্রমিক আর সেচ খরচ দিয়ে এ বছর ব্যয় বেশি। এজন্য সরকারের কাছে আমাদের দাবি আমরা যেন ন্যায্যমূল্যটা পাই।

পাট চাষি আবুল কাশেম মিয়া বলেন, এ বছর শিবচরে পাটের স্বাভাবিক ফলন হয়েছে। বাজার দর ভালো আছে। কিন্তু পানি না থাকার কারণে পাট কাটা সম্ভব হচ্ছে না। জমি থেকে বিভিন্ন পুকুরে পাট জাগ দেওয়ার কারণ পুকুরের মাছ মারা যাচ্ছে।

শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অনুপম রায় যায়যায়দিনকে বলেন, এখন পাট কাটার সময় চলছে। খালে বিলে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কৃষকরা পাট জাগ দেওয়া নিয়ে কিছুটা সমস্যায় পড়েছেন। এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় চাষিদের খরচ অন্যান্য বারের তুলনায় বেশি হয়ে যাচ্ছে। জমি থেকে অনেক দূরে বহন করে নিয়ে পাট জাগে ফেলতে হচ্ছে বলে কৃষকদের পাট উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। বর্তমান বাজারমূল্য যা আছে তাতে চাষিদের লোকসান হবে না। তবে দাম কমে গেলে চাষিরা সমস্যায় পড়বেন।
বিজনেস বাংলাদেশ/বিএইচ